ডা. সতীনাথ ভট্টাচার্য
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের শহর এখন সংস্কারের জোয়ারে ভাসছে। অতি সম্প্রতি দ্বিতীয়বার অঙ্গরাগ হয়ে গেল নজরুল স্মৃতিধন্য হেরিটেজ ভবন গ্রেস কটেজের। কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় আড়াই বছর সপরিবারে কাটিয়ে গিয়েছেন এই বাড়িতে। কৃষ্ণনগরের ভূমিপুত্র কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মভিটা সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছে পূর্ব রেল। কিন্তু রবীন্দ্রপদধূলিধন্য রানিকুঠি পড়ে রইল উপেক্ষা ও অবহেলার আস্তাকুঁড়েই। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, কেউই এই ঐতিহাসিক বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে মাথা ঘামাতে চান না।
কৃষ্ণনগরে ডন বস্কো রোডের পাশে মেরি ইমারকুলেট হসপিটালের উত্তর দিকে বিরাট মাঠের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আজ মৃত্যুর প্রহর গুনছে রানিকুঠি। ছাদের একাংশ ভেঙে পড়েছে। দেওয়াল ও জানালা-দরজা জরাজীর্ণ। দরজার উপরে, ছাদে বটগাছ জন্মেছে। চারদিকে আগাছা, গাছগাছালি, লতাপাতা গজিয়ে উঠেছে। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ২১ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন রানিকুঠিকে হেরিটেজের মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু সংস্কারের কোনও নামগন্ধ নেই।
দুর্গাদাস চৌধুরী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে কৃষ্ণনগরে আসার পর এক সাহেবের কাছ থেকে এই বাড়িটি কিনে নেন। তখন থেকে এই বসতবাড়ি হয়ে যায় চৌধুরী পরিবারের বাড়ি। এই পরিবারেরই সুসন্তান বাংলা সাহিত্যের ‘বীরবল’ প্রমথ চৌধুরী। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রামতনু লাহিড়ি, অতুলপ্রসাদ সেন প্রমুখ গুণীজনের যাতায়াত ছিল এই চৌধুরী বাড়িতে। দুর্গাদাস চৌধুরীর তিন ছেলে ও এক মেয়ে, আশুতোষ, কুমুদনাথ, প্রমথ ও প্রসন্নময়ী। চৌধুরী পরিবারের অনেকেই বাংলা সাহিত্যের সাধনায় মনোনিবেশ করেছিলেন। আশুতোষ চৌধুরীর লেখক হিসাবে বেশ নামডাক ছিল। কুমুদনাথ চৌধুরী ছিলেন সুবিখ্যাত শিকারি। বাঘ শিকার করতে গিয়ে বাঘের হাতেই প্রাণ যায় তাঁর। প্রসন্নময়ী দেবী বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধিকা। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে চৌধুরী পরিবার বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল। একবার জাহাজে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আশুতোষের পরিচয় হয়। ক্রমে সখ্য গড়ে ওঠে। সেই সূত্রে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫ এপ্রিল ইস্টারের ছুটিতে বিশ্বকবি তাঁর ভাই হেমেন্দ্রনাথের কন্যা প্রতিভার বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে কৃষ্ণনগরে এই চৌধুরী বাড়িতে এসে উপস্থিত হন। ফলশ্রুতিতে প্রতিভা দেবী ও আশুতোষ চৌধুরীর চার হাত এক হয়ে যায়। পরবর্তীতে ঠাকুরবাড়ির মেয়ে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী বধূবেশে চৌধুরী বাড়িতে পা রাখেন। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সুযোগ্যা কন্যা ইন্দিরার সঙ্গে প্রমথ চৌধুরীর বিবাহ সুসম্পন্ন হয়।
বিংশ শতকের প্রথমার্ধে সংস্কৃতির পীঠস্থান চৌধুরী পরিবারের এই বসতবাড়িটি কিনে নেন নদিয়ার রাজবংশের মহারানি জ্যোতির্ময়ী দেবী। অনেকের মতে, তখন থেকেই এই বাড়ির নাম হয়ে যায় ‘রানিকুঠি’। ইতিহাসের নীরব সাক্ষী এই বাড়ি এখন সংস্কারের অভাবে ধুঁকছে। খুব তাড়াতাড়ি সংস্কারের কাজে হাত দেওয়া দরকার। তা না হলে আর কয়েক বছরের মধ্যেই পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে রানিকুঠি। কৃষ্ণনগরের বুক থেকে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে রবীন্দ্রস্মৃতি বিজড়িত একটি ভবন। প্রতিবছর আসে বাঙালির রবীন্দ্রপ্রেম উথলে ওঠা দু’টি দিন, পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ। এই দু’দিন পাড়ায় পাড়ায় নেচে বেড়ায় চণ্ডালিকা, শ্যামা, চিত্রাঙ্গদারা। কিন্তু রানিকুঠির দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। রানিকুঠিও যে আজ কুরূপা থেকে সুরূপা হতে চায়।
