অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

পৌষ মেলা শান্তিনিকেতনের একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান। ১৮৯১ সালের ২১ ডিসেম্বর শান্তিনিকেতনে ব্রহ্ম মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে দিনটি ছিল বাংলা ১২৯৮ সনের ৭ পৌষ। ১৮৯৪ সালের ২১ ডিসেম্বর (বাংলা ৭ পৌষ) ব্রহ্ম মন্দির প্রতিষ্ঠার বার্ষিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটি ছোট মেলার আয়োজন করেছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তী সময়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই মেলাকে এগিয়ে নিয়ে যান, যা আজও তা অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। ব্রহ্ম মন্দিরের বিপরীত মাঠে যে মেলা ঘরোয়াভাবে শুরু হয়েছিল, তা আজ শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যের প্রতীক হিসাবে স্বীকৃত। এখন শুধু বীরভূম নয়, রাজ্য, দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেরও বহু পর্যটক পৌষ মেলা উপলক্ষে শান্তিনিকেতনে ভিড় করেন।
রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় পৌষ মেলা। এ বছর পৌষ মেলার উদ্বোধন হয় গত ২৩ ডিসেম্বর (৭ পৌষ), সোমবার। মেলা বসেছে ভূবনডাঙার মাঠে। বোলপুরের ঐতিহ্য স্থানীয় মানুষের হাতের কাজের নানা ধরনের জিনিসপত্রের পসরা। এছাড়া সরকারিভাবে তিনদিনের মেলায় থাকে কবিগানের অনুষ্ঠান, বাউল গান, কীর্তন প্রভৃতি।
বোলপুর স্টেশনে নামতেই চোখে পড়ল ভারতীয় রেলের গীতাঞ্জলি রেল সংগ্রহালয়। ভিতরে রবীন্দ্রনাথের জীবনের বিভিন্ন সময়ের ঐতিহাসিক ছবি এবং গুরুত্বপূর্ণ চিঠি, নোবেল পুরস্কারের শংসাপত্র, নাইট উপাধি ত্যাগ করার চিঠি সযত্নে রক্ষিত আছে। আর অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে যে ট্রেনের কামরায় করে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছিল, তা মিউজিয়ামে সুসজ্জিতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু-সহ অন্য খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আলোকচিত্র রক্ষিত আছে এই সংগ্রহশালায়। রয়েছে তাঁর বিদেশযাত্রার বিভিন্ন আলোকচিত্র। ভুবনডাঙার মাঠে কীভাবে বর্তমানের শান্তিনিকেতন তৈরি হল, রয়েছে তার ইতিহাস। শান্তিনিকেতন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির জন্য ২০ বিঘা জমির তখনকার মূল্য ছিল ৫ হাজার টাকা। সে জায়গায় তৈরি হয়েছে আজকের পৃথিবীর বিখ্যাত এক বিশ্ববিদ্যালয়।
শান্তিনিকেতন থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে রয়েছে সোনাঝুরির হাট। সেখানে প্রতি শনি এবং রবিবার হাট বসে। তার পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে রবীন্দ্রনাথের বহু স্মৃতি-বিজড়িত কোপাই নদী। সকালে হাট বসে এবং সূর্য ডোবার আগে বন্ধ হয়ে যায়। হাটে কোনও স্থায়ী দোকানঘর থাকে না। প্রচুর ইউক্যালিপটাস গাছের তলায় হাট বসে।
কঙ্কালীতলা একটি অন্যতম সতীপীঠ। কোপাই নদীর তীরে অবস্থিত। সেখানে সতীর কোমরের কঙ্কাল পড়েছিল। তা থেকেই ওই জায়গার নাম হয় কঙ্কালীতলা। সেখানে নিয়মিত প্রচুর ভক্ত পুজো দিতে যান।
বোলপুর রেলস্টেশনের অদূরে রয়েছে রাজবাড়ি, যা সুরুল রাজবাড়ি নামে পরিচিত। ২৯০ বছর আগে ১৭৫০ সালে তা নির্মিত হয়। রাজবাড়ির চারদিকে রয়েছে টেরাকোটা মন্দির। একজন প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী শ্রীনিবাস সরকার প্রাসাদোপম এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। তিনি যে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন, তা আজও অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। ২৯০ বছরের প্রাচীন এই দুর্গাপুজো এখনও নিয়ম মেনে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়।
শান্তিনিকেতন পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম পর্যটনস্থল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেছেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা পড়তে যান। প্রতিদিন সেখানে কমবেশি সাড়ে তিন হাজার পর্যটক বেড়াতে আসেন। প্রতিদিন প্রায় ৪০,০০০ পর্যটক পৌষ মেলায় যান। পৌষ মেলা ছাড়াও শান্তিনিকেতনের উল্লেখযোগ্য উৎসব হল বসন্ত উৎসব, রবি পক্ষ এবং নব বর্ষা উৎসব। ট্রেন বা সড়কপথে বোলপুরের শান্তিনিকেতনে যাওয়ার সুব্যবস্থা আছে। রাতে থাকার জন্য প্রচুর হোটেল আছে।

