দয়াময় পোদ্দার

আপাতত অপারেশন সিঁদুর স্থগিত। তার পর থেকেই ইতি-উতি প্রশ্ন উঠছিল, এটাকে আদৌ যুদ্ধ বলা যায় কি না। মোটা দৃষ্টিতে দেখলে হয়তো যুদ্ধ মনে হবে না, কিন্তু দেশ ভাগের পর থেকে পাকিস্তান ভারতের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদীদের এবং সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা দ্বারা নিয়মিত ছায়াযুদ্ধ করে আসছে। তার শেষ হামলা হল গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পাহেলগাম পর্যটনস্থানে।
কাশ্মীর থেকে শুধু হিন্দু পরিচয় দেখে স্থানীয় কাশ্মীরি পণ্ডিত-সহ হিন্দুদের তাড়ানোর পর এই হামলাটি ছিল দ্বিতীয়, যেখানে পর্যটকদের ধর্মীয় পরিচয় জেনে, নিশ্চিত হয়ে তার পরে তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। শুধু পুরুষদের হত্যার পরে সঙ্গী মহিলাকে ছেড়ে দিয়ে, ‘যাও, মোদিকে বলো’ বলার মধ্যে সরাসরি ভারতকে হুমকি দেওয়ার উগ্র স্পর্ধা দেখিয়েছে সন্ত্রাসবাদীরা। আর এই হামলার সঙ্গে যে পাকিস্তান সরাসরি যুক্ত, তার প্রমাণ ভারতের তরফে যতটা দেখানো হয়েছে, তার চেয়ে বেশি পাকিস্তান দেখিয়েছে। তাদের প্রাক্তন সেনাপ্রধান যেমন স্বীকার করেছেন বিভিন্ন সময় ভারতে সংঘটিত সন্ত্রাসবাদী হামলার কথা, তেমনই তাঁদের সংসদে দাঁড়িয়ে নেতা-মন্ত্রীরা, এমনকী বিরোধী দলের সাংসদ, নেতারা পর্যন্ত বীরদর্পে হামলার বিশদ বর্ণনা করেছেন। এটা যেন প্রতিযোগিতা, তাঁদের কোন পার্টির সরকার ভারতে কত বড় হামলা করতে পারে। সে প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ভারত সরকারের সামনে প্রত্যাঘাত ছাড়া বিকল্প কোনও পথ খোলা ছিল না।
ছায়াযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ হলেও ভারতের পক্ষ থেকে এই অপারেশন সিঁদুর ছিল ঘোষিত এবং আক্রমণাত্মক। এটাই তেজ অপারেশন সিঁদুরের। স্বামীকে হত্যা করে স্ত্রীকে বিধবা বানিয়ে সেই নারীর মাধ্যমে হুমকি পাঠানো!
হিন্দু সংস্কৃতিতে নারীর কাছে সিঁদুরের গুরুত্ব জীবনের সমান, পুরুষের কাছেও। পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদীরা টার্গেট করেছিল ধর্ম এবং হিন্দু সংস্কৃতিকে। তাই ভারতের অপারেশনের নাম যথার্থ। আর এই প্রত্যাঘাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন দু’জন নারী অফিসার। দেবী দুর্গার প্রতিমূর্তি।
এমন প্রেক্ষাপটে ভারতে থাকা দেশবিরোধী শক্তিগুলি তাদের দাঁত-নখে শান দিচ্ছিল। কোথাও কোথাও তাদের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতেও দেখা গিয়েছে। সরকার যথাসম্ভব প্রয়াস করছে সেই প্রদর্শিত শক্তিকে নিরস্ত করার। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে এই আবহের মধ্যে বামপন্থীরা দু’টি মিছিল বের করেন তাঁদের চিরাচরিত নীতি এবং স্বভাবজাত প্রকাশে। যখন এই ক্রান্তিকাল পরিস্থিতিতে জনগণ দেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বদ্ধপরিকর, ঠিক তখনই কলকাতায় বামেদের মিছিলের উদ্দেশ্য ছিল, ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’। আর সেটা যে তাদের মুখোশ, তারা সেটা সে মিছিলেই খুলে দিল ভারত বিরোধিতার নামে।
অন্য পোস্ট: নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে নতুন ভারত হামলা হলে জবাব দিতে জানে
সেই মাটি, সেই পশ্চিমবঙ্গ, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে যা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে বসেছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে এই একটুকরো ভূমি পাওয়া গিয়েছিল বাঙালিদের জন্য। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাম আমল থেকে কেন্দ্রের প্রতি অন্ধ বিরোধিতা করতে করতে রাজ্য এবং রাজ্যের মানুষ যেন তাতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় যেটা উন্নয়নে বাধা তৈরি করে। দীর্ঘমেয়াদিভাবে এ অবস্থা চলতে থাকলে রাজ্যের উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা, দু’টিই বিপন্ন হতে বাধ্য। ঠিক এরকম পরিস্থিতির মধ্যে বামফ্রন্টের প্রথম সারির নেতারা যে পরিচয় রাখলেন, সেটা শুধু লজ্জাজনকই নয়, ভারতের কাছে বাঙালি জাতির মাথা হেঁট করে দেওয়াও। ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে যদি আপনি বিক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘কীসের ভারত?’ সেটা সরাসরি রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। যাঁরা এসব বলছেন, তাঁদের নাম এখানে বলা যায়। কিন্তু একটি-দু’টি নাম বললে বিষয়টির গুরুত্ব কমে যায়, কেননা এই বামফ্রন্টই চিন-ভারত যুদ্ধের সময় সরাসরি চিনের পক্ষে পথে নেমেছিল।
যখন পাহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর সীমান্তের ওপার থেকে পাকিস্তানি সেনার দ্বারা বিনা প্ররোচনায় গুলিবর্ষণ হয়, তখন অপারেশন সিঁদুরের বিকল্প ছিল না ভারত সরকারের কাছে। দেশের মানুষ যখন সরকারের পাশে, দল, ধর্মমত নির্বিশেষে, ঠিক তখনই কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে কলকাতায় বামফ্রন্টের মিছিলে পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলা নিয়ে সন্দেহপ্রকাশ করা হয়। এমনকী এটা কেন্দ্র সরকারের সাজানো ঘটনা বলে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। ভারতের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হয় এবং পাকিস্তানি জনগণের জন্য মনকে কাঁদিয়ে বানভাসি করে দেয়, অথচ এরাই পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলায় ভারতের মানুষ মারা গেলে চুপ থাকে। এছাড়া যখন অপারেশন সিঁদুর চলছিল, তার পরে ভারতের কোনও শহরে শান্তির নামে মিছিল করে কেউ ভারত বিরোধী বক্তব্য রাখেনি। শুধু কলকাতায় হল বামফ্রন্টের দ্বারা। সারা ভারতের কাছে এতে কলকাতার ভাবমূর্তি নিশ্চয়ই উজ্জ্বল হয়নি?
