Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সমাজসেবায় অনন্য নিদর্শন চকোলেট দাদুর কীর্তি

তাপসকুমার চক্রবর্তীর মতো একজন সাধারণ মানুষের দুস্থদের কল্যাণে অসাধারণ কীর্তি তো ইতিহাস হয়ে থাকারই কথা। এ কৃতিত্বের মর্যাদা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, ভাবী প্রজন্মের কাছে এটা প্রত্যাশা নয়, দাবি।

বাচ্চা কোলে নিয়ে আদর করছেন তাপস চক্রবর্তী ওরফে চকোলেট দাদু (ডানদিকে দাঁড়িয়ে)।

Share Links:

সুদীপকুমার বল

করোনাকালে লকডাউনে স্কুল টানা বন্ধ ছিল। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপে অনলাইন ক্লাস কী, জানেই না প্রত্যন্ত এলাকার ছেলেমেয়েরা। কারও বাবা পরের জমিতে দিনমজুরের কাজ করেন। আবার কারও বাবা শহরে  ঠিকাশ্রমিক ছিলেন। লকডাউনে কাজ হারিয়েছেন। কেউ ভিনরাজ্য থেকে সব খুইয়ে বাড়ি ফিরেছেন। দু’বেলা পেট ভরাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে ডিজিটাল পরিষেবায় পড়াশোনা করা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয় গ্রামগঞ্জের গরিব পরিবারগুলোর কাছে।

এরকম পরিস্থিতিতে দুস্থ পরিবারের কচিকাঁচাদের জন্য করোনাকালে যখন সবাই আতঙ্কিত, তখন ভয় ঠেলে শিক্ষার মশাল জ্বেলেছেন যে শিক্ষানুরাগী ও পরোপকারী মানুষটি, তাঁর নাম তাপসকুমার চক্রবর্তী। তবে চকোলেট দাদু নামেই তাঁকে একডাকে চেনে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা তো বটেই, গোটা উত্তরবঙ্গের মানুষ। প্রান্তিক, অনগ্রসর ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর কাজ। আর তাই ২০২২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন বঙ্গরত্ন পুরস্কার।

শুধু ছোটদের জন্য শিক্ষার মশাল জ্বালানোই নয়, করোনাকালে ঘরবন্দি নিম্নবিত্তের ঘরে খাবারের সংকটে তো বটেই, তাছাড়াও সারা বছরই গ্রামের পর গ্রাম বাড়ি বাড়ি ঘুরে কার বাড়িতে ভাতের হাঁড়ি চড়ছে না, কোন শিশুদের খাবার নেই, কোন দুগ্ধপোষ্য শিশুর কৌটোর দুধের প্রয়োজন, কার পরনের কাপড় নেই, এমনকী কারও কোনও অসুখবিসুখ হয়েছে কি না, তাপসবাবু সে খবরও নেন এবং সাধ্যমতো সমস্যার সুরাহা করেন। রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ও সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য যাবতীয় অসুধ জোগান। বিপাকে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এ কাজ  তিনি করেন নিঃস্বার্থভাবে। সরকারি চুক্তিভিত্তিক চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকে ১৪ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে এসব কাজ করে চলেছেন। এই চাকরির কোনও অবসরকালীন ভাতা নেই। তাতে তাঁর ভয় নেই, ভ্রুক্ষেপও নেই। স্থানীয় ডাকঘরে থাকা নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়েই তিনি অসহায় পিছিয়ে পড়া মানুষগুলিকে সামাজিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ নিজের ঘরে রয়েছে বেকার শিক্ষিত ছেলে ও পুত্রবধূ। রয়েছেন নিজের স্ত্রীও। প্রত্যেক পরিবারেরই কোনও না কোনও সমস্যা থাকে।  কিন্তু তাপসবাবু নিজের সংসারে সেরকম কোনও সমস্যা বাসা বাঁধতে কখনও দেননি। বরং পরিবারের সবাই তাঁর এ কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্যই করে থাকেন। আর সেই সুবাদে প্রথমদিকে গ্রামে গিয়ে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের সঙ্গে ভাব জমাতে তাদের হাতে তুলে দিতেন চকোলেট। সেই চকোলেট দিয়ে ভাব জমিয়ে শুনে নিতেন তাদের কোন কোন জিনিসের প্রয়োজন। তারপর পরের দিন ফের সাইকেল চালিয়ে গ্রামগুলিতে গিয়ে ওই বাচ্চাদের হাতে তুলে দিতেন তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। ধীরে ধীরে বাচ্চাদের পাশাপাশি তাদের বাড়ি গিয়ে মা-বাবার অভাব-অভিযোগের খবর নিয়ে তা পূরণ করতে পরের দিন ফের সাইকেল চালিয়ে গ্রামে গিয়ে হাজির হতেন তাপস চক্রবর্তী। আস্তে আস্তে গ্রাম থেকে অঞ্চল, অঞ্চল থেকে ব্লক,  ক্রমে ব্লক ছাড়িয়ে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলির পাশে হাজির হতেন ছোটখাটো চেহারার তাপসবাবু, যিনি নিজের নামকে পাশে ঠেলে সবার প্রিয় চকোলেট দাদু হয়ে উঠেছেন।

অন্য পোস্ট: বিদেহী

তাপসবাবু তাঁর শৈশব থেকে গ্রামে ছিলেন। সেখান থেকে বালুরঘাটের কলেজে পড়াশোনা করেন। তারপর একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। সে সময় অল্প বেতন ছিল। তবু তাতেই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু স্কুলে ক্লাস করাতে গিয়ে যখন দেখতেন পিছনের সারিতে বসা পিছিয়ে পড়া আদিবাসী ঘরের কোনও ছাত্রের মুখ শুকনো, গ্রাম থেকে অভুক্ত অবস্থায় ক্লাসে এসে বসতে না বসতেই কেউ মাথা ঘুরে পড়ে গেল এবং ওই ছাত্রের সঙ্গে থাকা অন্য আদিবাসী সহপাঠীর মুখে তার বাড়িতে হাঁড়ি না চড়ার কথা জানতে পারতেন, তখন ভীষণ দুঃখ পেতেন। সেরকম আদিবাসী ছাত্রদের দুঃখ তাঁকে কুরে কুরে খেত। তা তিনি নিজের বুকের ভিতরেই চেপে রেখে মনে মনে শপথ করেছিলেন, যদি কোনওদিন সুযোগ আসে, তবে নিজেকে তাঁদের জন্য উজাড় করে দেবেন।

তারপর একদিন একটি ছোট্ট বিজ্ঞাপন তাপসবাবুর নজরে পড়ল। জেলার সরকারি এসসি ও এসটি দফতরে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ করা হবে। ব্যাস, বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করে বসলেন। ইন্টারভিউ হল। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম হলেন। নিয়োগপত্র হাতে পেয়েই শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে পিছিয়েপড়া আদিবাসী সমাজের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নের জন্য নিজেকে সঁপে দিলেন। সরকারি প্রকল্পের অর্থ যাতে সব গ্রামে সঠিক মানুষের হাতে পৌছয়, সেদিকে তাঁর তীক্ষ্ণ নজর ছিল। চাকরির সুবাদে এমনও হয়েছে, হাতের কাছে দফতরের কাউকে না পেয়ে বর্ষার সময় ত্রিপল, শীতের সময় কম্বল নিজে ঘাড়ে করে বাসের ছাদে উঠিয়ে সেগুলি গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছেন।

এসব ছিল তাপসবাবুর জেদ আর সুখের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে আদিবাসীদের জীবনযাত্রার উন্নয়নের লক্ষ্যপূরণের ইতিহাস। কিন্তু অবসর নিয়েও তিনি এ কাজ থেকে পিছিয়ে আসেননি। বালুরঘাট শহরের রথতলা পাড়ায় তাঁর দোতলা ছোট্ট বাড়ি। নীচের তিনটি ঘর খালি। চাইলে নীচের ঘরগুলো ভাড়া দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে পারতেন। কিন্তু না, সেসব ঘর ফাঁকা থাকে দূরদূরান্তের গ্রামের মানুষজনের জন্য। তাঁরা যখন কোনও সমস্যায় পড়েন বা অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা করাতে শহরে আসেন, তখন তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করার জন্য ওই ঘরগুলি তিনি প্রস্তুত রেখেছেন। কেউ হাসপাতালে ভর্তি হলে তাঁর পরিবারের লোকজন যেমন সেখানে থাকেন, তেমন মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও কলেজের পরীক্ষা দিতে আসা ছাত্রছাত্রীদের জন্যও তাঁর অবারিত দ্বার।

অন্য পোস্ট: পথ

গত ১৪ বছর ধরে প্রতিদিন ১০-২০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে হাজির হন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া গ্রামগুলির পিছিয়ে পড়া মানুষজনের কাছে। সত্তরোর্ধ্ব তাপসবাবু ওই এলাকায় পৌঁছে মানুষের সুবিধা-অসুবিধার কথা শোনেন। প্রতিদিন বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় দু’-তিন ব্যাগ বিভিন্ন সামগ্রী, সবজি, বই, খাতা, কলম, শুকনো খাবার এবং চকোলেট সঙ্গে রাখেন। দুস্থ, অসহায় মানুষের অসুবিধার কথা চকোলেট দাদুর কানে পৌঁছলে তিনি বসে থাকেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্যা না মেটে, ততক্ষণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। গ্রামে ঘুরে ঘুরে দুস্থ, অসহায় মানুষের খোঁজখবর নেন। এমনও হয়েছে, মাধ্যমিক পরীক্ষা চলাকালীন গ্রামের পরীক্ষার্থীদের নিয়ে পড়াশোনা চালাতে চালাতে রাত ১১টা বেজে গেলেও বাড়ি ফেরার  কথা মনে নেই তাঁর। হুঁশ ফেরে তখন, যখন কোনও পড়ুয়ার মা এসে বলেন, ‘এত রাতে তোকে আর বালুরঘাট যেতে দেওয়া হবে না। খাওয়াদাওয়া সেরে নে। ঘরে বিছানা করে দিয়েছি। ঘুমিয়ে পড়। কাল সকালে বাড়ি যাস।’ কিন্তু তাঁকে যে বাড়ি ফিরতেই হবে। না হলে পরিবারের সবাই চিন্তায় থাকবেন। অগত্যা গ্রামের মানুষের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে টর্চের আলোয় সাইকেল চালিয়ে  গ্রামের রাস্তা ধরে বাড়ির পথে।

কিন্তু সবদিন তো আর সমান যায় না। কোনওদিন মাঝরাস্তায় সাইকেলের চাকা পাংচার। শেষে হাঁটা। তারপরেও বিপদ কম নয়! সীমান্তে বিএসএফ-এর টহলের সামনে পড়ে ব্যাগ থেকে চকোলেট বের করে হাতে ধরিয়ে তবেই রেহাই। কেননা বিএসএফও ততদিনে জেনে গিয়েছে এই মানুষটি গ্রামের ছোটবড় সবার কাছের মানুষ— চকোলেট দাদু। বিএসএফ বাড়ি না ফিরে তাঁকে তাদের ক্যাম্পে রাতটুকু  থেকে যেতে বললেও তিনি রাজি হননি। অগত্যা সাইকেল ঠেলে গ্রামের রাস্তা ধরে ফের এগিয়ে যাওয়া।

অন্য পোস্ট: আন্দামান বাঙালিদের কাছে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র

বেশ কিছু দূর চলে যাওয়ার পর একবার পড়লেন এক মদ্যপ ব্যক্তির সামনে। সেই মানুষটি দূর থেকে সাইকেল চোর ভেবে চিৎকার করে বললেন, ‘কে যায়?’ তারপর দৌড়ে কাছে গেলেন চোর ভেবে। কিন্তু ‘চোর’কে দেখে তাঁর নেশা কেটে যাওয়ার অবস্থা। গলা দিয়ে একটা অস্পষ্ট স্বর বার করে বললেন, ‘তুই দাদু, এত রাতে!’ তারপর তাপসবাবুর কাছ থেকে সব শুনে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সাইকেল রেখে মোটর সাইকেল বের করে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দেন।

তাপসবাবু ছোট ছেলেমেয়েদের চকোলেট দিতেন। সেজন্য তিনি চকোলট দাদু বলে সকলের কাছে পরিচিত। ছোট থেকে শুরু করে বড়রাও চকোলেট দাদু বলেই তাঁকে ডাকেন। দুর্গাপুজোর সময় দুস্থ-অসহায় কচিকাঁচা থেকে শুরু করে বড়দের জন্যও নতুন নতুন বস্ত্র বিতরণ করেন। যেসব ছাত্রছাত্রীর বই কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য বিনামূল্যে বই দেন এবং যাদের টিউশন পড়ার টাকা নেই, তাদের বিনামূল্যে পড়ান।

এছাড়াও তাপসবাবু গ্রামে গ্রামে ঘুরে রক্তদান শিবিরের ওপর প্রাথমিক ধারণা দেন, রক্তদান শিবিরের আয়োজন করার উৎসাহ প্রদান করেন।

একজন সাধারণ মানুষের এমন অসাধারণ কীর্তি তো  ইতিহাস হয়ে থাকারই কথা। এ কৃতিত্বের মর্যাদা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, ভাবী প্রজন্মের কাছে এটা প্রত্যাশা নয়, দাবি।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি শ্রীহট্ট সম্মিলনীর সার্ধশতবর্ষ উদ্‌যাপন

বনগাঁর শতাব্দীপ্রাচীন শ্রীকৃষ্ণ চতুষ্পাঠী আজ অবহেলার নীরব সাক্ষী

বড়িশায় নেতাজির স্মৃতিধন্য ঐতিহাসিক অঙ্গনে আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসব

কাগজের কলম মাটিতে পুঁতলেই বেরোবে গাছের চারা

১৪ বছরের মেয়ের লেখা গল্প His Childhood Sweetheart

নেতাজির আদর্শে ছাত্র-যুবশক্তিকে একত্রিত করল জাগ্রত সংঘ

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য দৌড় কিংস্টন এডুকেশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের

রাসবিহারী বসু স্মৃতি পুরস্কারের অর্থ গবেষণায় দান করেছেন শমীকস্বপন ঘোষ

জন্মদিনে অভিনব উদ্যোগ, হাওড়ায় দরিদ্র সেবা

বনগাঁর ইউনাইটেড ক্লাবের পুজোয় ঘুঁটের অভিনব দৃশ্যায়ন