Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সোমা পরিবারকে ভুলে যাওয়া ঐতিহাসিক অন্যায়

রাসবিহারী বসু ও তোশিকো সোমা বসু।

Share Links:

সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

ব্রিটিশরা রাসবিহারীকে খ্যাপার মতো তাড়া করে ফিরছিল। তিনি ছদ্মপরিচয়ে জাপানে পালান। সে কারণে রাসবিহারীর নিরাপত্তা রক্ষা করা তাঁর জাপানি আশ্রয়দাতাদের পক্ষে দিন দিন কষ্টকর হয়ে পড়ছিল। যাঁরা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন তয়ামা মিৎসুরু এবং আইজো সোমা।  রাসবিহারীকে যে কোনও মুহূর্তে গুপ্তঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে হতে পারত। তয়ামা আইজো সোমার জ্যেষ্ঠা কন্যা তোশিকোর সঙ্গে বসুর বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

আইজো সোমার স্ত্রী কক্কো সোমা তোশিকোকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোশিকো, তুই কি রাসবিহারীকে বাঁচাতে পারিস না? এটা তোর পক্ষে খুব বড় একটা দায়িত্ব, বোঝা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আর কেউ কি আছে, যে এ কাজ করতে পারে?’

তোশিকো উত্তর দেন, ‘মা, আমাকে এ বিষয়ে চিন্তা করতে কিছু সময় দাও।’ একমাস পরে এমন একটা সময় এল, যখন তাঁদের তয়ামাকে একটা কিছু উত্তর দিতেই হবে।

কক্কো সোমা লিখেছেন, ‘আমি আমার ঘরে তোশিকোকে ডেকে পাঠালাম। ওকে ওর সিদ্ধান্তের কথা জানাতে বললাম। খুব গম্ভীর আর উদ্বিগ্ন ছিলাম। আমি ওকে বলেছিলাম, ও যেন ওর স্বাধীন ইচ্ছাকে অবহেলা না করে  কথা বলে। তাই অনুরোধ করেছিলাম এবং আমি শান্তভাবে ওর জবাবের প্রতীক্ষা করেছিলাম নিজেকে সংযত করে। সে স্থির প্রত্যয়ে বলল, মা, আমাকে বোসের কাছে যেতে দাও। প্লিজ, আমি যেন তাঁর শরীরের বর্ম হয়ে থাকতে পারি। আমি এ বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ধনী পরিবারের একটি অল্পবয়সি জাপানি সুন্দরী মেয়ে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয়কে বিয়ে করবে, এটা অত্যন্ত দুঃসাহস ও স্বার্থত্যাগের ঘটনা। আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, কোনও জাপানি মেয়ে যত শিক্ষিত হবেন, একজন বিদেশিকে বিয়ে করার সম্ভাবনা তাঁর তত কমে যাবে। জাপানিরা শতকরা ১০০ ভাগ জাতীয়তাবাদী। তারা তাদের জাতীয়তাবোধ নিয়ে এত গর্বিত যে, বিদেশিকে বিয়ে করতে পারবে না। মহিলারা পুরুষদের চেয়েও বেশি রক্ষণশীল।

জাপানিরা শিক্ষিত হলে খুব বেশি ঐতিহ্যপরায়ণ ও রক্ষণশীল হয়। তারা তাদের রক্তের বিশুদ্ধতা নিয়ে গর্বিত। কিন্তু এটা আদৌ তাদের জাতিবিদ্বেষ নয়। সব জাপানি বিদেশিদের ভালোবাসে এবং তাদের সংস্কৃতি  ও পণ্যের প্রশংসা করে। চিন এবং কোরিয়া থেকে বিপুল সংখ্যায় যে শরণার্থী এসেছিল, তাদের বহু বছর ধরে স্বাগত জানানো হয়েছে, এমনকী গ্রামাঞ্চলেও। জাপানিরা যে কোনও বিদেশিকে সবরকম সুবিধা ও আতিথেয়তা প্রদান করে। তারা বিদেশি ও ভিখারিদের ঈশ্বর প্রেরিত সম্মানীয় দূত হিসাবে গণ্য করে। কখনও নিজেদের মেয়েকে বিদেশির বউ হিসাবে চাইত না এবং মেয়েরা নিজে পছন্দ করলেও তা অনুমোদন করত না কোনও মূল্যেই। এটা তাদের জাতীয় শপথ, কোনও জাতিবিদ্বেষ নয়।’

১৯১৮ সালের জুলাই মাসে ওই পরিস্থিতিতে তোশিকো রাসবিহারীকে বিয়ে করেছিলেন। ১৯১৯ সালে রাসবিহারী ও তোশিকোর একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়, যার নামের (মাসাহিদে ওরফে ভারতচন্দ্র) সঙ্গে জাপানি ও ভারতীয় সংস্কৃতি যুক্ত। অল্প কিছুদিনের মধ্যে তাঁদের একটি কন্যাসন্তানও জন্মায়। কিন্তু শান্তি, স্থায়িত্ব এবং আরাম তাঁদের গোটা দাম্পত্যজীবনে অধরাই থেকে গিয়েছিল। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তাঁদের শিকারি কুকুরের মতো তাড়া করে বেড়াত । তাঁরা এক জায়গায় কখনও দীর্ঘদিন থাকতে পারতেন না।

ওহসাওয়া লিখেছেন, ‘তিনি এক জায়গায় থাকতে পারতেন না। এখানে ওখানে থাকতেন। একদিন বা কয়েক রাত, কখনও কয়েক মাস। টানা একবছর এক জায়গায় থাকতে পারতেন না।’ তারপর ১৯২৫ সালে ফের বিপর্যয় ঘনায়। ১৯২৫ সালের ৪ মার্চ ২৮ বছর বয়সে তোশিকোর মৃত্যু হয়।

সমস্ত দিক বিবেচনা করে বলা যায়, রাসবিহারীর নিদারুণ কঠিন সময়ে নিঃস্বার্থভাবে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে উপকার জন্য  তোশিকো তথা সোমা পরিবারের কাছে ভারত অবশ্যই ঋণী । তবু স্বাধীন ভারত কি কোনওভাবে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছে!

1 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

জন্মজয়ন্তীতে সাগর তর্পণ

বইয়ের গন্ধ, ধুলোবালি ও বিপন্ন ভালোবাসার কথা

শিশুসাহিত্য পাঠে ছোটদের অনীহা

কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬ এবং ভারতের পিছিয়ে পড়া

প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই সুস্থ জীবন সম্ভব

মা কোথায়

শৈশবের ইঁদুরদৌড়

জো জিতা, ওহি সিকান্দার

আসলে ‘আমি’বলতে কী বোঝায়

বঙ্গাব্দের সূচনায় শশাঙ্কর অবদান