ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া
![]()
প্রখ্যাত রম্যলেখক শিবরাম চক্রবর্তী ‘দেবতার জন্ম’ শীর্ষক গল্পের অবতারণা করেন। এর মাধ্যমে আধুনিক যুগের মানুষের দ্বারা কীভাবে দেবতার উৎপত্তি তত্ত্ব জনমানসে প্রতিষ্ঠিত হয়, গণ-হিস্টিরিয়ার সঞ্চার করে, সে সম্পর্কে একটি রসজ্ঞ কাহিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন। বিশ শতকের মধ্যভাগে রচিত গল্পটির আবেদন একুশ শতকেও সবেগে প্রবহমান।
বহু কৃতবিদ্য লেখক তাঁদের রচনায় ‘দেবতার মন্দির মধ্যে অবস্থান’-কে বক্রভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সাধক মনোমোহন দত্ত থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ বিষয়ে লেখনী ধারণ করেছেন। কিন্তু শিবরাম তাঁর গল্পে দেবতার প্রচার ও প্রসারে মতলবিয়ানার যে জ্বলজ্বলে চিত্র অঙ্কন করেছেন, তা খুবই চিত্তাকর্ষক।
শিবরাম চক্রবর্তী বোহেমিয়ান জীবনযাপন করতেন বলেই মানুষের যাপনচর্চাকে খুব কাছ থেকে নিরীক্ষণ করেছেন। তাঁর জীবন ছিল খুবই বৈচিত্রময়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আহ্বানে রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল। তিনি জেল খেটেছেন। রাস্তায় খবরের কাগজ ফেরি করেছেন, ফুটপাতে রাত্রিযাপন করেছেন, আজীবন উত্তর কলকাতার মুক্তারামবাবু লেনের মেস বাড়িতে থেকেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন বিজলী, যুগান্তর ও ফরোয়ার্ড পত্রিকায়। তাঁর এই বিচিত্র প্রকার অভিজ্ঞতা মানুষের মনকে যথাযথভাবে পড়তে পেরেছিল। সেজন্য ‘দেবতার জন্ম’ বিষয়ে মানুষের কেরামতি তাঁর রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে।
গল্পটির সংক্ষিপ্তসার হল, লেখকের বাড়ি ও বড় রাস্তার মাঝে একখণ্ড পাথরের অবস্থান তাঁর যাত্রাপথে প্রায়শই বিঘ্ন তৈরি করত। লেখক দু’-একবার চরম বিপদের মধ্যেও পড়েছিলেন। সেজন্য তিনি তাঁর অবসরমতো দিনে ওই প্রস্তরখণ্ডটি যত্ন সহযোগে উৎপাটন করে রাস্তার পাশে এক নিরাপদ জায়গায় পুঁতে দেন। এই ঘটনা একজন অভিসন্ধিপরায়ণ ব্যক্তির দৃষ্টিগোচর হলে তিনি সকলের অজান্তে সেই প্রস্তরখণ্ডকে এক বটবৃক্ষের নীচে প্রোথিত করেন। ক্রমে ক্রমে সেই স্থানে ভক্তিমানদের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয় এবং মূর্তিটিকে মন্দির মধ্যে রেখে পূজার্চনা শুরু হয়। রাস্তার পাথরের এই পরিণতি লেখককে ক্রোধান্বিত করলেও সাধুসন্তদের উপস্হিতি ও জনতার ভক্তিযোগের ভয়ে তিনি নীরবতাকেই শ্রেয়তর জ্ঞান করেন। এরপর একদিন ‘মায়ের দয়া’ উপস্থিত হয়। লেখক হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি চিকিৎসা করিয়ে হতোদ্যম হয়ে এই পাথরের শরণাপন্ন হয়ে মস্তকাবনত হন। তিনিই যে পাথরটিকে মাটি খুঁড়ে বের করেন, সে ঘটনা বেমালুম ভুলে যান। এটাই হয়তো দশচক্রে ভগবানের ভূত হওয়ার নিদর্শন।
একুশ শতকেও শিবরামের গল্পের পাষাণ দেবতাকে স্বমহিমায় রাজত্ব করতে দেখা যাচ্ছে। যে অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে উনিশ শতকীয় নবজাগরণ ক্ষুরধার যুক্তির জাল বুনেছিল, তা জনতার হৃদয় হরণ করতে পারেনি। কুসংস্কারের নৈবেদ্যর ডালি সাজিয়ে আজও বহুল সংখ্যক মানুষ দেবতার করুণা লাভে উদগ্রীব। গণগুজব ভক্তিমার্গে যারপরনাই গুরুত্ব সঞ্চারে সফল। প্রতিপত্তিশালীরাও এই আঁচে আপন আপন লাভের খেজুর রসে জ্বাল দিতে তৎপর। এরই ফলস্বরূপ অগণিত মন্দির মানুষের চাওয়া-পাওয়া মেটানোর ঠিকা নিয়ে প্রবল পরাক্রমে তার অস্তিত্ব প্রকাশে মরিয়া হয়ে উঠেছে। মঙ্গল গ্রহ বা চন্দ্রাভিযানে নারকেল ফাটানো, জীবাণুনাশের জন্য শঙ্খ ও কাঁসরধ্বনিতে পরিত্রাণ পাওয়ার প্রচেষ্টা এখন সমাজের উচ্চকোটির মানুষের সহজাত। আর নিম্নকোটির মানুষ দেবতার আশীর্বাদ লাভে অগুনতি মন্দির নির্মাণে কৃতসংকল্প।
আসলে সমাজকাঠামোয় নেতির বিড়ম্বনা প্রাতিষ্ঠানিক হওয়ায় মানুষের অগ্রাধিকারের শর্তগুলি অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। পেশাগত চাপ এতটাই ক্রমবর্ধমান যে, ব্যক্তিমানুষ ক্রমশ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অধিবাসীতে পর্যবসিত হয়েছে। ‘মুক্তি, ওরে মুক্তি কোথায় আছে?’ এই হৃদয় বিদারক ধ্বনি আজ হাহাকারে পরিব্যাপ্ত। অন্যদিকে বেকারত্বের ঊর্ধ্বগতি অকেজোপনার উদ্যমে বাঁধনহীন- লাগামছাড়া। সেই সুযোগে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসপ্রসূত ধারণা ভূতের নাচন সৃষ্টিতে পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠেছে। কাজ পেলে ব্যস্ততা বাড়ত। কাজ নেই, তাই ঠাকুর মন্দির তৈরিই কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
