Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

কাশ্মীর: এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা

একদিকে সারি সারি বরফে মোড়া পর্বতশৃঙ্গ, অন্যদিকে গভীর খাদ। পাহাড়ের গা দিয়ে সরু রাস্তা ধরে ঘোড়ায় চড়ে বা পায়ে হেঁটে অনেকটা ওঠা যায়— জিরো পয়েন্টে, বছরভর যেখানে বরফের সান্নিধ্য পাওয়া যায়৷ ওঠাটাই একটি অ্যাডভেঞ্চার৷

Share Links:

কাজল মুখার্জি

পৃথিবীতে ভূস্বর্গ যদি কোথাও থাকে, তবে তা হল কাশ্মীর। সারা পৃথিবীর মানুষ কাশ্মীর যান ওই ভূস্বর্গের সাক্ষী হতে। কাশ্মীরের সৌন্দর্য এক এক সময় এক একরকম৷ বসন্তকালের শোভা দেখতে পাওয়া যায় মার্চ-এপ্রিল মাসে৷ টিউলিপও সে সময় ফোটে৷ সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরও যথেষ্ট ভালো সময় বেড়ানোর জন্য৷ গাছে গাছে আপেল দেখতে চাইলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর আদর্শ সময়। আবহাওয়াও চমত্‍কার থাকে৷ যাঁরা শীতের মজা নিতে ভালোবাসেন, তুষারাবৃত কাশ্মীর দেখতে তাঁরা নভেম্বর বা  ডিসেম্বর মাসে যেতে পারেন৷ মোটামুটিভাবে মার্চ থেকে অক্টোবরকে কাশ্মীর ঘোরার পক্ষে সবচেয়ে ভালো সময় বলা যেতে পারে৷ তবে শীতকালে তো বটেই, অন্য সময়ও ঠান্ডার যথেষ্ট জামাকাপড় সঙ্গে রাখা উচিত৷

জম্মু যাওয়ার জন্য হাওড়া জংশন থেকে প্রতি মঙ্গল, শুক্র ও শনিবার ছাড়ে হিমগিরি এক্সপ্রেস। কলকাতা স্টেশন থেকে প্রতিদিনই ছাড়ে জম্মু-তাওয়াই এক্সপ্রেস৷ এছাড়া যে কোনও জায়গা থেকে দিল্লি গিয়ে সেখান থেকেও জম্মু যাওয়া যায়। অনেক ট্রেন আছে৷ শুধু শ্রীনগরকে কেন্দ্র করে ঘুরতে চাইলে দিল্লি থেকে উধমপুর গিয়ে সেখান থেকে শ্রীনগর যাওয়া যায়৷ সড়কপথে উধমপুর থেকে শ্রীনগরের দূরত্ব প্রায় ২৩১ কিলোমিটার৷ এছাড়া কলকাতা থেকে বিমানে সোজাসুজি শ্রীনগর যাওয়া যায়। দিল্লি হয়েও শ্রীনগর এয়ারপোর্টে যাওয়া যায়।

জম্মু, শ্রীনগর, পহেলগাম— সব জায়গাতেই বিভিন্ন মানের হোটেল, রিসর্ট আছে৷ একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, যেখানে সেখানে জলের বোতল, চিপসের প্যাকেট ইত্যাদি ফেলে উপত্যকাকে নোংরা, দূষিত করা উচিত নয়৷ ডাল লেকে শিকারা করে ঘোরার সময় বা হাউসবোটে থাকাকালীন লেকের জলে আবর্জনা ফেলা উচিত নয়৷ কাশ্মীরি ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ চিনার গাছ৷ চিনার গাছের ডাল ভাঙা বা পাতা ছেঁড়া উচিত নয়।

অন্য পোস্ট: স্বাধীন, তাই স্বাধীনতায়

এ বছর মার্চ মাসের শেষের দিকে আমাদের সময় ও সুযোগ হয়েছিল কাশ্মীর যাওয়ার৷ আমরা হাওড়া থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসে নয়াদিল্লি গিয়েছিলাম। সেখান থেকে জম্মু গিয়েছিলাম ট্রেনে। তাই আমাদের ওই সফর শুরু করেছিলাম জম্মু দিয়ে৷

জম্মু এক সুন্দর পাহাড়ি শহর৷ তাওয়াই নদীর ধারে অবস্থিত জম্মু কাশ্মীরের শীতকালীন রাজধানী। ওই শহরের পত্তন রাজা জম্বুলোচন করেছিলেন বলে কথিত আছে৷ তিনি নিজের নামানুসারে শহরের নাম দেন জম্বু৷ কালক্রমে লোকের মুখে মুখে তা হয়ে দাঁড়ায় জম্মু৷ প্রাচীন ওই শহরের উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতে৷ মৌর্য, কুষাণ, গুপ্তযুগের ধ্বংসাবশেষও আবিষ্কৃত হয়েছে ওই ইতিহাস প্রসিদ্ধ নগরে৷

রঘুনাথ মন্দির সেখানকার প্রধান দ্রষ্টব্য৷ শহরের একদম মাঝখানে বিশাল চত্বর নিয়ে মন্দিরটি অবস্থিত৷ জম্মু ও কাশ্মীরের রাজা গুলাব সিং মন্দির তৈরির কাজ শুরু করেন ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে৷ ১৮৬০ সালে সেটি সম্পূর্ণ করেন তাঁর পুত্র মহারাজা রণবীর সিং৷ মূল মন্দিরের ভিতরের তিনদিকের দেওয়াল সোনায় মোড়া৷ অধিষ্ঠাতা দেবতা রঘুনাথ বা ভগবান রাম৷ সঙ্গে আছে লক্ষ্মণ এবং সীতার মূর্তি। রয়েছে শিবলিঙ্গও৷ মন্দিরের প্রহরা যথেষ্ট কড়া৷ মোবাইল ফোন, ক্যামেরা, ব্যাগ ইত্যাদি নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করা যায় না৷

জম্মু থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে তাওয়াই নদীর ধারে পাহাড়ের উপর আছে বাহু ফোর্ট৷ রাজা জম্বুলোচনের ভাই রাজা বাহুলোচন ওই দুর্গটি তৈরি করেন৷ ভিতরে একটি কালীমন্দির আছে৷ ফোর্টের চারদিকে রয়েছে সুন্দর সাজানো বাগান বাগ-ই-বাহু৷ এছাড়া তাওয়াই নদীর ধারেই রয়েছে পির খোহ গুহামন্দির ও অন্যান্য মন্দির৷

জম্মু থেকে এক ভোরে রওনা দিলাম পহেলগামের উদ্দেশে৷ লম্বা যাত্রা। প্রায় ৩০০ কিলোমিটারের পথ। তাই ভোরে বেরিয়ে পড়লাম৷ যেতে যেতেই দেখা হল পাটনিটপ৷ ২০২৪ মিটার উঁচুতে অবস্থিত পাটনিটপের প্রধান আকর্ষণ চোখজুড়ানো সবুজ রঙের গালিচা বিছানো পাহাড়ের ঢাল আর নীল আকাশ ছুঁতে চাওয়া পাইন গাছের সমারোহ৷ পাটনিটপ নামটি পাটান দ্য তালাবের অপভ্রংশ, যার মানে রাজকুমারীর পুকুর৷ এককালে কোনও এক রাজকন্যা সেখানকার কোনও পুকুরে স্নান করতেন৷ সেই থেকেই এই নাম। তারপর লোকমুখে তা পাটনিটপ হয়ে যায়৷ জম্মু থেকে শ্রীনগর যেতে গেলে পার করতে হয় পাহাড় কেটে তৈরি ২.৮৫ কিলোমিটার লম্বা জওহর টানেল৷

অন্য পোস্ট: সুযোগ পেলে দক্ষতার সদ্ব্যবহার করব

পহেলগামে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল৷ কাশ্মীর উপত্যকার শীত তখন ভালোই জানান দিচ্ছে৷ জ্যাকেট, টুপি, মোজায় নিজেদের মুড়ে হোটেলে ঢুকে বুঝতে পারলাম কাশ্মীরের ঠান্ডা (বিশেষ করে পহেলগামের) কী জিনিস!

২১৯৫ মিটার উঁচুতে অবস্থিত পৃথিবী বিখ্যাত ওই হিল স্টেশনের রূপ বর্ণনা করা সত্যিই অসম্ভব৷ বরফে মোড়া পাহাড় চূড়া, পাহাড়ের ঢালে সবুজ রঙের বন্যা আর পাহাড়ের গা ঘেঁষে সাদা ফেনা উড়িয়ে সশব্দে বয়ে চলা লিডার নদী৷ পুরাণকথা অনুসারে, দেবাদিদেব মহাদেব সেখানে তাঁর বাহন নন্দীকে রেখেছিলেন৷ সেই থেকে ওই স্থানের নাম হয় বহেলগাঁও। তা থেকেই পহেলগাম৷

স্থানীয় সাইট সিয়িংয়ের জন্য আলাদা গাড়ি ভাড়া করতে হল৷ জম্মু থেকে যে গাড়িতে গিয়েছি, তাতে ঘোরা যায় না৷ সেখানের এটাই নিয়ম৷

প্রথম গন্তব্য চন্দনবাড়ি৷ পহেলগাম থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে৷ প্রতিবছর অমরনাথ যাত্রার শুরু সেখান থেকেই হয়৷ ইচ্ছা করলে চন্দনবাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে কিছুদূর ওঠা যায়৷ গাইডের গল্প শুনতে শুনতে আর অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে ওইটুকু ওঠা একেবারেই ক্লান্তিকর নয়৷ গাইডকে অনুসরণ করে ঘাড় উঁচু করে দেখলাম পাহাড়ের মাথায় একলা দাঁড়িয়ে থাকা চন্দন গাছকে৷ ওটাই নাকি সেই চন্দন গাছ, যা থেকে নাম হয়েছে চন্দনবাড়ি৷

অনেক সিনেমার শুটিং হয়েছে পহেলগামে৷ সেরকমই একটি হল ‘বেতাব’৷ তারই নামানুসারে একটি ভ্যালি বেতাব ভ্যালি। পহেলগাম থেকে ১৫ কিলোমিটার দূর৷ পাহাড়ের কোলে সুন্দর সাজানো গোছানো, পরিচ্ছন্ন একটি উপত্যকা, একবার দেখলেই যার ছবি মনে চিরস্থায়ী হয়ে যায়৷ সেটা অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে৷ পুল পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলে পাওয়া যায় রেস্তোরাঁও৷ মন ভরিয়ে দেওয়া প্রকৃতির রূপ দেখতে দেখতে চুমুক দিলাম কফির পেয়ালায়। এসব রেস্তোরাঁয় স্ন্যাকস নিয়ে বসেও খানিক জিরিয়ে নেওয়া যায়৷

পহেলগাম থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে আর একদিকে আরু ভ্যালি ৷ বেতাব ভ্যালিতে গাড়ি বেশকিছুটা আগে দাঁড়ায়, কিন্তু আরু ভ্যালিতে তা নয়। একেবারে ভ্যালির সামনেই নামা যায়৷ ছবির মতো সুন্দর আরু ভ্যালি৷ দু’চোখ ভরে দেখতে আর প্রাণ ভরে ওই সৌন্দর্য উপভোগ করতেই সেখানে যাওয়া। সেখানে ক্যাম্পে থাকার ব্যবস্থাও আছে৷

পহেলগাম এতই সুন্দর যে, দু’-একদিন থেকে চলে আসতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু আসতে তো হয়ই৷ তাই পরের দিন পহেলগামকে বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম শ্রীনগরের উদ্দেশে৷ সোনামার্গ, গুলমার্গ আর শ্রীনগরের সব দ্রষ্টব্য শ্রীনগরে থেকেই দেখা যায়৷

২৮০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত সোনামার্গ শ্রীনগর থেকে ৮৭ কিলোমিটার দূরে৷ সূর্যের আলোয় পাহাড়ি উপত্যকা সোনালি হয়ে যায়, তাই তার নাম সোনামার্গ৷ সোনামার্গে আমাদের সঙ্গী হল ঝিলমের সবচেয়ে বড় উপনদী নাল্লাহ সিন্ধ৷ তাকে সঙ্গে নিয়েই ঘোরা৷ একদিকে সারি সারি বরফে মোড়া পর্বতশৃঙ্গ, অন্যদিকে গভীর খাদ। পাহাড়ের গা দিয়ে সরু রাস্তা ধরে ঘোড়ায় চড়ে বা পায়ে হেঁটে অনেকটা ওঠা যায়— জিরো পয়েন্টে, বছরভর যেখানে বরফের সান্নিধ্য পাওয়া যায়৷ ওঠাটাই একটি অ্যাডভেঞ্চার৷ আশপাশে অনেক শুটিং স্পট আছে। গাড়ির ড্রাইভার চলতে চলতেই সেগুলো দেখিয়ে দেন৷ হিমালয়ের প্রাকৃতিক সোন্দর্যই সেখানকার প্রধান আকর্ষণ৷ সোনামার্গ ঘুরে দেখার জন্যও আলাদা গাড়ি নিতে হয়। গাড়ি ভাড়া করার আগে যথেষ্ট দরদাম করে নিতে হয়৷

পরের দিনের গন্তব্য ছিল গুলমার্গ৷ গুলমার্গ মানে ফুলের উপত্যকা৷ বসন্তকালে ফুলে ফুলে ভরে যায় ওই অঞ্চল৷ শ্রীনগর থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরে ২৬৯০ মিটার উঁচুতে গুলমার্গ৷ শ্রীনগর থেকে গুলমার্গ যাওয়ার রাস্তাটা খুব সুন্দর৷ গুলমার্গের প্রধান আকর্ষণ গণ্ডোলা কেবল কার। এশিয়ার সর্বোচ্চ কেবল কার পরিষেবা৷ দুটো ফেজে চলে ওই কেবল কার। প্রথম ফেজ গুলমার্গ থেকে কংডোরি আর দ্বিতীয় ফেজ কংডোরি থেকে আফারওয়াট৷ সেখান থেকে চারপাশের তুষারাবৃত শৃঙ্গের দৃশ্য অসাধারণ৷ স্কিয়িং বা অন্যান্য উইন্টার স্পোর্টসের মজা উপভোগ করতে চাইলে যেতে হবে শীতকালে৷ গুলমার্গ তখন জমজমাট এসব খেলার আসরে৷ ‘দেখা এক খোয়াব তো ইয়ে সিলসিলে হুয়ে’— এরপর কাউকে আর মনে করাতে হবে না কাশ্মীরের জগদ্বিখ্যাত টিউলিপ গার্ডেনের কথা। যাঁরা সচক্ষে দেখেছেন শ্রীনগরের টিউলিপ ফুলের বাগান, তাঁদের স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট ফুটে আছে রঙিন বাগিচার দৃশ্য। ভূস্বর্গে শীতের শেষ ও বসন্তের আগমনের বার্তা বয়ে আনে টিউলিপ। হিমালয়ের কোল থেকে প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তি নিয়ে ফের ফুটে উঠেছে প্রায় ১৫ লক্ষ টিউলিপ। টিউলিপ ফুলের সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। টিউলিপ ফুল নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যায় না, তার কী সৌন্দর্য। টিউলিপ ফুলের সৌন্দর্য দেখতেই বারবার কাশ্মীর যেতে হবে, স্বর্গের রাজ্যে প্রবেশ করতে হবে। তবেই জীবনের এক অন্যতম সৌন্দর্যের সাক্ষী থাকা যাবে।

ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল টিউলিপ গার্ডেনে দেশের বহু সিনেমার শুটিং হয়েছে। এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম ওই টিউলিপ বাগিচা। ডাল লেকের ধারে শ্রীনগরের অতি পরিচিত এলাকা ওটি। মরশুমে ওই বাগানে গালিচার মতো নানা রঙের টিউলিপ ফুটে থাকে। লাল, গোলাপি, হলুদ, সাদা ছাড়াও অবর্ণনীয় বর্ণের ফুলের মেলা বসে ওই বাগানে।কত ধরনের টিউলিপের দেখা মেলে সেখানে! স্ট্যান্ডার্ড, ডাবল ব্লুম, প্যারট, ফ্রিন্জ, বাই কালার স্ট্যান্ডার্ড, লিলি জাতীয়, ট্রায়াম্ফ ও আরও অনেক ধরনের।

জম্মু-কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরকে বলা হয় ঝিলের শহর৷ ঝিলম নদী বয়ে গিয়েছে শহরের মাঝখান দিয়ে৷ লেকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ডাল লেক এবং নাগিন লেক৷ ডাল লেকে শিকারা বিহারের অভিজ্ঞতা অতুলনীয়৷ লেকের ভিতরে জলের উপরেই দোকানবাজার৷ কী বিক্রি হচ্ছে না সেখানে! কাশ্মীরি শাল, সোয়েটার, ব্যাগ, হস্তশিল্পের নানা জিনিস থেকে সাবান-শ্যাম্পু পর্যন্ত। শিকারা করে ঘুরতে ঘুরতে গলা ভেজানো হল গরম গরম কাশ্মীরি চা দিয়ে৷ ডাল লেকে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি হাউসবোট৷ ইচ্ছা করলে হোটেলে না থেকে হাউসবোটেও থাকা যায়৷ ওই হাউসবোটগুলো কেরালার ব্যাক ওয়াটারের হাউসবোটের মতো ঘুরে বেড়ায় না, একজায়গাতেই স্থির থাকে৷

লেক ছাড়া শ্রীনগর বিখ্যাত মুঘল গার্ডেনসের জন্য৷ চশমাশাহি, শালিমার বাগ, নিশাতবাগ— প্রত্যেকটি বাগানই খুব সুন্দর। ওই বাগানগুলিতে বেশকিছু শতাব্দীপ্রাচীন চিনার গাছ রয়েছে৷ শালিমারবাগ ১৬১৯ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করেছিলেন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গির তাঁর স্ত্রী নূরজাহানের জন্য৷

অন্য পোস্ট: সফরনামা ১: সিকিমের অশেষ পাহাড়ি সৌন্দর্য

পাহাড়ের উপর রয়েছে শঙ্করাচার্য মন্দির৷ মন্দিরে ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা নিষিদ্ধ৷ পাহাড়ের উপর থেকে পুরো শ্রীনগর শহরের সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়৷ ডাল লেকেরই একপাশে আছে শ্বেতপাথরের কারুকার্যখচিত হজরতবাল মসজিদ৷ সেখানে আছে হজরত মহম্মদের মাথার চুল৷

শ্রীনগর থেকে ১৪ কিলোমিটার পূর্বে রয়েছে ক্ষীর ভবানী মন্দির৷ ওই মন্দিরটিও বেশ বড় চত্বর নিয়ে অবস্থিত৷ জলের কুণ্ডের উপর বিরাজমান দেবী ভবানী৷ ওই মন্দির চত্বরেও অনেক পুরোনো চিনার গাছ চোখে পড়ে৷ সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল। আপেলের সময় নয়৷ তবে প্রচুর আপেল গাছ দেখা গেল বাগানগুলিতে। একের পর এক শুধু আপেল গাছ৷ নয়নমুগ্ধকর দৃশ্যই বটে! তবে আপেল গাছে আপেলের ফলন দেখতে হলে শরৎকালে কাশ্মীর যেতে হবে। রাস্তার ধারে ধারে অযত্নে আগাছার মতো বেড়ে ওঠা ডালিম গাছে ডালিম ধরে থাকতেও দেখলাম৷ এছাড়া আছে আখরোট আর নানারকম ড্রাই ফুডের গাছ। কাশ্মীর ঘোরার পথে অনেক জায়গাতেই চোখে পড়বে। আর আছে ক্রিকেট ব্যাটের কারখানা এবং তার সামনে থাক থাক করে সাজানো ব্যাট৷ ব্যাটের দোকানও আছে অনেক৷

জম্মু-কাশ্মীর ভ্রমণ শেষ হয়েছিল কাটরা দিয়ে৷ শ্রীনগর থেকে সড়কপথে গেলাম কাটরা৷ বৈষ্ণোদেবী দর্শনের জন্য যাত্রা সেখান থেকেই করতে হয়৷ ত্রিকূট পাহাড়ের উপর বৈষ্ণোদেবীর মন্দির অবস্থিত৷ পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়া ঘোড়ায় চড়ে বা ডুলিতেও যাওয়া যায়৷ রয়েছে হেলিকপ্টারও৷ তবে হেলিকপ্টারের টিকিট এক মাস আগে ইন্টারনেট থেকে না কাটলে পাওয়া মুশকিল৷ বৈষ্ণোদেবী দর্শনের জন্য কাটরায় সারা বছর ভিড় থাকে৷ যাত্রা শুরু করার আগে পড়চি অফিস থেকে পড়চি সংগ্রহ করা অতি আবশ্যক, না হলে মন্দিরে যাওয়া যাবে না৷ তবে কাটরা থেকে বৈষ্ণোদেবী ভবন পর্যন্ত আসা-যাওয়া ১৪ কিলোমিটার+১৪ কিলোমিটার=২৮ কিলোমিটার হেঁটে ওঠা এবং নামা করা বয়স্ক তীর্থযাত্রীদের পক্ষে কষ্টকর তো বটেই।

এভাবে জম্মু দিয়ে শুরু করে কাটরায় গিয়ে শেষ হয়েছিল আমাদের জম্মু-কাশ্মীর ভ্রমণ৷ কিন্তু ওই ভ্রমণ নিছক বেড়ানো ছিল না, বরং হয়ে উঠেছিল পুরাণের গল্পকথা, ইতিহাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে আর অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাক্ষী হয়ে এক অনন্য অবিস্মরণীয় যাত্রা৷

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

ভ্রমণ দোঁহা ১০

ভ্রমণ দোঁহা ৯

ভ্রমণ দোঁহা ৮

ভ্রমণ দোঁহা ৭

ভ্রমণ দোঁহা ৬

ভ্রমণ দোঁহা ৫

ভ্রমণ দোঁহা ৪

ভ্রমণ দোঁহা ৩

ভ্রমণ দোঁহা ২

ভ্রমণ দোঁহা