প্রোজ্জ্বল মণ্ডল

শুদ্ধ মনই মানুষের প্রকৃত হিতকারী, মুক্তির হেতু এবং বিষয়াসক্ত মনই মানুষের পরম শত্রু, বন্ধনের কারণ। চিত্তশুদ্ধির মাধ্যমে জ্ঞান উৎপন্ন হয় এবং জ্ঞানই মুক্তি প্রদান করে।
পরাশর মুনি বলেছেন, অসন্তোষই দুঃখের কারণ। লোভ ইন্দ্রিয় এবং মনকে এমনভাবে চঞ্চল করে রাখে যে, ভালো-মন্দ বিচার করার সামর্থ্য মানুষ হারিয়ে ফেলে। সে তখন তার প্রজ্ঞা বা বুদ্ধি নষ্ট করে ফেলে, যেমনভাবে অভ্যাস বা চর্চা না করার ফলে বিদ্যা নষ্ট হয়ে যায়। প্রজ্ঞা (জ্ঞানবুদ্ধি) নাশ হলে বিশ্লেষণ ক্ষমতা হারিয়ে ন্যায়, সত্যকে অর্থাৎ আত্মোন্নতির সঠিক পথকে সে আর দেখতে পায় না। ফলে তার কাছে দুঃখ অনিবার্য হয়ে আসে। দুঃখ এলে, সুখের ক্ষয় হলে প্রত্যেকেরই কর্তব্য ঘোর তপস্যা করা।
শাস্ত্র মতে, বিষয়ই প্রকৃত বিষপদবাচ্যঃ। এর উল্লেখ অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। সন্তোষরূপ অমৃত পান করে যে শান্তচিত্ত পুরুষ তৃপ্তিলাভ করেছেন, তিনি অতুল ভোগৈশ্বর্যকে বিষবৎ মনে করে থাকেন।
লৌকিক যে বিষ, তা প্রকৃত বিষ নয়, যেহেতু লৌকিক বিষ এই জন্মে শুধু শরীরকে বিনষ্ট করে, আর বিষয়রূপ বিষ জন্ম-জন্মান্তর জুড়ে মানুষকে মরণের পথে নিয়ে যায়।
সন্তোষই পরম সুখ। পাতঞ্জল যোগদর্শনের সাধনপাদে সূত্রকার বলেছেন, সন্তোষাদনুত্তমঃ সুখলাভঃ। সন্তোষ থেকে পরম সুখ লাভ হয়। তাই যে কাজ করলে সন্তোষ লাভ হয়, সে কাজ করা উচিত। যৎ কর্ম কুর্বতোঽস্য স্যাৎ পরিতোষোঽন্তরাত্মনঃ।/ তৎ প্রযত্নেন কুর্বীত বিপরীত তু বর্জয়েৎ।। অর্থাৎ যে কাজ করলে অন্তরাত্মার পরিতোষ উৎপন্ন হয়, তাই যত্নপূর্বক করবে এবং তার বিপরীত কাজ অর্থাৎ যা করলে আত্মার পরিতোষ জন্মে না, পরন্তু গ্লানি উপস্থিত হয়, তা সর্বতোভাবে ত্যাগ করা উচিত। মুক্তির উপায় সর্বতোভাবে মনসংযম এবং নিষ্কাম কর্ম। তাই যোগবশিষ্ঠ রামায়ণে বলা হয়েছে, সন্তোষ, সাধুসঙ্গ, বিচার ও শম অর্থাৎ মনসংযম, এই চারটি হল মনুষ্যের পক্ষে ভবসমুদ্র উত্তীর্ণ হওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায়। সন্তোষ অপেক্ষা পরম লাভ আর কিছুই নেই, সৎসঙ্গ অপেক্ষা পরমগতি নেই, বিচার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ জ্ঞান নেই এবং শম অপেক্ষা পরম সুখ আর নেই। শুদ্ধ মন এবং নিষ্কাম কর্মই আত্মজ্ঞান লাভের পাথেয় হয়, যা মুক্তি প্রদান করে।
