মফিজুল তরফদার

মানব আত্মার গভীরতম আকাঙ্ক্ষা এক সর্বব্যাপী, অদৃশ্য, অথচ অনিবার্য বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া। এই অন্বেষণের পথে যাঁরা যাত্রা করেছেন, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যায় এক বিস্ময়কর সাদৃশ্য, বিশেষত স্বামী বিবেকানন্দ ও সুফি সাধকদের চিন্তাধারায়। যদিও ভিন্ন ঐতিহ্য ও ভাষায় রচিত, কিন্তু তাঁদের অন্তর্লক্ষ্য ছিল অভিন্ন— এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরের সন্ধান, যিনি নাম, রূপ ও ধর্মের সীমা অতিক্রম করে বিরাজমান।
বেদান্তের ‘অদ্বৈত’ ও ঈশ্বরচিন্তা
বেদান্তের অদ্বৈতবাদ বিশেষত শঙ্করাচার্য প্রবর্তিত, যা স্বামী বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক ভাবনার কেন্দ্রে ছিল। এই মতানুসারে, ব্রহ্মই একমাত্র সত্য, বাকি সব মায়া। ঈশ্বর, আত্মা ও জগৎ— এই তিনটি বস্তু পরস্পর পৃথক নয়, এক অভিন্ন সত্যের তিনটি প্রকাশ। বিবেকানন্দ এই চিন্তার ভিত্তিতে বলেন, ‘We are not human beings having a spiritual experience. We are spiritual beings having a human experience.’ এই উপলব্ধি থেকে স্পষ্ট হয়, ঈশ্বর কেবল একজন দূরবর্তী স্রষ্টা নন, বরং চেতন ও অচেতনের মধ্যে বিদ্যমান এক সর্বব্যাপী একত্ব। তাঁর দৃষ্টিতে ঈশ্বর কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের একচেটিয়া অধিকার নয়, বরং সকল প্রাণীর হৃদয়ে বিরাজমান এক অন্তর্যামী চৈতন্য।
সুফিবাদের ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’: অস্তিত্বের একত্ব
সুফিবাদের গভীর আধ্যাত্মিক পরম্পরায় ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ (Wahdat al-Wujud) অর্থাৎ ‘অস্তিত্বের একত্ব’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ইবনে আরাবি প্রবর্তিত এই চিন্তা অনুযায়ী, জগতে যা কিছু আছে, সবই ঈশ্বরের বহিঃপ্রকাশ। বাহ্যিক বহুত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অভিন্ন অস্তিত্ব। সুফিরা বলেন, ‘La ilaha illallah’— এ বাক্য কেবল বিশ্বাসের নয়, বরং আত্মার উপলব্ধির প্রকাশ। একমাত্র তিনিই আছেন, আর যা কিছু দেখছি, তা তাঁরই ছায়া। সুফিদের চোখে ঈশ্বর কেবল নামমাত্র নয়, বরং প্রেম, সৌন্দর্য, দয়া ও গোপন আলোর উৎস।
অন্তর্যাত্রার দুই পথ: জ্ঞান ও প্রেম যেখানে বিবেকানন্দ জ্ঞানের মাধ্যমে ঈশ্বরের উপলব্ধির পথ দেখান আত্মপবিত্রতা, ধ্যান ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে, সেখানে সুফি সাধকরা বেছে নেন প্রেম ও সমর্পণের পথ। কিন্তু লক্ষ্য অভিন্ন, ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হওয়া। বিবেকানন্দ বলেন, ‘The highest truth is this, God is present in every being.’ সুফিরাও বলেন, ‘Man arafa nafsahu faqad arafa rabbahu’— যে নিজেকে চেনেছে, সে তার প্রভুকে চিনেছে। এই দু’টি উক্তি থেকেই বোঝা যায়, আত্মজ্ঞানই ঈশ্বরজ্ঞান। পথ ভিন্ন হলেও অভিযানের গন্তব্য এক ও অভিন্ন।
ঈশ্বরতত্ত্বের বহুত্ববাদী ব্যাখ্যা
বিবেকানন্দ ও সুফিবাদ, উভয়ই ঈশ্বরকে এক ও অদ্বিতীয় বলে মানলেও তারা ঈশ্বরের উপলব্ধিকে সীমিত রাখে না কোনও একক ধর্ম, রূপ বা অনুশীলনের মধ্যে। সুফিদের গান, কাওয়ালি, ধ্যানে যেমন বহুরূপ ঈশ্বর প্রকাশিত, তেমনই বিবেকানন্দের বেদান্ত ঈশ্বরকে দেখে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি মানুষে। উভয়েরই ঈশ্বরচিন্তায় রয়েছে এক গভীর সহনশীলতা, যেখানে তাঁর নামে বিভাজন নয়, বরং মিলনের ভাষা রচিত হয়।
একত্বের আহ্বান
বিবেকানন্দ ও সুফিবাদের ঈশ্বরচিন্তা এক বৃহৎ অন্তরাত্মার দিকচিহ্ন, যেখানে ঈশ্বর কেবল উপাসনার বিষয় নয়, বরং আত্মপ্রকাশ, প্রেম ও সত্যের সর্বোচ্চ রূপ। তাদের চিন্তা আমাদের শেখায় যে, ঈশ্বরকে খোঁজা মানে নিজেকেই খোঁজা এবং এই খোঁজে যদি সত্যিকারের প্রেম ও বোধ থাকে, তবে পথে না থেকেও পথিক হওয়া যায়। তাদের এই একত্ববাদ আমাদের জন্য আজও প্রাসঙ্গিক, ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিপরীতে এক বৃহৎ আধ্যাত্মিক দিগন্তের দিকে আহ্বান। সেখানে ঈশ্বরের নাম নেই, রূপ নেই, কিন্তু অনুভব রয়েছে, প্রেম রয়েছে এবং সর্বোপরি এক গভীর নিঃশব্দ আত্মীয়তা রয়েছে।
