সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

নাৎসি আদর্শ বলে, জার্মানিক জাতিসমূহ, যেমন, জার্মান, ফ্লেমিশ, ডাচ, ইংরেজ ও স্ক্যান্ডিনেভীয়, এরাই খাঁটি আর্য এবং প্রভুর জাত। জার্মান রক্ত ও আর্যদের বৈদেশিক জাতিসমূহের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। দক্ষিণ ইউরোপীয়, স্লাভিক জনগণ, বিশেষত ইহুদি ও জিপসিদের সবাইকে বিদেশি বলে চিহ্নিত করা হল। নন-জার্মানিক জনগণকে মেরে ফেলতে হবে। এমনকী জার্মানিক লোকদের মধ্যে যারা দুর্বল ও অকর্মণ্য, তাদেরও মেরে ফেলতে হবে। এরা কারা? এরা ভবঘুরে, মাতাল, পাগল, দিব্যাঙ্গ, চোর, অপরাধী, জরাগ্রস্ত, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত, পতিতা, হিজড়া, সমকামী, যাযাবর বা জিপসি বা রোমানি এবং অবশ্যই ইহুদিরা। এর ফলে এক সুউন্নত মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতি সৃষ্টি হবে।
হিটলার নিজে বিশ্বাস করতেন ও অন্যদের করিয়েছিলেন যে, মানব সংস্কৃতির প্রতিটি প্রকাশ, শিল্প, বিজ্ঞান এবং কারিগরি দক্ষতায় উৎপাদিত বস্তু, যা আজ আমরা আমাদের চোখের সামনে দেখতে পাই, তা প্রায় একচেটিয়াভাবে আর্য সৃজনশীল শক্তির উৎপাদিত বস্তু। এটি এই সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি সমর্থন করে যে, একমাত্র আর্যরাই উন্নত মানবতার প্রতিষ্ঠা করেছিল, তাই আমরা যাকে ‘মানুষ’ বলি, তিনিই তার আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি হলেন মানবজাতির প্রমিথিউস, যাঁর উজ্জ্বল কপাল থেকে সর্বদা প্রতিভার ঐশ্বরিক স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছে। সর্বদা তিনি সে আগুনকে নতুন করে প্রজ্বলিত করেছেন, যা জ্ঞানের আকারে অন্ধকার রাতকে আলোকিত করে রহস্যের আবরণ সরিয়ে দিয়ে মানুষকে দেখিয়েছে, কীভাবে পৃথিবীর অন্যান্য সমস্ত প্রাণীর ওপর কর্তৃত্ব করতে হয়। যদি তাঁকে অদৃশ্য হতে বাধ্য করা হয়, তাহলে পৃথিবীতে গভীর অন্ধকার নেমে আসবে। কয়েক হাজার বছরের মধ্যে মানব সংস্কৃতি অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং পৃথিবী মরুভূমিতে পরিণত হবে। হিটলার ছিলেন তাদের নতুন রাজা। বলতে গেলে, তিনিই জার্মান জাতি।
হিটলারের আরও কিছু অদ্ভুত ধারণা ছিল, যা নিটশে ও অন্যান্য জার্মান দার্শনিকের মতবাদের বাস্তব রূপায়ণের চেষ্টার প্রতিফল। তিনি বিশ্বাস করতেন, বুদ্ধিমান ও সবল লোকদের অধিকার আছে কম বুদ্ধিমান ও দুর্বল লোকদের ওপর প্রভুত্ব করার। শেষোক্ত লোকরা কোনও কিছুর অধিকারী নয়। আরও একটি বিশ্বাস যে, অধস্তনরা ঊর্ধ্বতনদের মানতে বাধ্য থাকবে। ভোলকিশ জাতীয়তাবাদ তাঁর আদর্শের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রকৃতির গুরুত্ব, একজন নাইটোচিত ত্রাণকর্তা (এক্ষেত্রে হিটলার) এবং উচ্চতর আর্যদের প্রতি বিশ্বাসকে কেন্দ্রে রেখে সব আবর্তিত হবে। ইহুদি-বিদ্বেষ ভোলকিশ আন্দোলনের একটি মূল উপাদান এবং জার্মান ইতিহাসের রক্ষণশীল দলগুলিতে স্থায়ী অন্তর্নিহিত ধারা হিসাবে রয়ে গিয়েছে এবং বহু বছর পরে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিণত হয় যে, ইহুদিরা আদর্শ সমাজের পথে একমাত্র বাধা।
জার্মানির নতুন আবিষ্কৃত ভোলকিশ জাতীয়তাবাদী নেতা হিসাবে হিটলার জাতিগত (এথনিক) জাতীয়তাবাদের এক নীতি শুরু করেন, যা ইহুদি এবং অন্যান্য চিহ্নিত শত্রুদের নির্মূল করার নির্দেশে পরিপূর্ণ। কারণ নাৎসিবাদ শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের ধর্ম হয়ে ওঠে এবং অযৌক্তিকতাকে আদর্শগত কাঠামোয় মুড়ে বাস্তবে পরিণত করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর জার্মান জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তিনি কোনও নিরাপদ স্থানে আত্মগোপন করেননি। তিনি আত্মহত্যা করেন। সঙ্গে ছিলেন কিছুক্ষণ আগে বিয়ে করা স্ত্রী ইভা ব্রাউন।
