রাহুল মুখার্জি

ভগবান বদ্রীনাথ ধামে ধ্যানমগ্ন, রামেশ্বরম ধামে স্নান ও শৃঙ্গার রত, দ্বারকায় শায়িত হলেও শ্রীক্ষেত্র পুরীতে তিনি মূলত ভোজনরসিক। তাই তো পুরীধামেই আমরা পাই মহাপ্রসাদ। সে কারণে পুরীধামের ভোগের মাহাত্ম্য অসীম। এখানে শ্রীভগবানের নিত্যসেবা হয় ৫৬ রকমের ভোগ দিয়ে।
লোকবিশ্বাস, স্বয়ং মাতা লক্ষ্মীদেবীই প্রতিদিন প্রভু জগন্নাথের জন্য ভোগ রান্না করেন। জগন্নাথ দেবের ভোগ গ্রহণের পর মাতা বিমলাদেবী প্রসাদ গ্রহণ করেন। তার পর সেটি অপরাপর দেবতাদের উৎসর্গ করা হয়। তাই এটি মহাপ্রসাদ নাম জগদ্বিখ্যাত। এই মহাপ্রসাদে থাকে ৯ রকমের চালের পদ, ১৪ রকমের সবজি, ৯ রকমের দুধজাত দ্রব্য, ১১ রকমের মিষ্টি, ২৩ রকমের পিঠাপুলি, মালপোয়া ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য।
জগন্নাথের ৫৬ রকমের মহাভোগের পদগুলি হল— ১) উকখুড়া অর্থাৎ মুড়ি, ২) নাড়িয়া কোড়া অর্থাৎ নারকেল নাড়ু, ৩) খোয়া অর্থাৎ খোয়া ক্ষীর, ৪) দই, ৫) পাচিলা কাঁদালি অর্থাৎ টুকরো টুকরো কলা, ৬) কণিকা অর্থাৎ সুগন্ধী ভাত, ৭) টাটা খিঁচুড়ি অর্থাৎ শুকনো খিঁচুড়ি, ৮) মেন্ধা মুন্ডিয়া অর্থাৎ বিশেষ ধরনের কেক, ৯) বড়া কান্তি অর্থাৎ বড় কেক, ১০) মাথা পুলি অর্থাৎ পুলি পিঠে, ১১) হামসা কেলি অর্থাৎ মিষ্টি কেক, ১২) ঝিলি অর্থাৎ একধরনের প্যান কেক, ১৩) এন্ডুরি অর্থাৎ নারকেল দিয়ে তৈরি ভাপা মিষ্টি, ১৪) আদাপচেদি অর্থাৎ আদা দিয়ে তৈরি চাটনি, ১৫) শাক ভাজা, ১৬) মরিচ লাড্ডু অর্থাৎ লঙ্কার লাড্ডু, ১৭) করলা ভাজা, ১৮) ছোট্ট পিঠে, ১৯) বারা অর্থাৎ দুধ তৈরি মিষ্টি, ২০) আরিশা অর্থাৎ ভাত দিয়ে তৈরি মিষ্টি, ২১) বুন্দিয়া অর্থাৎ বোঁদে, ২২) পাখাল অর্থাৎ পান্তা ভাত, ২৩) খিড়ি অর্থাৎ দুধভাত, ২৪) কদমবা অর্থাৎ বিশেষ মিষ্টি, ২৫) পাত মনোহার মিষ্টি ২৬) তাকুয়া মিষ্টি, ২৭) ভাগ পিঠে, ২৮) গোটাই অর্থাৎ নিমকি, ২৯) দলমা অর্থাৎ ভাত ও সবজি, ৩০) কাকারা মিষ্টি, ৩১) লুনি খুরুমা অর্থাৎ নোনতা বিস্কুট, ৩২) আমালু অর্থাৎ মিষ্টি লুচি, ৩৩) বিড়ি পিঠে, ৩৪) চাড়াই নাডা মিষ্টি ৩৫) খাস্তা পুরি, ৩৬) কাদালি বারা, ৩৭) মাধু রুচি অর্থাৎ মিষ্টি চাটনি, ৩৮) সানা আরিশা অর্থাৎ রাইস কেক, ৩৯) পদ্ম পিঠে, ৪০) পিঠে, ৪১) কানজি অর্থাৎ চাল দিয়ে বিশেষ মিষ্টি, ৪২) দহি পাখাল অর্থাৎ দই ভাত, ৪৩) বড় আরিশা, ৪৪) ত্রিপুরি, ৪৫) সাকারা অর্থাৎ সুগার ক্যান্ডি, ৪৬) সুজি ক্ষীর, ৪৭) মুগা সিজা, ৪৮) মনোহরা মিষ্টি, ৪৯) মাগাজা লাড্ডু, ৫০) পানা, ৫১) অন্ন, ৫২) ঘি ভাত, ৫৩) ডাল, ৫৪) বিসার অর্থাৎ সবজি, ৫৫) মাহুর অর্থাৎ লাবরা এবং ৫৬) সাগা নাড়িয়া অর্থাৎ নারকেলের দুধ দিয়ে মাখা ভাত৷
তবে শ্রীক্ষেত্র পুরীতে যারা গিয়েছে, তারা সকলেই অবগত আছে পুরীধামের রান্নাঘরের মাহাত্ম্য সম্পর্কে। এখানে শুধু ৫৬ নয়, ১০৮ রকমের ভোগও রান্না করা হয় এবং বিশেষ ক্ষেত্রে ১৫৬ রকমের রান্নার পর শ্রীজগন্নাথের উদ্দেশে অর্পণ করা হয়। শ্রীক্ষেত্রে রান্নাঘরটিও যেন তীর্থক্ষেত্র। প্রতিদিন ৭৫২টি উনুনে রান্না হয়। ৬০০ জন রাঁধুনি এবং ১,০০০ জন সহকারী এ কাজ করে থাকেন নিষ্ঠা সহকারে।
অন্য পোস্ট: বিবেকানন্দ ও সুফিবাদের চিন্তায় ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়
আশ্চর্যের বিষয়, এই পাকশালায় কোনও বৈদ্যুতিক বাতি নেই। কুপি বা লম্ফ জ্বেলে দক্ষ পান্ডারা রান্না করে যাচ্ছেন সেই আদ্যিকাল থেকে আজ পর্যন্ত একইভাবে। সব রান্নাই হয় মাটির হাঁড়িতে। কোনও ধাতব পাত্র ব্যবহার করা হয় না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, উনুনে একটি হাঁড়ির উপর আর একটি হাঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে পরপর ন’টি হাঁড়ি চাপানো থাকে। আর শেষ হাঁড়িটির নীচে থাকে আগুনের গনগনে আঁচ। কিন্তু সবচেয়ে উপরের হাড়ির রান্না শেষ হয় সবার প্রথমে। একে মহালক্ষ্মীর কৃপা ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে!
তবে এ বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হল, স্তরে স্তরে নির্দিষ্ট মাপের হাঁড়িগুলির এক্কেবারে নীচেরটিতে থাকে বেশি পরিমাণে চাল, ডাল, জল ইত্যাদি। এভাবে আনুপাতিক হারে সবার উপরের হাঁড়িটিতে সবচেয়ে কম পরিমাণে চাল, ডাল, জল ইত্যাদি থাকায় বাষ্পের মাধ্যমে প্রাপ্ত তাপে সেটির দ্রব্যাদিই আগে সেদ্ধ হয়।

