সিদ্ধার্থ সিংহ
কবে, কোথায়, কীভাবে যে প্রথম শঙ্খ ঘোষের মুখোমুখি হয়েছিলাম, তা আমার এখন আর মনে নেই। তবে হাডকো থেকে সল্টলেক ঢোকার মুখে শঙ্খ ঘোষ যে আবাসনে থাকতেন, সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমবায় নিবাসে বহু বছর আগে আমি গিয়েছিলাম। না, শঙ্খ ঘোষের কাছে নয়। গিয়েছিলাম আমার এক বন্ধুর বাবার শ্রাদ্ধে। তিনি থাকতেন নিউ আলিপুরে। যুগান্তর যখন রমরম করে এগিয়ে চলেছে, ঠিক সেই সময় যুগান্তরকে পিছনে ফেলে আনন্দবাজার গোষ্ঠীকে যে গুটিকয়েক সাংবাদিক এবং সাহিত্যিক আজকের আনন্দবাজার সংস্থায় পরিণত করেছেন, তার মধ্যে যিনি অবশ্যই একজন, তাঁর নাম সন্তোষকুমার ঘোষ। তাঁর ছেলে সায়ন্তন ঘোষ ওরফে টিটু ছিল আমার কলেজের বন্ধু। আমার থেকে দু’ক্লাস উঁচুতে পড়লেও ওর সঙ্গে আমার এতটাই ঘনিষ্ঠতা ছিল যে, মাঝেমধ্যেই দুপুরে খাওয়ার জন্য ওর বাড়িতে চলে যেতাম। পরে আনন্দবাজারে বেশ কিছুদিন ওকে আমার সহকর্মী হিসাবেও পেয়েছিলাম। এখন ‘বর্তমান’ পত্রিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট। ওর দিদি, মানে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর পুত্রবধূ মিলুদি, যাঁর ভালো নাম কাকলি, তিনি যে আমার কত লেখা বর্তমান পত্রিকায় ছেপেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।
সেই টিটু থাকত ওই ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসের ঠিক পাশেই। বিধান নিবাসে। ওখানেই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়েছিল সন্তোষকুমার ঘোষের। আমি একা নয়, আমার সঙ্গে গিয়েছিলেন রমাপদ চৌধুরী, রাধানাথ মণ্ডল, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছাড়াও আরও অনেকে। তাঁদের কেউ কেউ যখন ওই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের মধ্যেই পাশের ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসে শঙ্খ ঘোষের বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছিলেন, তখন আমি সঙ্গে গেলেও শঙ্খ ঘোষের এ-১/৬ ফ্ল্যাটে ঢুকিনি। ফলে সেখানে শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে আমার আলাপ হয়নি। আলাপ হয়েছে অনেক পরে।
অন্য পোস্ট: সমাজসেবায় অনন্য নিদর্শন চকোলেট দাদুর কীর্তি
হঠাৎ একদিন সক্কালবেলায় দেখি, আমাদের বাড়ির ল্যান্ডফোনে একটা কল। রিসিভার তুলতেই ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল, ‘আপনি এই রাধাদাসের খবরটা কোত্থেকে পেলেন?’
রাধাদাস! ষোড়শ শতাব্দীর এই রাধাদাসের কথা তো বৈষ্ণব সাহিত্যরসিকরাও জানেন না। জানেন না তাঁর লেখা কাব্য ‘কৃষ্ণলীলামৃত গীত’-এর কথাও। আমি তো সবেমাত্র একটি প্রবন্ধে প্রথম লিখেছি তাঁর কথা। সে প্রবন্ধ তো তখনও ছাপা হয়নি। তাহলে ইনি জানলেন কী করে! ইনি কে?
তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে বলছেন?
ফোনের ও প্রান্ত থেকে উনি বললেন, ‘আমি শঙ্খ ঘোষ।’
বুঝতে পারলাম কেউ মজা করছে, যেমন আমিও অনেক সময় করি। সদ্য বিয়ে করা কোনও বন্ধুকে আচমকা মধ্যরাতে ফোন করে বলি, তুই ঘুমিয়ে পড়েছিস নাকি? কী করছিস? কিংবা অন্য কোনও বন্ধুকে খুব গম্ভীর গলায় ফোন করে বলি, আমি লালবাজার থেকে বলছি অথবা ঘাবড়ে দেওয়ার জন্য বলি, আপনি যা করছেন, ঠিক করছেন না। আপনি যা করেছেন এবং আপনি যা করবেন, আমরা সব জানি। খুব সাবধান। এখনই সতর্ক হোন। না হলে কিন্তু বিপদে পড়ে যাবেন।
অন্য পোস্ট: প্যারিস অলিম্পিক্স ও ভারত
কয়েকজন বন্ধু আছে, যারা আমার মতো মাঝেমধ্যে ফোন করে এমন কথা বলে, যা চমকে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। ফলে আমি অনুমান করলাম, কেউ না কেউ ইয়ার্কি মারছে। কারণ শঙ্খ ঘোষ আমাকে ফোন করার লোক নন। আমি বহুবার তাঁর বাড়িতে গিয়েছি। কখনও মল্লিকা সেনগুপ্ত আমাকে পাঠিয়েছেন সানন্দা পত্রিকার কোনও লেখা আনার জন্য। কখনও গিয়েছি তাঁর সঙ্গে কথা বলে ‘বাবু-বিবি সংবাদ’-এ কিছু লেখার জন্য অথবা অন্য কেউ পাঠিয়েছে আমাকে ওঁর একটি ছোট্ট সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। যতবারই গিয়েছি এবং যতটা তাঁকে দেখেছি এবং চিনেছি, তাতে আমার একবারও মনে হয়নি, উনি আমাকে ফোন করতে পারেন এবং তার চেয়েও বড় কথা, ফোন করতে হলে তো আমার ফোন নম্বর ওঁর কাছে থাকতে হবে! আমার নম্বর উনি খামোখা সেভ করে রাখতে যাবেন কেন! সুতরাং উনি আমাকে ফোন করেছেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর উনি যখন ফোন করেননি, তার মানে কেউ না কেউ আমার সঙ্গে চ্যাংড়ামি করছে। তো, আমার সঙ্গে যদি কেউ চ্যাংড়ামি করে, আমি কেন তার সঙ্গে চ্যাংড়ামি করব না? তাই উনি যখন আমাকে বললেন, ‘আমি শঙ্খ ঘোষ’, আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, হ্যাঁ, বলুন, আমি অমিতাভ বচ্চন বলছি।
আমি এই কথাটা বললাম ঠিকই, কিন্তু ফোনের ও প্রান্ত হঠাৎ করেই একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। বুঝলাম, ফোনের ও প্রান্তে যিনি রয়েছেন, তিনি এটা নিতে পারেননি কিংবা ভেবেছেন, আমি হয়তো ওঁর কথাটা শুনতে পাইনি। তাই কয়েক মুহূর্ত থমকে থেকে খুব আস্তে করে কেটে কেটে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আমি শঙ্খ ঘোষ বলছি।’ ওঁর বলার ধরন দেখে আমি থতমত খেয়ে গেলাম। না, কেউ চ্যাংড়ামি করছে না। উনি শঙ্খ ঘোষই। তাই গলার স্বর নামিয়ে বললাম, হ্যাঁ, বলুন। উনি বললেন, ‘আপনি যে ‘কৃষ্ণকীর্তনে নতুন সংযোজন রাধাদাস’ প্রবন্ধটা লিখেছেন, এই লেখাটির তথ্য আপনি কোথা থেকে পেলেন? কোন বইয়ে আছে?’
আমি তাঁকে বললাম, পুরুলিয়ার যুধিষ্ঠির মাজির বড় ছেলে শিবপ্রসাদ মাজি একটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করেছিলেন। সেই গীতিকাব্যটির নাম ‘কৃষ্ণলীলামৃত গীত’। লিখেছিলেন রাধাদাস। না, রাধা দাস নয়, কারণ তখনও নামের শেষাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পদবি তৈরি হয়নি।
ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্তে যে রাধানাথ দাসের কথা উল্লেখ করেছেন, ইনি কিন্তু তিনি নন। তিনি ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি এবং অতি দুর্বল পদকর্তা। তাঁর সঙ্গে এঁর কোনও সম্পর্ক নেই।
ডা. ক্ষুদিরাম দাস এই পাণ্ডুলিপি অতি মূল্যবান বলে জানালেও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমি কিন্তু এই কাব্যটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার ন্যূনতম আগ্রহও দেখায়নি। ফলে ১৯৯৮ সালের ২১ জুন তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর বাবা যুধিষ্ঠির মাজি নিজেই উদ্যোগ নিয়ে বইটি ঠিকঠাক মতো সাজিয়ে, সম্পাদনা করে শেষ পর্যন্ত অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অধ্যাপক ড. দিলীপকুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় যে ‘রাধাদাস প্রণীত কৃষ্ণলীলামৃত গীত’ প্রকাশ করেছেন, সেই বইটি থেকেই আমি এই তথ্যগুলো পেয়েছি।
অন্য পোস্ট: নারীজাতি আজও প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি
বুঝতে পারলাম, আমার বাড়ির খুব কাছেই প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র ‘আরেক রকম’ নামে যে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবন্ধের পত্রিকা বার করছেন, যে পত্রিকায় আমি মাঝেমধ্যেই লিখি, তাতে আমি যে প্রবন্ধটি দিয়েছি, যেহেতু শঙ্খ ঘোষ নিজেও ওই পত্রিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই সেই সুবাদে আমার এই গদ্যটি হয়তো তাঁর হাতে গিয়ে পড়েছে এবং উনি সেটা পড়েছেন। সেটি পড়ার পরেই তাঁর মনে খটকা লেগেছে, যে তথ্য কেউ জানে না, সেই তথ্য আমি জানলাম কোথা থেকে। তাই হয়তো উনি এই ফোনটি করেছেন। কোন বই থেকে আমি এই তথ্য পেয়েছি, তা জানার পরেই উনি বললেন, ‘সেই প্রকাশকের নাম এবং ঠিকানাটা আমাকে একটু দেবেন?’
আমি বললাম, আপনি চাইলে আমি আপনার মেয়ে সেমন্তীর হাতে এই বইটি পাঠিয়ে দিতে পারি। ও তো আমাদের নীচের ফ্লোরেই বসে। উনি বললেন, ‘না না, পাঠানোর দরকার নেই। আপনি শুধু প্রকাশকের নাম আর ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিন। আমি ঠিক সংগ্রহ করে নেব।’
এর ঠিক পরের রবিবার আমি যখন আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত আমার ‘পঞ্চাশটি গল্প’ বইটি তাঁকে দিতে গেলাম, তখন সেখানে আরও অনেকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কবি কালীকৃষ্ণ গুহ। তিনি মজা করে বললেন, ‘সিদ্ধার্থ, এটা তোমার কত নম্বর বই? চারশো, নাকি সাড়ে চারশো?’
আমি লজ্জা পেয়ে বলেছিলাম, না না, অত নয়। এটা আমার ২৫৪তম বই।
এ কথা শুনে শঙ্খ ঘোষ আমার দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়েছিলেন। সে দৃষ্টি আমি এখনও ভুলিনি। কোনওদিনও ভুলতে পারব কি!
