প্রোজ্জ্বল মণ্ডল

দুর্গাপুজো হল মহাপুজো। এ হল শক্তির আরাধনা। প্রচলিত মত অনুসারে দুর্গামূর্তি তৈরিতে বেশ্যা অর্থাৎ পতিতাদ্বারের মাটি ব্যবহৃত হয়। এ নিয়ে সনাতনীদের অনেক কটাক্ষ শুনতে হয়। কিন্তু দুর্গামূর্তি তৈরিতে পতিতাদ্বারের মাটি লাগে না। এটি একটি কুপ্রথা, যার শাস্ত্রীয় কোনও প্রমাণ নেই। আসলে শাস্ত্রীয় বিধান ঠিকঠাক না বুঝেই আমরা ঘোর অন্যায় করে চলেছি। শাস্ত্রে বেশ্যা কথার অর্থ পতিতা নয়। শাস্ত্রীয় মতে, দুর্গামূর্তি তৈরিতে বেশ্যাদ্বারের মাটি লাগে। তবে এই বেশ্যা মানে পতিতা নয়।
এ সম্পর্কে শাস্ত্রীয় আলোচনা করা যাক। মহানির্বাণ তন্ত্রে ভগবান শিব দেবী পার্বতীকে বলেছেন, ‘অভিষিক্তা ভবেদ্বেশ্যা ন বেশ্যা কুলটা প্রিয়ে৷/ কুলটা সঙ্গমাদ্দেবি রৌরবং নরকং ব্রজেৎ৷৷’ অর্থাৎ তন্ত্রে অভিষিক্তা রমণীই হলেন বেশ্যা। এই বেশ্যা পতিতা বা কুলটা নয়। সাধক যদি কুলটা তথা পতিতার সংস্পর্শে আসেন, তাহলে তাঁকে রৌরব নামক নরকে গমন করতে হয়।
ভগবান শিব এই তন্ত্রে অভিষিক্তা রমণীদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘পূর্ণাভিষেকো দেবেশি দশবিদ্যাবিধোস্মৃত।।’ অর্থাৎ কালী, তারা, ভুবনেশ্বরী প্রভৃতি দশ মহাবিদ্যার সাধনায় যে সমস্ত রমণী সিদ্ধিলাভ করেছেন, তাঁরাই তন্ত্রে উল্লেখিত বেশ্যা। এখন এঁদের বেশ্যা বলা হয় কেন, তার কথাও শাস্ত্রে পাওয়া যায়, ‘বেশ্যাবৎ ভ্রমতে যস্মাৎ তস্মাৎ বেশ্যা প্রকীৰ্ত্তিতা৷’ এঁরা ব্রহ্মবিদ্যার অধিকারিণী বলে বেশ্যার মতো চারণ করেন অর্থাৎ সন্ন্যাসীর মতো ঘুরে বেড়ান। তাই এঁদের বেশ্যা বলা হয়।
এছাড়া শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে, ‘বেশ্যা তু ন পতিতায়াং বশ্যং ত্রিলোকং ততৌ বেশ্যা।’ অর্থাৎ এই বেশ্যা কোনও পতিতা নয়, ত্রিলোক যাঁর কাছে বশীভূত, তন্ত্রে সেই অভিষিক্তা নারীই বেশ্যা। শাস্ত্রে আরও উল্লেখিত আছে, দিব্যশক্তির্বীর শক্তিস্তাসাং সংজ্ঞা প্রকীৰ্ত্তিতা৷ অর্থাৎ এই নারীরা বীরশক্তি নামে অভিহিত হন। এঁরা বিভিন্ন দিব্যশক্তির অধিকারিণী হন। এঁরা কালী, তারা, এসব দেবীর আবরণ দেবী। তাই সাধারণ বুদ্ধিতে এঁদের প্রকৃতি নিরূপণ করা সম্ভব নয়। ভগবান শিব দশ মহাবিদ্যার দেবীদের সঙ্গে এঁদের পুজো-উপাসনা করার কথাও বলেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, নারীমাত্রই দুর্গার অংশ এবং তাঁদের সকলকে দেবীজ্ঞানে শ্রদ্ধা করা মহামায়ার শ্রেষ্ঠ উপাসনা ও সকল নারীর মধ্যে দেবীর প্রকাশ হলেও এই অনাচার তথা দুর্গামূর্তিতে পতিতাদ্বারের মাটি ব্যবহার মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু অবশ্যই তন্ত্রে অর্থাৎ দশ মহাবিদ্যায় সিদ্ধিপ্রাপ্ত অভিষিক্তা নারী, যাঁর কাছে ত্রিলোক বশীভূত হয়েছে, তাঁর দ্বারের মাটি ব্যবহার করে দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণ করতে হয়।
