ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া
![]()
১০ ডিসেম্বর স্যার যদুনাথ সরকারের জন্মদিন নীরবে অতিবাহিত হয়ে গেল। ১৮৭০ সালের এই দিনে অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহি জেলার করচমারিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রাজকুমার সরকার ও হরিসুন্দরী দেবীর তৃতীয় পুত্র ছিলেন যদুনাথ। রাজকুমার সরকার ও হরিসুন্দরী দেবী গড়পড়তা বাঙালিরদের চেয়ে অনেক বেশি ধর্মাবলম্বী ছিলেন। রাজকুমার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি বড় জমিদারি লাভ করেছিলেন। তিনি যথেষ্ট আলোকপ্রাপ্ত জমিদার ছিলেন।
যদুনাথ গ্রাম্য পরিবেশে বড় হয়েছিলেন। তিনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। শুধু তাই নয়, ব্যতিক্রমীভাবে একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামেই গ্রহণ করেন। তারপর রাজশাহি এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষাগ্রহণ করেন। তিনি প্রত্যেক শ্রেণিতে কৃতিত্ব (Credit)-এর সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইংরেজি ও ইতিহাস বিষয়ে ডবল অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ পাশ করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এবং এতই বেশি নম্বর প্রাপ্ত হন যে, আগের সমস্ত রেকর্ড তিনি ভেঙে দেন। তিনি তিনটি পেপারে যথাক্রমে, ৯০, ৯২ এবং ৯৫ নম্বর পেয়েছিলেন এবং একটি পেপারে একটু কম নম্বর লাভ করেন। এ কারণে ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য সরকারি বৃত্তি লাভ করেন। কিন্তু তিনি ঔপনিবেশিক সরকারের দেওয়া প্রস্তাব পত্রপাঠ নাকচ করেন এবং কলকাতায় প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি গ্রহণ করেন।
১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে যদুনাথ কলকাতার রিপন কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছিল ওই কলেজের ফোর্থ ক্লাসের পড়ুয়াদের পাঠদানের জন্য। সে সময় ওই শ্রেণিতে পাঠদান খুবই অসুবিধাজনক ছিল। কেননা ছাত্রদের ম্যানেজ করা খুবই দুঃসাধ্য ছিল। ফোর্থ ইয়ারের ছাত্ররা তাঁর সঙ্গে প্রথম বর্ষের ছাত্রের মতো আচরণ করতেন। কিন্তু তিনি যখন শান্ত ও ধীর পদচারণায় শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতেন, তখন সমস্ত ক্লাস নিশ্চুপ হয়ে যেত। ছাত্ররা তাঁর পাঠগ্রহণ করতেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। তার তিন বছর পর তিনি বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন এবং সেখানে দু’বছর অধ্যাপনা করেন।
১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে যদুনাথ Coveted PRS পুরস্কার লাভ করেন এবং ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে প্রাদেশিক শিক্ষা পরিষেবা (Provincial Educational Service )-এর জন্য মনোনীত হন। এই ক্যাডারে তাঁর প্রথম নিযুক্তি হয়েছিল কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। এখানে মাত্র একবছর অধ্যাপনা করেন। তারপর তিনি পটনা কলেজে ট্রান্সফার হন এবং ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাস থেকে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। আবার তিনি প্রেসিডেন্সিতে ছ’মাসের জন্য ফেরেন। কিন্তু পটনা কলেজের প্রিন্সিপাল সি আর উইলসনের জরুরি অনুরোধে তাঁকে পুনরায় পটনায় যোগদান করতে হয়। এর মধ্যেই তাঁর প্রথম গবেষণা কর্ম ‘India of Aurangzib (১৯০১) প্রকাশিত হয়। তখন থেকে একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ ঐতিহাসিকের পথচলা সুগম হয়। বহু বছর ইংরেজি পড়ানোর পর তিনি পটনা কলেজের ইতিহাস বিভাগে যোগদান করেন এবং সেখানে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাঠদান করেন। তারপর তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। তাঁর প্রতিভা যথার্থতা লাভ করে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে। সে বছর তিনি Indian Educational Service উত্তীর্ণ হন এবং বর্তমান ওড়িশার কটকের র্যাভেনশ’ কলেজে ইংরেজি ও ইতিহাস বিষয়ের Professor হিসাবে যোগদানের চিঠি পান। সেখানে যোগদান করেন ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে তিনি পুনরায় পটনা প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন।
যদুনাখ হয়ে উঠেছিলেন সময়ানুবর্তিতার একটি অবিসংবাদী মডেল। তাঁর ছাত্ররা ভেবেছিলেন যে, অবসরপ্রাপ্তির দিনে স্যার যদুনাথ কোনও ক্লাস নেবেন না। কিন্তু সেদিন তিনি প্রত্যেকটি ক্লাস আগের মতোই নেন। তারপর অবসরপ্রাপ্তির অনুষ্ঠান শুরু হলে কিছুক্ষণ থেকে তিনি বাড়ি ফিরে গিয়ে আরামবোধ করেন। বলেন যে, আগামিকাল থেকে আর ক্লাসে যাওয়ার জন্য পোশাক পরা এবং ছাড়ার বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হবে না। তারপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ অলংকৃত করেন (১৯২৬ থেকে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদের দ্বিতীয় নিযুক্তি নিতে অস্বীকার করেছিলেন সম্পূর্ণরূপে ইতিহাস গবেষণায় মনোনিবেশ করার জন্য। কত বড় মাপের বুদ্ধিজীবী ছিলেন তিনি! এই উদাহরণ বর্তমানে বিরল। আজ বরং উলটো দৃষ্টান্তের প্রচলনই বেশি। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে ব্রিটিশ সরকার ‘নাইটহুড’ উপাধিতে ভূষিত করে।
এই বুদ্ধিজীবীর কথা আজ ছাত্র-যুবক-যুবতীদের সামনে অধিক পরিমণ্ডলে চিত্রিত করা আবশ্যক। সাধনার দ্বারা তিনি কীভাবে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন! কীভাবে ইতিহাস গবেষণায় এক নতুন দিশারী হয়েছিলেন! মুঘল যুগের ইতিহাস রচনায় তাঁর কৃতিত্বের তুলনা মেলা ভার।
স্যার যদুনাথের বিশেষীকৃত সাহিত্যিক অবদান সারা ভারতে, এমনকী বিভিন্ন দেশেও পর্যাপ্ত স্বীকৃতি (ample recognition) আদায় করেছিল। তাঁর ঐতিহাসিক অবদানের জন্য রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি অব গ্রেট ব্রিটেন তাঁকে সম্মান দান করেছিল। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বোম্বে তাঁকে ক্যাম্পবেল পুরস্কারে ভূষিত করেছিল ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে। সে বছর রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলও তাঁকে সাম্মানিক সদস্যপদ দান করেছিল। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে দ্য রয়্যাল হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি অব ইংল্যান্ড তাঁকে ‘করেসপন্ডিং মেম্বার’ নিযুক্ত করেছিল। সমগ্র পৃথিবীতে এই সংস্থার মাত্র ৩০ জন সদস্য ছিলেন। দি আমেরিকান হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি অব ওয়াশিংটন তাঁকে লাইফ মেম্বার পদ দান করে সম্মানিত করেছিল। সে সময় তিনিই ছিলেন একমাত্র এশিয়ান স্কলার, যিনি এতগুলি বিদেশি সংস্থার আস্থা ও সম্মাননা আদায় করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক হিসাবে নিজের চর্চা ও মেধায় শান দেওয়ার জন্য যদুনাথ পর্যায়ক্রমে সংস্কৃত, পারসি, মারাঠি, গুজরাটি, হিন্দি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ও পর্তুগিজ ভাষা আয়ত্ত করেন। ওই সমস্ত দেশ থেকে তিনি প্রচুর পারসিয়ান ম্যানুস্ক্রিপ্ট আবিষ্কার করেন, যা মৌলিক ইতিহাস রচনায় সাহায্য করেছিল। তারই ফলশ্রুতিতে তিনি রচনা করেন ‘India of Aurangzib, Its Topography, Statistics and Roads’ (1901)। ১৮৯২ থেকে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ন’বছরের প্রচেষ্টায় তিনি এ কাজটি করেছিলেন। তারপর ২৪ বছরের পরিশ্রমে রচনা করেন পাঁচ খণ্ডের ‘History of Aurangzib’। সে সময়েই তিনি রচনা করেন ‘Shivaji and His Times’। তারপর ‘মুঘল সাম্রাজ্যের পতন’ (চার খণ্ড) গ্রন্থের শেষ খণ্ডটি বের হয় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে। পৃথিবীকে দেওয়া তাঁর শেষ উপহার ছিল ‘মিলিটারি হিস্ট্রি অব্ ইন্ডিয়া’, যেটি তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলি ছাড়াও আরও বিভিন্ন আকর গ্রন্থ তাঁর কীর্তিতে ভাস্বর হয়ে আছে। যেমন, ইকনমিকস ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া (১৯০৯), চৈতন্য: হিজ পিলগ্রিমেজেস অ্যান্ড টিচিংস (১৯১৩), মুঘল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (১৯২০), ইন্ডিয়া থ্রু দি এজেস (১৯২৮), শর্ট হিস্ট্রি অব ঔরঙ্গজেব (১৯৩০), হাউস অব শিবাজী (১৯৪০)। এছাড়াও তিনি আরও বহু গ্রন্থের রচয়িতা।
স্যার যদুনাথ শুধু রেকর্ডভিত্তিক ইতিহাসের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি ঘটনার উৎসস্থলে হাজির হওয়ার চেষ্টা করতেন এবং সামাজিক ইতিহাস, যার রসদ হল সাহিত্য, সেখানেও অবলীলায় সন্তরণ করে মণিমুক্তা আহরণ করতেন। এই বুদ্ধিজীবীর অনস্বীকার্য অবদানের কথা বেশি করে আলোচনা হওয়া জরুরি।

