গৌতম মুখোপাধ্যায়
প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া
![]()
মুই আর তুই, আমি আর তুমি, এ দ্বন্দ্ব চিরন্তন। দার্শনিক পরিমার্গে তা আস্তিক ও নাস্তিকের বৈপরীত্যের মধ্যে সমাহিত। আস্তিক দর্শন অনুযায়ী ঈশ্বর বা ব্রহ্মের ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস জ্ঞাপন করা হয়। আত্মার অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা হয়। আর নাস্তিক দর্শন ঠিক এর উলটো পথের যাত্রী। ষড়দর্শন অর্থাৎ সাংখ্য (কপিল), ন্যায় (গৌতম), যোগ (পতঞ্জলি), বৈশেষিক (কণাদ), পূর্ব মীমাংসা (জৈমিনি), উত্তর মীমাংসা (বাৎসায়ন) আস্তিক্যবাদী দর্শন সঞ্জাত। এ দর্শনগুলি বেদের অভ্রান্ততায় বিশ্বাস করে। অন্যদিকে চার্বাক, বৌদ্ধ, জৈন এবং আজীবিক দর্শন নাস্তিক্যবাদের তত্ত্বকে জোরদার করে।
আস্তিকতার সরল পথ ধরে ভারতের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সুদীর্ঘকাল ধরে প্রবহমান। বিশ্বাসকে পাথেয় করে এ পথচলার শুরু। আজও মৌলিক চিন্তনের এ চিরায়ত রাস্তায় ভারত সমগ্র পৃথিবীতে এক বিশেষ স্থান দখল করে রয়েছে। আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার যন্ত্রণা থেকে মুক্তিলাভের নিজস্বতাও আস্তিক্যবাদের অনুসারী। কিন্তু নাস্তিকতাবাদ ‘হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’। তাই অবিশ্বাসকে সম্বল করে কূট তর্কে আস্থাশীল। স্বপ্ন দেখা, ভালোবাসা, অপত্যস্নেহ অথবা ঈশ্বর বিশ্বাসের মতো পারমার্থিক বিষয় সব সময় যুক্তিতর্কসাপেক্ষ নয়। দেহ খাঁচার মধ্যে মনরূপ অচিন পাখির নিয়ত আসা-যাওয়াকে সর্বদা যুক্তির কষ্ঠিপাথরে বিচার করাও সঙ্গত নয়। অথচ দ্বন্দ্বের পরিসরে আস্তিকতাকে খাটো করে দেখানোর প্রচেষ্টা নাস্তিকদের আদর্শসঞ্জাত।
ভারত যেহেতু আস্তিক দর্শনের গর্ভগৃহ, তাই অদ্যাবধি পশ্চিমি দর্শনের মতাদর্শগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। এখানে বিশ্বাসের ওপর রাজ করতে চায় অবিশ্বাস। কিন্তু অবিশ্বাস নেতির ওপর ভর করে থাকার কারণে উপমহাদেশে পরিত্যজ্য। তাছাড়া সামাজিকভাবে প্রচলিত সব প্রথা, যা অনেক সময়ই যুক্তির ধারাপাত মানে না, তাকে ঘৃণাপরবশ হয়ে পরিত্যাগের নিদান দেওয়ায় নাস্তিকতাবাদ দেউলিয়া প্রমাণিত হয়।
উল্লেখ্য যে, ‘বিশেষ জ্ঞান’ স্বতঃসিদ্ধ হয় বারবার পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত হওয়ার মাধ্যমে। এটি বিজ্ঞানের মর্যাদাও লাভ করে। বস্তুজগতের ক্ষেত্রে এটিকে মান্যতা দেওয়ার প্রথা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু ভাবজগতের ক্ষেত্রে এ প্রমাণ অচল। মনের কোনও ব্যাস বা পরিধি মেলা দুষ্কর। তাই গতিবেগ নির্ণয় করা দুরূহ। আবার দাঁড়িপাল্লাতেও তা ওজন করা যায় না। মুনি-ঋষিদের দীর্ঘ নিরীক্ষণের বিশেষ পর্যায় ভারততত্ত্বের নানা দিককে ঋদ্ধ করেছিল। সে কারণেই ভারতীয় সভ্যতা সনাতন সভ্যত, এর দ্বিতীয় উদাহরণ আর নেই। আস্তিক ও নাস্তিক, উভয় দর্শনের অপূর্ব সমাহার ভারতীয় সভ্যতার চিত্তাকর্ষক বৈশিষ্ট্যকে প্রতীয়মান করেছে। দ্বন্দ্বের পরিসরে বৈচিত্রময় চরিত্রের এক উজ্জ্বল ক্যানভাস হয়ে উঠেছে এই দুই দর্শন। ব্যক্তি বা বর্গের মিছে আস্ফালন ম্লান হয়ে যায় দার্শনিকতার অমোঘতায়।
