
সময়টা মোটামুটি সাধক শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্য অর্থাৎ আমার প্রথম সংগীত গুরু ছোট কাকার চলে যাওয়ার একবছর বা দু’বছর আগের। সেদিন ছিল রামনবমী। ছোট কাকা তখন থাকতেন কলকাতার কাকুলিয়া রোডের বাড়িতে। সেই রামনবমীতে তিনি এলেন বালি বারেন্দ্রপাড়ার বাড়িতে। সঙ্গে এলেন মানব কাকা, প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সন্তু কাকা, বাংলা গানের আর এক কিংবদন্তি সনৎ সিংহ এবং আরো অনেকেই। তাঁদের মধ্যে সুরকার, গীতিকারও ছিলেন। সবার নাম মনে নেই। আসলে সে সময়ের কথা এখন অনেকটাই ধূসর আমার এখনকার বয়সের ভারে।
সেদিন আমাদের বাড়িতে শ্রীরামচন্দ্রের বিশেষ পুজো ছিল। বাবা প্রতিদিনই শ্রীরামচন্দ্রের পুজো করতেন। আমাদের পরিবার ধর্মে শাক্ত, কিন্তু মন্ত্রে বৈষ্ণব। তাই আমাদের বাড়ির ঠাকুরঘরে মা কালীর যেমন পুজো হত, তেমনই শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণের পুজোও হত। প্রতিদিন। আর নিত্যপুজো হত আমাদের আজকের বারেন্দ্রপাড়ার বাড়িতে, যে ঘরে থাকে আমার ছোট ভাই দেবাশিস, তার পাশেই ঠাকুরঘরে আমাদের গৃহদেবতা বাণলিঙ্গ শিবের। আমার বাবাই প্রতিদিন পুজো করতেন বারেন্দ্রপাড়ার বাড়িতে। রামনবমীর পুজোও বাবাই করেছিলেন।
এখানে আর একটা কথা বলা দরকার। আমাদের পরিবারে, মানে ভাদুড়ি বংশে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের প্রতি ভক্তি চিরদিনই ছিল। আমরা ভাদুড়িই। তবে আমার ঠাকুরদা প্রাপ্ত উপাধি ভট্টাচার্য ব্যবহার করতেন। যাই হোক, আমার ঠাকুরদা সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বাবা কালীচরণ এবং The Levitating Saint যোগ-ভক্তি মার্গের সিদ্ধ সাধক ‘ভাদুড়ি মহাশয়’ অর্থাৎ মহর্ষি নগেন্দ্রনাথের বাবা পার্বতীচরণ ছিলেন দুই ভাই। পরমহংস যোগানন্দ পশ্চিমে যাওয়ার আগে যাঁর আশীর্বাদ মাথায় করে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই মহান যোগী ভাদুড়ি মহাশয়ও সম্পূর্ণ সজ্ঞানে পদ্মাসনে বসে তাঁর পার্থিব দেহ ত্যাগের শেষ মুহূর্তে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের কথাই বলেছিলেন।

যাই হোক, সেদিন শ্রীরামচন্দ্রের ভজন আমার বাবা গেয়েছিলেন। বাবা প্রতিদিনই পুজোর সময় শ্রীরামচন্দ্রের নাম গানেও নিতেন। বাবার মুখে প্রতিদিনই শুনেছি, ‘জয় জয় জয় রঘুপতি রাঘব রাজা রাম।…’। বাবার গান গাওয়ার পর মানব কাকাও শ্রীরামচন্দ্রের গান গেয়েছিলেন। আর ছোট কাকা গেয়েছিলেন ভজন। ছোট কাকার গলায় সে গান শুনে সবাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। সেখানেই ঠিক হয়েছিল, ছোট কাকাকে দিয়ে রামচন্দ্রের গান গাওয়ানো হবে। তাতে বাংলা গানে সুর দেবেন আমার বাবা, মানব কাকা। পরবর্তীতে সেই অনুসারে গানও লেখা হয়েছিল। কে বা কারা গান লিখেছিলেন স্মরণে নেই। তবে বাবা একটা গানে সুর দিয়েছিলেন। মনে হয়, সে গানটা বাবা নিজেই লিখেছিলেন।

তারপর ছোট কাকার হঠাৎ চলে যাওয়াটা আসলে ছিল একটা বিরাট বিপর্যয়ের চেয়েও অনেক বড় কিছু। প্রিয় ছোট ভাইয়ের অকালে চলে যাওয়াটা আমার বাবা, আমার মেজো কাকা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যকেও ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। সেই অভিশপ্ত দিনের কথা মনে পড়লে এখনও চোখের জল সামলাতে পারি না। তবে এটা আমি বলতে পারি, ছোট কাকা যদি সত্যি সত্যিই শ্রীরামচন্দ্রের গানগুলি গেয়ে যেতে পারতেন, তবে নিশ্চিতভাবে তাঁর গাওয়া শ্যামাসংগীতের মতো সেগুলিও অমরত্ব লাভ করে বাঙালির সংগীতের ধারায় রয়ে যেত চিরদিনের হয়ে।
অনুলিখন: ড. শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
