ভাস্কর সেনগুপ্ত

‘রণে, বনে, জঙ্গলে যখন বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিবে। আমি তোমাকে রক্ষা করবই।’ এ কথাটা শোনেনি, এমন বাঙালি নেই বললেই চলে। কিন্তু সত্যি সত্যিই বিপদে পড়ে ক’জন বাঙালি রক্ষা পাবেই, এ প্রত্যয় নিয়ে স্মরণ নিয়েছে। যে স্মরণ করেছে, সে রক্ষা পেয়েছে। চাঁদ আর সূর্যের মধ্যে তুলনা হয় না। অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা হয় না। যার যখন সময় হবে, সে তখন জ্বলে উঠবে।
আজকের যুগের যে ইঁদুর দৌড়ে যুব সম্প্রদায় হতাশায় নিমজ্জমান, তা থেকে নিস্তার পাওয়ার অতি সহজ উপায় লোকনাথ বাবাই দেখিয়েছেন। ১ জুন তাঁর তিরোধান দিবস। যদি বাংলার বাঙালির গত পাঁচশো বছরের ইতিহাস অনুসন্ধান করা যায়, তাহলে আমরা দেখতে পাব, বহু সাধু-মহাত্মা এখানে আবির্ভূত হয়েছেন। তবু বাঙালির এই দুর্দশা কেন? একটি ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করি।
নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে যখন বন্দি করে টেনেহিচঁড়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন বহু মানুষ হাঁ করে নীরব দর্শকের মতো সে দৃশ্য উপভোগ করেছিল। শুধু তাই নয়, পিঠে ছুরিকাঘাত করার আগে নবাবকে কাঁটাওয়ালা সিংহাসনে বসিয়ে ও ছেঁড়া জুতো দিয়ে পিটিয়ে যখন অপমান করা হচ্ছিল, তখন হাজার হাজার মানুষ সে তামাশা দেখে ব্যাপক বিনোদিত হয়েছিল! মাস সাইকোলজিটা একটু খেয়াল করে দেখুন, এ জাতি দু’শো বছরের গোলামি সাদরে গ্রহণ করেছিল সেভাবেই।
একটি মজার তথ্য আছে। লর্ড ক্লাইভ তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিখেছেন, নবাবকে যখন ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন দাঁড়িয়ে থেকে যারা এসব প্রত্যক্ষ করেছিল, তারা যদি একটি করেও ঢিল ছুড়ত, তাহলে ইংরেজদের করুণ পরাজয় বরণ করতে হত। আরও চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, প্রায় ১০ হাজার অশ্বারোহী, ৩০ হাজার পদাতিক এবং বহু কামান, গোলাবারুদ-সহ বিশাল সুসজ্জিত সেনাবাহিনী নিয়েই পলাশির ময়দানে এসেছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। কিন্তু তাঁর বিপরীতে রবার্ট ক্লাইভের সেনাসংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার, যার মধ্যে ৯০০ জনই ছিল হাতেপায়ে ধরে নিয়ে আসা শৌখিন ব্রিটিশ অফিসার, যাদের অধিকাংশেরই তরোয়াল ধরার মতো প্রশিক্ষণ ছিল না। তারা কোনওদিন যুদ্ধও করেনি। এতকিছু জেনেও রবার্ট ক্লাইভ যুদ্ধে নেমেছিলেন এবং জিতবেন জেনেই নেমেছিলেন। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, একটি হীনমন্য ব্যক্তিস্বার্থলোভী দ্বিধাগ্রস্ত জাতিকে পরাস্ত করতে খুব বেশি আয়োজনের প্রয়োজন নেই। বড় সৈন্যবাহিনী এদের জন্য মশা মারতে কামান দাগার মতো। যাদের সামান্য দাবার চালেই মাত করে দেওয়া যায়, তাদের জন্য হাজার হাজার সৈন্যের জীবনের ঝুঁকি তিনি কেন নেবেন? এছাড়াও মীরজাফরকে যখন নবাবির টোপ গেলানো হয়, রবার্ট ক্লাইভ তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন যে, সিরাজকে পরাজিত করার পর এই বদমায়েশটি-সহ বাকিগুলির পরিণতিও তাদের নবাবের মতোই হবে এবং হয়েছেও তাই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মীরজাফর, উমিচাঁদ, রায়বল্লভ, ঘসেটি বেগম-সহ প্রত্যেকটি বেইমানের করুণ মৃত্যু হয়েছে।
রবার্ট ক্লাইভ মীরজাফরের বেইমানির ওপর ভরসা করে যুদ্ধ করতে আসেননি। তিনি যুদ্ধে নেমেছিলেন বাঙালির মানসিকতা নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ আন্দাজ করে। তিনি জানতন, যুদ্ধশেষে জনসমক্ষে নবাবকে হেনস্থা করলে এ জাতি বিনোদনে দাঁত কেলাবে কিংবা হাঁ করে চেয়ে চেয়ে দেখবে। তাই বিনাদ্বিধায় সার্টিফিকেট দেওয়াই যায়। বাঙালি জাতির মানসিকতা সবচেয়ে নিখুঁতভাবে মাপতে পারা ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তিটির নাম রবার্ট ক্লাইভ।
এখনও সময় আছে। এবার বাঙালিকে পালটাতে হবে। তবেই একদিন যা যা নিজের, তা বাঙালি ফেরত পাবে। তখনই সার্থক হবে লোকনাথ বাবাকে স্মরণ করা।
