সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

মানুষ সামাজিক প্রাণী। সে অন্যদের ওপর নির্ভর করে এবং অন্যদের সংস্পর্শে উজ্জীবিত হয়। প্রাণীর উদ্ভব যেমন বিবর্তিত হয়েছে, মানে ধীরে ধীরে একটা থেকে আরেকটায় গিয়েছে, এক প্রাণী আরেক উন্নততর প্রাণীতে পরিণতি পেয়েছে, তেমনই মানুষের সংঘবদ্ধ থাকার পথ ও প্রণালীও ধীরে ধীরে উন্নততর হয়েছে। এমনকী আমরা যে অবস্থায় বর্তমানে আছি, তাও নাকি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি না। অতি উচ্চস্তরের গবেষণায় উঠে আসছে যে, একদিন এই মানুষও পরিবর্তিত হয়ে উন্নততর কোনও প্রাণীতে পরিণত হবে। সমাজব্যবস্থাও তাই।
বিবর্তনশীল আমরা, মানে এই দ্বিপদ, বিশেষ মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রাণীরা চিরকালই দল বেঁধে থেকে এসেছি। এভাবেই গড়ে উঠেছে আমাদের ধ্যানধারণা। কীভাবে আমরা একে অপরের সঙ্গে বা অবশিষ্ট পৃথিবীর সঙ্গে আদানপ্রদান করব, এসব স্থির হয়েছে আমাদের অবধারণা ও উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে। এটা সম্ভব হতে পারে বন্ধুত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক বা সম্প্রদায়গতভাবে জড়িত থাকার মধ্য দিয়ে। যাই হোক না কেন, মানুষের সামাজিক আদানপ্রদান, পারস্পরিক অন্বয় ও সমর্থন দরকার বেঁচে থাকার জন্য। সামাজিক যোগাযোগের মনস্তাত্ত্বিক বা আবেগাত্মক সুবিধা ছাড়াও সামাজিক প্রাণী হওয়ার কিছু ব্যবহারিক উপকারিতা বা সুবিধা আছে। একসঙ্গে কাজ করলে আমরা একা কাজ করার চেয়ে বেশি উপকার পাই। সামাজিক জীব হওয়ার কারণে মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই অন্যদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক খুঁজে বেড়ায়। এটা বিশেষভাবে সত্যি হয়, যখন আন্তর্প্রজন্ম সংহতি অর্থাৎ বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যের সম্পর্ক সম্বন্ধে কথা বলা হয়। তখন তা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই আন্তর্প্রজন্ম সংহতির সঙ্গে জড়িত আছে বিভিন্ন বয়সের লোকের মধ্যে সম্পর্কের সংবেদন বা অনুভূতি ও ভাগ করা দায়িত্ববোধ এবং এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমর্থন ও সহযোগিতা। এ ধরনের সংহতি নির্ভর করে বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক সংযোগ ও সম্পর্কের ওপর এবং এটা সব বয়সের লোকের শিক্ষার্জন, জ্ঞানলাভ ও সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।
সমাজে আন্তর্প্রজন্ম সংহতি সামাজিক সংলগ্নতা বৃদ্ধিকে উদ্বেজিত করতে পারে এবং দারিদ্র, বেকারত্ব ও অসাম্যের মতো সমস্যাগুলিকে সামাল দিতে পারে। একত্রে কাজ করে এবং সম্পদ, জ্ঞান ও দক্ষতাকে ভাগাভাগি করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ একটা আরও যথার্থ ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ গড়তে পারে। এতে সব বয়সের মানুষেরই উপকারিতা আছে।
এবার আসা যাক আমাদের মূল প্রতিপাদ্যে— মানুষ এক রাজনৈতিক জীব বা প্রাণী। আমরা দেখেছি যে, মানুষ তার নিজস্বার্থেই সমাজবদ্ধ জীব। কিন্তু তাকে পলিটিক্যাল হতে হয় কেন? এখানে আসছে মনস্তত্ত্বের ভূমিকা। যে মূল স্বার্থসিদ্ধির কথা গোড়া থেকেই বলছি, তার অনুসরণে বলা যায় যে, মানুষের স্বাভাবিক সহজাত প্রবৃত্তি, যাকে বলে নেচারাল ইন্সটিঙ্কট, তাতে যা আছে, সেগুলি ক্রমশ ব্যক্তির বয়স ও মনুষ্যজাতির নিজস্ব সমাজবদ্ধতার বয়স, এই দুইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে, অর্থাৎ সারাজীবন ধরে বিভিন্ন আঘাত ও প্রত্যাঘাতের মধ্য দিয়ে মানুষ ক্রমশ বেশি করে বুঝতে পারে যে, এই সামাজিক সম্পর্ক মোটেই সহজ নয়। কারণ ১) আমাদের আকাঙ্ক্ষা এবং ২) তা থেকে জাত বিভিন্ন জটিলতা। সংঘর্ষ লাগে এই ব্যক্তিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট চাওয়া-পাওয়ার মধ্য দিয়ে। একইসঙ্গে আমরা কেউই অন্যের মন সম্পূর্ণ বুঝতে পারি না। হয়তো ব্যতিক্রমী কেউ কিছুটা কিছু সময়ের জন্য তা পারে, কিন্তু কখনওই সর্বদা সব ক্ষেত্রে তা পারে না। বৃহত্তর অর্থে পারে না কেউ, তাই প্রয়োজন হয়ে পড়ে কৌশল অবলম্বনের। এই কৌশলই আসলে রাজনীতি। পেশাগত রাজনীতির পরিধির মধ্যে আমরা যে বৃহত্তর রাজনীতি দেখতে পাই, এটা তা থেকে আকারে ভিন্ন, কিন্তু প্রকারে অভিন্ন। অ্যারিস্টটল যে বলেছেন, মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী, তাতে কি এটা বোঝায় যে, মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীরা অরাজনৈতিক? না, তা ঠিক নয়। অ্যারিস্টটল যা বলতে চেয়েছেন, তা হল, মানুষ অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় বেশি রাজনৈতিক। বরং উচ্চতর গবেষণায় উদ্ভূত হয়েছে, অ্যারিস্টটলের উপলব্ধি অনুসারে, মানুষের মধ্যে যে রাজনৈতিক বোধ কাজ করে, না-মানুষ প্রাণীরাও সেই একইরকম সাধারণ এবং বিশেষ ন্যায়বিচার দাবি করে। এ কথা মাথায় রেখে জোরের সঙ্গেই বলা যায় যে, কিছু না-মানুষ প্রাণীগোষ্ঠী ভীষণভাবে রাজনৈতিক। এর থেকে এ প্রশ্ন মাথায় আসে যে, সামাজিকভাবে জটিলতর ও গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বসবাস করা না-মানুষ প্রাণীদের চেয়ে মানুষ বেশি রাজনৈতিক কি না।
মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী, কারণ সে একত্রে বসবাস করে, অর্থাৎ সামাজিক প্রাণী, কিন্তু তার বাকশক্তি আছে, নৈতিক যুক্তি আছে। অতএব এটা সুস্পষ্ট যে, রাষ্ট্র প্রকৃতির এক সৃষ্টি এবং মানুষ স্বভাবত রাজনৈতিক প্রাণী। যে প্রাণী আকস্মিকভাবে নয়, স্বভাবতই রাষ্ট্র ছাড়া থাকতে পারে, সে হয় মানবজাতির চেয়ে ঊর্ধ্বে অথবা তার নীচে অবস্থান করে। সে এক গোষ্ঠীহীন, নিয়মহীন ও হৃদয়হীন প্রাণী, যাকে হোমার অপছন্দ করতেন। সে গোষ্ঠীচ্যুত এবং সর্বদা লড়াই করতে ভালোবাসে। সে সেই পাখির মতো, যা একাই উড়ে বেড়ায়।
অন্য পোস্ট: ধর্ষণ, খুন ও বর্তমান সমাজ
অ্যারিস্টটলের উক্তির একটি অর্থ হল, মানুষ স্বভাবতই সামাজিকতা বোধসম্পন্ন এবং তারা স্বাভাবিকভাবেই তাদের সামাজিক প্রয়োজন মেটাতেই বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আর এক অর্থে ‘রাজনৈতিক’ কথাটার একটি মন্দ দ্যোতনা থাকে। তাতে বলা হয়, যেহেতু রাজনীতি সহিংসতা এবং সহিংসতার ভীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, তাই এই উক্তির মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে এই সত্য যে, মানুষের স্বভাবে অন্তর্নিহিত পশুত্ব থাকে, যুক্তিবাদিতা এবং সহযোগিতার প্রবৃত্তি থাকে না।
সহিংসতা শুধু দৈহিক হয় না, বেশিটাই হয় মনস্তাত্ত্বিক। দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক হিংসা বা সহিংসতা চূড়ান্ত পরিণতিতে দৈহিক হিংসার আকার নেয়। এক মনস্তত্ত্ববিদ বলেছিলেন, ভাগ্যিস আমরা একে অপরের মন পড়তে পারি না। ধরা যাক, দু’জন মানুষ পাশাপাশি বসে খাচ্ছে ও গল্প করছে, কিন্তু দু’জনে একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে বা গালাগালি দিচ্ছে, তা যদি তারা বুঝতে পারত, তবে মারামারি শুরু করে দিত এবং এভাবে গোটা পৃথিবীর সব মানুষই ধ্বংস হয়ে যেত কয়েক মুহূর্তে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, মানুষ একে অপরের মন বুঝতে পারে না।
মানুষের মতো এমন স্কিমিং, ক্যালকুলোটিং প্রাণী আর দু’টি নেই। সারাক্ষণই তার কেটে যায় নিজের সুরক্ষার চিন্তায়। সেই সুরক্ষা শুধু প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ নয়, সেটা তো আছেই, তার অতিরক্ত কিছু আছে, যেটা এক অনির্ণয়যোগ্য বৈশিষ্ট্য। সেটাই রাজনীতির মূল আধার। এই বৈশিষ্ট্যের দেখা মেলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। মনে রাখতে হবে, আমাদের সামাজিক গঠনের ক্ষুদ্রতম একক হল পরিবার। তা গঠিত হয় দু’জন অপরিচিত মানুষের মধ্যে এক সামাজিক চুক্তির দ্বারা, যা সমাজ ও রাষ্ট্র স্বীকৃত। সেখানে থাকে নিত্যদিনের রাজনীতি। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মধ্যে চলে রাজনীতি। পরিবারের বাইরে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, কর্মস্থল, যে কোনও সংগঠন— সবই এই রাজনীতির আবর্তে ঘোরাফেরা করে। আর রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে যে রাজনীতি দেখি, এমনকী রাষ্ট্রের বাইরে বৃহত্তর বিশ্বে আন্তঃরাষ্ট্রীয় আঙিনায় যে রাজনীতি, তা এই ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক রাজনীতিরই যোগফল।
সুতরাং মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী বলতে কোনও দ্বিধা নেই। অ্যারিস্টটল অবশ্য পলিটিক্যাল কথাটা ব্যবহার করেছিলেন, কারণ মানুষ polis-এ বাস করে। polis-এর অর্থ শহর বা নগর। তখন গ্রিসে ছিল নগর রাষ্ট্র। কিন্তু সেই নগর রাষ্ট্র ছিল এক সুসংগঠিত ও ঘনবদ্ধ জনবসতি, যেখানে ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও সামাজিক, দুই প্রয়োজনই মেটাত। কিন্তু আধুনিক অর্থে রাজনৈতিক জটিলতা ক্রমবিবর্তিত হয়েছে। তবে রাজনীতিকে যে অর্থে আমরা জানি ও বুঝি, তার সব বৈশিষ্ট্যই মানুষের স্বভাবজ, কারণ মানুষের বুদ্ধি ও সচেতনতা সেদিকেই তাকে চালিত করে। মানুষ অন্যদের মধ্যেই ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে, এমন সমাজে বাস করে, যা অনেক নিয়ম ও প্রথার দ্বারা শাসিত হয়। মানুষ সামাজিক প্রেক্ষিতে তার অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশ ঘটায় ও তার স্বাভাবিক লক্ষ্য অর্জন করে। এটাই উত্তম জীবন। এটা কোনও সহজ জীবন নয়, কিন্তু এক পুণ্য জীবন, যা সর্বোচ্চ কল্যাণের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। সেটাই সুখ।
