সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনের পর একবছর অতিক্রান্ত হল। প্রায় পাঁচ শতকের টানাপোড়েনের পর অবশেষে গত বছর সনাতন সংস্কৃতির অন্যতম সংবেদনশীল ধাম রামমন্দির পুনর্নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই মন্দির নির্মাণের পিছনে যে পরিবারের বিশেষ অবদান রয়েছে, তার নাম সোমপুরা পরিবার। আমেদাবাদের এই পরিবার প্রায় ১৫ প্রজন্ম অর্থাৎ ৪৫০ বছর ধরে ভারতজুড়ে ১০০-র বেশি মন্দিরের নকশা তৈরি করেছে। তার মধ্যে আছে সোমনাথ মন্দিরও। এই পরিবারের চন্দ্রনাথ সোমপুরা অযোধ্যায় নবনির্মিত রামমন্দিরের প্রধান স্থপতি। তাঁকে সহায়তা করেছেন তাঁর দুই পুত্র নিখিল সোমপুরা ও আশিস সোমপুরা।
হিন্দু পুঁথি, বাস্তুশাস্ত্র ও শিল্পশাস্ত্র মেনে ২০২০ সালে সোমপুরা পরিবার এর নকশায় কিছু বদল ঘটিয়েছিল। মন্দিরের প্রস্থ ২৫০ ফুট, দৈর্ঘ ৩৮০ ফুট এবং উচ্চতা ১৬১ ফুট। এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম হিন্দু মন্দির। এর নকশা তৈরি হয়েছে নাগারাশৈলীর মরুগুর্জর স্থাপত্যরীতি অনুসারে। এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী সাধারণত উত্তর ভারতে বেশি পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে প্রয়াগের কুম্ভমেলায় এর একটি মডেল প্রদর্শিত হয়েছিল।
মন্দিরের মূল ধাঁচা গঠিত হয়েছে তিনটি তলা নিয়ে, উঁচু মঞ্চের উপরে। গর্ভগৃহ ও প্রবেশপথের ঠিক মাঝখানে পাঁচটি মণ্ডপ আছে। প্রথম তলায় রয়েছে এই পাঁচটি মণ্ডপ, যাকে একত্রে বলে শ্রীরাম দরবার। এর মধ্যে রয়েছে নৃত্য মণ্ডপ, রং মণ্ডপ, সভা মণ্ডপ, প্রার্থনা মণ্ডপ ও কীর্তন মণ্ডপ। নাগারাশৈলী অনুসারে শিখর দিয়ে শোভিত করা হয়েছে মন্দিরের চূড়া। বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিতে শোভিত এই মন্দিরের কোনায় কোনায় সূর্য, ভগবতী, গণেশ ও শিবেরও মন্দির রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ বাহুতে রয়েছে অন্নপূর্ণা ও হনুমান মন্দির।
এর ভিত তৈরি হয়েছে ৪৬ ফুট পুরু রোলার-ঠাসা কংক্রিটের স্তর দিয়ে, যা অনেকটা কৃত্রিম শিলার মতো। এর প্লিন্থ ৪৬ ফুটের গ্রানাইট দিয়ে তৈরি, যাতে আর্দ্রতা আটকানো যায়। কোনও লোহা ব্যবহৃত হয়নি। মন্দিরে প্রবেশের জন্য র্যাম্প, লিফ্ট এবং বয়স্ক ও শারীরিকভাবে অক্ষমদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। তীর্থযাত্রীদের সুবিধার্থে একটি কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, যেখানে ২৫,০০০ মানুষ চিকিৎসা ও লকারের সুবিধা পায়। পরিবেশের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে ২৮ হেক্টর বা ৭০ একর জমির মধ্যে প্রায় ৫০ একর ফাঁকা রাখা হয়েছে। জল সংরক্ষণের বন্দোবস্তও করা হয়েছে।
মন্দিরে মোট ৩৬৬টি স্তম্ভ আছে। প্রতিটি স্তম্ভে ১৬টি মূর্তি আছে। তার মধ্যে আছে শিবের অবতার, দশাবতার, ৬৪ যোগিনী ও দেবী সরস্বতীর দ্বাদশ অবতার। বিষ্ণুর উদ্দেশে নিবেদিত মন্দিরগুলিতে এক একটি শাস্ত্র উৎকীর্ণ করা হয়েছে।
সোপানগুলি ১৬ ফুট চওড়া। গর্ভগৃহ অষ্টভুজাকার। মন্দিরের এলাকা প্রায় ১০ একর জুড়ে। বাকি ৫৭ একরে গড়ে উঠেছে একটি কমপ্লেক্স। তাতে আছে প্রার্থনা গৃহ, একটি বক্তৃতা কক্ষ, একটি শিক্ষাসত্র এবং জাদুঘর ও ক্যাফেটেরিয়া-সহ অন্যান্য সুবিধা। মন্দির কমিটির মতে, ৭০,০০০ দর্শনার্থীর স্থান সঙ্কুলানের ব্যবস্থা আছে। লার্সেন ও টুবরো বিনামূল্যে মন্দিরের নকশা ও নির্মাণ তদারকিতে রাজি হয়েছিল এবং এই প্রকল্পের বরাত পেয়েছিল। কেন্দ্রীয় ভবন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, জাতীয় ভূ-পদার্থবিদ্যা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বম্বে, গুয়াহাটি ও মাদ্রাজ আইআইটি মাটি পরীক্ষা, কংক্রিট সরবরাহ ও নকশা তৈরিতে সহায়তা করেছে।
নির্মাণকাজের জন্য ৬,০০,০০০ ঘন ফুট স্ট্যান্ডস্টোন আনা হয়েছিল রাজস্থানের বংশী থেকে এবং ১০ হাজার কপার প্লেট দরকার হয়েছিল পাথরের চাঁইগুলিকে জুড়তে। সাংস্কৃতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা হল, রামজন্মভূমি মন্দির পুনর্নির্মাণের জন্য থাইল্যান্ড মাটি পাঠিয়েছে। সে দেশের দু’টি নদীর জল আনা হয়েছে মন্দিরের সম্মানে। শেষ পর্যায়ে দুর্গা, বিষ্ণু ও ব্রহ্মার মন্দিরও তৈরি হয়েছে।
রামমন্দির পুনর্নির্মাণে ব্যয়নির্বাহের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে তহবিল গঠনের ব্যবস্থা হয়েছিল। ২০ লাখ স্বেচ্ছাসেবী নিযুক্ত ছিলেন এ কাজে। ২০২১ সালের ১৪ জানুয়ারি ভারতের চতুর্দশ রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ ছিলেন প্রথম অর্থদাতা। তিনি দিয়েছিলেন ৫,০০,০০০ টাকা। ১২ কোটি ৭০ লাখ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা সংগ্রহ হয়েছে। ভারতের কিছু সংবাদ গোষ্ঠী জানিয়েছে যে, সম্ভবত এটাই জনগণের অর্থে নির্মিত পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ প্রকল্প। ২০২১-এর ২৭ ফেব্রুয়ারি মন্দিরের তহবিল গঠন সমাপ্ত হয়।
১৯৮৫-’৮৬ সাল থেকে একটা আওয়াজ উঠেছিল যে, ‘মন্দির ওখানেই বানাব’, রামজন্মভূমি আন্দোলনে যা সবচেয়ে জনপ্রিয় ধ্বনি হয়ে উঠেছিল। এটা একটি আশার প্রতীক এবং উৎসবের অঙ্গ। এটা ছিল একটি শপথ। মন্দির নির্মাণের পাশাপাশি ৮৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে অযোধ্যা নগরীকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর, নবনির্মিত ঝাঁ-চকচকে রেলস্টেশন, নগর উন্নয়ন, একাধিক হোটেল নির্মাণ প্রকল্প এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সারা পৃথিবী থেকে হিন্দু ভক্তরা ভগবান রামকে দর্শনের জন্য সমবেত হন। এর ফলে ওই রাজ্যের অর্থনীতিতে অবশ্যই প্রভাব পড়বে। ২০২৪ সালের শেষে ভারতীয় মুদ্রায় ৪ লক্ষ কোটি টাকার সমান আর্থিক লেনদেন হবে বলে অনুমান (আমেরিকান মুদ্রায় প্রায় ৫,০০০ কোটি ডলার) করা হয়েছে।
হিন্দুদের কাছে এর অসীম ধর্মীয় তাৎপর্যের কারণে অনুমান করা হচ্ছে, অযোধ্যার রামমন্দির দর্শন করতে বছরে ৫ কোটি মানুষের সমাগম হবে। তা হলে এটাই হবে ভারতের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর সমাগম হওয়া হিন্দু তীর্থক্ষেত্র। ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি রামমন্দির সাধারণ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর প্রথম ১২ দিনে ২৪ লাখ দর্শনার্থী অযোধ্যায় গিয়েছেন। সারা ভারত থেকে মন্দিরে গমনের ফলে অযোধ্যার এই আধ্যাত্মিক পর্যটনকেন্দ্রের হাজার হাজার কর্মসংস্থানের ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ভিড় সামলাতে আরও বেশি লোকবল দরকার। ওই স্থান বিশাল বিনিয়োগও টানবে।
রামমন্দির উদ্বোধনের পর ১৭ এপ্রিল প্রথম রামনবমী পালিত হয় লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগমে। দুপুরে রামমন্দির এক অনন্য ঘটনার সাক্ষী থেকেছে। রামলালার মূর্তির কপালে সূর্যতিলক এসে পড়েছে। আয়না ও লেন্সের সাহায্যে সূর্যরশ্মি বিগ্রহের উপর পড়ে। সৌজন্যে কেন্দ্রীয় ভবন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও ভারতীয় জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা প্রতিষ্ঠান।
রামমন্দির ওই শহরের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। অতিথি সৎকার, পরিবহণ ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে এই মন্দির কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। হোটেল নির্মাণ ও রিয়েল এস্টেট নির্মাণে প্রচুর কর্মী দরকার হয়। ছোট ব্যবসায়ী, যাঁরা ফুল, ফল, পানীয় বিক্রি করেন, তাঁরাও উপকৃত হয়েছেন। বেশি পর্যটক ও পুণ্যার্থীর সমাগমে ব্যবসায় লাভ বেড়েছে। মন্দিরের কারণে যোগাযোগের চাহিদা বেড়েছে। এতে বিমান, রেল ও অন্যান্য সহায়ক পরিষেবা বেড়েছে। স্থানীয় অর্থনীতিকে উৎসাহিত করেছে এই মন্দির, কারণ বাইরে থেকে বিনিয়োগ আসছে। মন্দির নির্মাণের ফলে শিল্প, কারুকলা ও ঐতিহ্যশালী প্রথাগুলির গুরুত্ব বেড়েছে। শিল্পী ও কলাকুশলীদের কদর বেড়েছে। শিল্পসামগ্রী, ধর্মীয় নানা বস্তু প্রভৃতির চাহিদা বেড়েছে। পার্শ্ববর্তী শহরগুলি, যেমন, লখনউ, কানপুর, গোরখপুরও লাভবান হচ্ছে। এমনকী জেলা শহর, যেমন, আমেথি, বারাবাঁকি, সুলতানপুর, বাসলি আহমেদনগরও উপকৃত হবে।
