সুদীপনারায়ণ ঘোষ

গত মার্চে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে, যার মূলে রয়েছে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত অপুর গল্প নিয়ে তৈরি তিনটি সিনেমা। বিশদে যাওয়ার আগে কিছু কথা জানিয়ে রাখি।
সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত জাপানি চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে জন্মে কেউ যদি চাঁদ ও সূর্য না দেখে, তার জন্ম যেমন বৃথা, তেমনই শ্রী রায়ের এই ছবিগুলি যে দেখেনি, তার জন্মও তেমনই বৃথা।’ আবার নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ভি এস নইপল বলেছিলেন, ‘আগে আমি চলচ্চিত্রকে খুব একটা উঁচু দরের শিল্প আঙ্গিক মনে করতাম না। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের এই ছবিগুলি দেখার পর আমার ধারণা বদলে গিয়েছে।’
‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রটি সমপরিমাণে জনপ্রিয় ওই নামের মূল উপন্যাসের মাত্র প্রথম ভাগ নিয়ে তৈরি হয়েছিল। উপন্যাসে যে প্রকৃতি তন্ময়তা ছিল, তা চলচ্চিত্রের ভাষায় রূপান্তরিত করা সম্ভব নয় জেনেই সত্যজিৎ রায় সে চেষ্টা না করে তাকে নিজস্ব সিনেমাধর্মী ভাষায় বললেন। এর অদ্ভুত কিছু ঘটনা রয়েছে। এ ছবির পুরোটাই আউটডোরে শুটিং। কোনও মেকআপ ব্যবহার করা হয়নি। এতে কোনও প্লট নেই, মানে সত্যি বলতে, কোনও গল্প নেই। মূল চরিত্রের শিল্পীরা কেউ জনপ্রিয় পরিচিত নয়। সংলাপ কম। পুরোটাই সাদা-কালো। রঙিন সিনেমায় কঙ্কাল দেখা যায়, আর সাদাকালোয় আত্মা।
গত শতকের পাঁচের দশকে মুক্তিপ্রাপ্ত এই তিনটি সিনেমা আজকের ভারত থেকে দূরে মনে হতে পারে। ভারত এখন বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। এখানে বেশ কিছু বিলিয়নেয়ারের বাস। কিন্তু নতুন প্রজন্মের বহু তরুণ-তরুণীর কাছে এ ছবিটি নবজাগরণের মতো মনে হয়েছে। ১৯৯৩ সালে লন্ডনে অগ্নিকাণ্ডে এ ছবির বেশ কিছু পরিমাণে নষ্ট হয় এবং অনেক চেষ্টায় তা পুনরুদ্ধার করা হয়। সেই সিনেমা দিল্লির এক সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়। দর্শকরা বেশিরভাগ তরুণ। তিনটি সিনেমার শেষে নেমে আসে নীরবতা। তারপর দীর্ঘশ্বাস আর করতালি সহযোগে আবেগমথিত কান্না। পথের পাঁচালী, অপরাজিত ও অপুর সংসার, এই ‘ত্রয়ী’ শৈল্পিক ঐশ্বর্যের শীর্ষবিন্দু ছুঁয়েছে বলেই তা অগোচরে বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে যে কোনও দর্শককে আপ্লুত, অশ্রুসিক্ত করে। হয়তো এটা বোঝার সুযোগ দেয় যে, ভারত দারিদ্রের কোন স্তর থেকে উঠে এসেছে। তবে এটাও বোঝার আছে যে, এর মধ্যে অমোঘ মানব সম্পর্কের হিরণ্যদ্যুতি না থাকলে এভাবে বিভিন্ন ভাষার মানুষকে আলোড়িত করা যায় না।
২০১৪ সালে অপু চরিত্রটিকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের শেষ্ঠ শিশু চরিত্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পথের পাঁচালীকে মানবতার সর্বশ্রষ্ঠ দলিল আখ্যা তো অনেক আগেই দেওয়া হয়েছে। কেউ বলেছেন, এটা সেলুলয়েডে নির্মিত স্বপ্ন।
