শান্তি দে
ভারতের পূর্বাঞ্চলের দুই প্রাচীন সাংস্কৃতিক ভূখণ্ড— একদিকে বাংলার লালমাটি, অন্যদিকে উৎকলের শাস্ত্রবহুল ঐতিহ্য। এই দুই সংস্কৃতির মিলনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলির অন্যতম বাঁকুড়া। এখানে বসবাসকারী উৎকল ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় শুধু এক ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়, তাঁরা ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় হয়ে উঠেছেন এক সাংস্কৃতিক সেতু, যাঁদের অবদান ছাড়া বাঁকুড়ার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস অসম্পূর্ণ। উৎকল ব্রাহ্মণদের আগমন, তাঁদের প্রভাব, অবদান, সংঘাত, স্বীকৃতি ও বর্তমান পরিচয়ের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
উৎকল অর্থাৎ আজকের ওড়িশা প্রাচীনকাল থেকেই পুরোহিত, পণ্ডিত ও সংস্কৃতজ্ঞদের জন্মভূমি। উৎকল ব্রাহ্মণ নামটি এসেছে ইতিহাসের সে সময় থেকে, যখন এই ব্রাহ্মণরা পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয়, আচারসংক্রান্ত ও শাস্ত্রীয় ভূমিকা পালনের জন্য যাত্রা শুরু করেন।
বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর শাসন করত শক্তিশালী মল্ল রাজবংশ। ধর্ম ও স্থাপত্যপ্রেমী রাজারা নিজেদের রাজত্বকে সমৃদ্ধ করতে উৎকল অঞ্চল থেকে দক্ষ পুরোহিতদের আমন্ত্রণ জানান। কারণ ছিল— বৈদিক যজ্ঞে দক্ষতা, সংস্কৃত ও শাস্ত্রে পারদর্শিতা, কঠোর আচারানুশাসন। সে সময় থেকেই উৎকল ব্রাহ্মণদের বাঁকুড়ায় প্রথম বড় বসতি গড়ে ওঠে।
বাঁকুড়ার মন্দির স্থাপত্য যেমন বিশ্বখ্যাত, তেমনই তাদের আচার-পদ্ধতি গভীর। এ দুইয়ের সংযোগসূত্র হিসাবে উৎকল ব্রাহ্মণদের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। বিষ্ণুপুরের শিখর, রাসমঞ্চ, জোড়বাংলা— এসব মন্দির পুজো পদ্ধতি ও আচার উৎকল শাস্ত্রের অনুসরণ করেছে বহুদিন। মন্দিরের দৈনিক নৈবেদ্য, যজ্ঞ ও হোম, বার্ষিক উৎসব, সব ক্ষেত্রেই উৎকলীয় বৈদিক ঐতিহ্যের ছাপ দেখা যায়।
উৎকল ব্রাহ্মণদের হাত ধরে বাঁকুড়ায় ছড়ায় জগন্নাথ উপাসনা। রথযাত্রা, নবকলেবর রীতি, মহাপ্রসাদের ধারণা— এসবই উৎকল সংস্কৃতির ছোঁয়ায় বাঁকুড়ার ধর্মজীবনকে সমৃদ্ধ করেছে।
উৎকল ব্রাহ্মণদের অন্যতম প্রধান অবদান সংস্কৃত শিক্ষা বিস্তার। বাঁকুড়ার বহু গ্রামে গড়ে ওঠে টোল, যেখানে পড়ানো হত বেদ, পুরাণ, ন্যায়, ব্যাকরণ, মীমাংসা। অনেক ক্ষেত্রে টোলগুলি রাজপৃষ্ঠপোষকতায় চলত, আর শিক্ষার মান এতটাই উচ্চ ছিল যে, দূরবর্তী জেলা থেকেও ছাত্ররা বাঁকুড়ায় আসতেন। বাঁকুড়াকে শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে উৎকল ব্রাহ্মণদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
বাঁকুড়া জেলার বহু অঞ্চলে উৎকল ব্রাহ্মণদের থেকে আসা সংস্কৃতির ছোঁয়া আজও টিকে আছে—
খাদ্যসংস্কৃতি
পিঠার বিশেষ ধরন, শুদ্ধ নিরামিষ রান্নায় উৎকলীয় স্বাদ, প্রসাদ প্রস্তুতির পৃথক নিয়ম।
লোকাচার
পূর্ণিমা ও অমাবস্যা ব্রতের রীতি, গৃহযজ্ঞ, নান্দীমুখ, উপনয়ন সংস্কারে উৎকল পদ্ধতির ব্যবহার।
ভাষা
কিছু গ্রামে ওড়িয়া শব্দের মিশ্রণ আজও শোনা যায়— এ এক নীরব ঐতিহাসিক চিহ্ন।
উৎকল ব্রাহ্মণরা কঠোর আচার-সংহিতা মেনে চলতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁরা স্থানীয় সমাজের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যান যে, আজ তাঁদের আলাদা অস্তিত্ব বোঝা যায় শুধু পারিবারিক ঐতিহ্যে। সমাজজীবনে উৎকল ব্রাহ্মণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পুরোহিত, শিক্ষক, পঞ্জিকা রচয়িতা, মন্দির পরিচালক, বিবাহ-আচার বিশেষজ্ঞ হিসাবে তাঁরা দায়িত্ব পালন করেন। ফলে বাঁকুড়ার সমাজ-অর্থনীতি ও ধর্মজীবনে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান তৈরি হয়।
আজকের দিনে দেশ-বিদেশে কর্মসূত্রে অনেক উৎকল ব্রাহ্মণ পরিবার ছড়িয়ে গেলেও তাদের ঐতিহ্য বাঁকুড়ার সংস্কৃতির অঙ্গ। জগন্নাথ উপাসনা, মন্দিরে পুজোর বিশেষ রীতি, শাস্ত্রোচ্চারণ, পরিবারিক আচার, এসব প্রজন্মপরম্পরায় টিকে রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে অনেক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু সংস্কৃতির মূল সত্তা রয়ে গিয়েছে হাতে-কলমে, যা আজও বাঁকুড়াকে সমৃদ্ধ করে। এই ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি প্রমাণ করে, সংস্কৃতি কখনও সীমান্ত মানে না। বাঁকুড়া ও উৎকলের শতাব্দীপ্রাচীন সম্পর্ক দেখায়, মানুষের চলাচল, জ্ঞান ও ঐতিহ্যের বিনিময়ই ইতিহাসকে গতিশীল করে তোলে। উৎকল ব্রাহ্মণদের ইতিহাস তাই শুধু একটি সম্প্রদায়ের বিবরণ নয়, বরং বাংলা–উৎকল সভ্যতার এক যৌথ উত্তরাধিকার। তাঁরা গড়েছেন মন্দির, শিক্ষা, আচার ও জনজীবনের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস, যা আজও বাঁকুড়াকে আলাদা পরিচয় দেয়।
