সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে তাঁর প্রাপ্য গুরুত্বের ভিত্তিতে তুলে ধরার চেষ্ট করছি। গান্ধীর অধীনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সংগঠিত অগণিত অহিংস আন্দোলনের তুলনায় নেতাজির দেশপ্রেমিক আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিটি আঘাত ব্রিটিশ শাসনযন্ত্রকে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। কফিনে শেষ পেরেকটি ছিল ১৯৪৬ সালের নৌবাহিনীর বিদ্রোহ, যার ফলে ব্রিটিশ সরকার অবশেষে ভারত ছাড়ার (গান্ধীজির ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন ততদিনে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে) সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে অনেকেরই জানা নেই যে, ভারতীয় জাতীয় বাহিনী (আইএনএ) ভারতীয় স্বাধীনতা লিগের মধ্য থেকেই আবির্ভূত হয়েছে, যা রাসবিহারী বসু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অথচ তিনিই মূলধারার ঐতিহাসিকদের দ্বারা বিপুল পরিমাণে অবহেলিত হয়েছেন। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটাই প্রত্যাশিত। আমরা আক্ষরিক অর্থেই নেতাজিকে (গত শতকের তিনের দশকের শেষ পর্বে যাঁর জনপ্রিয়তা এবং জনসাধারণের কাছে তাঁর আবেদন গান্ধীজির সঙ্গে তুলনীয় ছিল) পাদপ্রদীপের আলোয় আনতে গলা ফাটাচ্ছি, কিন্তু এটা সত্যি যে, রাসবিহারী বসু, কারতার সিং, বাঘাযতীনদের (যাঁরা তাঁদের কাজের ধরনের জন্য স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারতেন না) মতো শহিদদের কথা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য স্থান পায়নি।
রাসবিহারী ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে এক অশ্রুত, অপ্রশংসিত নায়ক রয়ে গিয়েছেন। তাঁর নাম শোনার পর বেশিরভাগ পাঠকের মনে যে অস্পষ্ট স্মৃতির ছোট ছোট ঝলক উজ্জীবিত হয়, তা তার বেশিরভাগই আইএনএ-র সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে। আইএনএ আসলে রাসবিহারী বসুর শেষ ও শ্রেষ্ঠ কীর্তি ছিল। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মতো নয়। তিনিই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যাপক এক বিপ্লবের পরিকল্পনা করেছিলেন, যা হিন্দ-জার্মান ষড়যন্ত্র নামে পরিচিত। তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে সশস্ত্র বিপ্লবের আগুন জ্বালানোর চিন্তাভাবনা করেছিলেন এবং সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে বিদেশি সহায়তা নিয়ে শাসক ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করার লক্ষ্য স্থির করেন। সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, তবে তা ব্যর্থ অসহযোগিতা বা আইন অমান্যের মতো ভারতের অন্যান্য স্বাধীনতা আন্দোলনের চেয়ে কম গৌরবময় অধ্যায় ছিল না। আর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন অহিংস ছিল না, সফল তো নয়ই, বরং তার পরে গান্ধীর অহিংস ঝুলি থেকে আর কিছু বেরোয়নি শুধু দেশ বিভাগে সায় দেওয়া ছাড়া (১৯৪৩ সালেই গান্ধী মুসলিম লিগের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে দেশ ভাগে সায় দিয়েছিলেন)।
ব্রিটেনের মধ্যে যে ভীতি রাসবিহারী সঞ্চার করতে পেরেছিলেন, তা লর্ড রাওলাটের লেখায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি সিডিশন রিপোর্টের (দেশদ্রোহীদের ওপর রচিত বিবরণ) সভাপতিত্ব করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রথমত, বেশিরভাগ ব্যক্তি এখনও ছাড়া আছেন। যেমন, বেনারস ষড়যন্ত্র মামলার রাসবিহারী বসু। যদি আদৌ বিচার হয়, তবে তাঁর হওয়া উচিত। এমনকী ভারত প্রতিরক্ষা আইনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও যদি তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, তবে বিশেষ বিধানে তাঁর বিচার হওয়া উচিত। উপরন্তু তার আগে আরও অপরাধ সংগঠিত হতে পারে। সেসব ক্ষেত্রেও অনুরূপ বিধান প্রয়োগ করা দরকার। অন্যদিকে আমাদের পরিকল্পনায় কেবল একটি প্রদেশে এ ধরনের বিশেষ ট্রায়ালের উদ্দেশ্যে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা সঠিক হবে না।’
আর কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ফণীভূষণ চক্রবর্তী ১৯৭৬ সালের ৩০ মার্চ লিখেছিলেন, ‘যখন আমি ১৯৫৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর হিসাবে কাজ করছিলাম, তখন লর্ড ক্লিমেন্ট অ্যাটলি, যিনি যুদ্ধের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ভারতের স্বাধীনতা প্রদানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন, তিনি ভারত সফর করেন এবং কলকাতায় দু’দিনের জন্য রাজভবনে থাকেন। আমি তাঁকে সোজাসুজি প্রশ্ন করলাম, ১৯৪৭ সালের বহু আগেই গান্ধীজির ভারত ছাড়ো আন্দোলন কার্যত চুকে গিয়েছিল এবং সে সময় আমাদের দেশের পরিস্থিতিতে এমন ছিল না, যার জন্য ব্রিটিশদের তাড়াহুড়ো করে ভারত ত্যাগের প্রয়োজনীয়তা ছিল। তাহলে কেন তারা তা করেছিল? উত্তরে অ্যাটলি বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেন, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আইএনএ কার্যক্রম, যা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল দুর্বল করে দিয়েছিল এবং নৌবিদ্রোহের ফলে ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল যে, তাদের রক্ষা করার জন্য ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে আর বিশ্বাস করা যেতে পারে না। যখন অ্যাটলিকে জিজ্ঞাসা করা হল, মহাত্মা গান্ধীর ১৯৪২ সালের আন্দোলন ভারত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ব্রিটিশ সিদ্ধান্তকে কতটা প্রভাবিত করেছিল, তখন তাঁর ঠোঁট ব্যঙ্গের হাসিতে প্রশস্ত হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি ধীরে ধীরে মিনিমাল ( অতি নগণ্য) শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন।’
