Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ধর্ষণ, খুন ও বর্তমান সমাজ 

ধর্ষকদের দ্রুত শাস্তি না হলে বোধ হয় এই দুষ্কর্ম বেড়েই চলবে। আর প্রশাসনকেও সৎভাবে দ্রুত তদন্ত করিয়ে বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ধর্ষণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

Share Links:

অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

গত ১২ নভেম্বর কলকাতা হাইকোর্টে ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল নদিয়ার এক গণধর্ষণে অভিযুক্তদের জামিন মঞ্জুর করেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি। অর্থাৎ তদন্তের গাফিলতির জন্য দোষীদের জামিন দিতে বাধ্য হচ্ছে আদালত।

গত ৮ নভেম্বর এক গৃহবধুকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ। ক্যানিংয়ের দাড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে তাঁর বাড়ি। ঘটনায় অভিযুক্ত তাঁর প্রতিবেশী। গত ৮ নভেম্বর ওই প্রতিবেশী তাঁকে ক্যানিংয়ের একটি আবাসিক লজে নিয়ে ওঠেন সেখানেই তাঁকে খুন করা হয় বলে অভিযোগ।

গত ৩১ অক্টোবর সকালে স্বামীর সঙ্গে প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন এক মহিলা। কল্যাণী রেল ব্রিজের নীচের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন দুষ্কৃতী তাঁর স্বামীকে জাপটে ধরে। অন্য দুষ্কৃতীরা চড়াও হয় ওই মহিলার ওপর। তারা ওই মহিলাকে টেনে ব্রিজের তলায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ। স্বামী নিজের চোখের সামনে স্ত্রীকে ধর্ষিতা হতে দেখে ছটফট করলেও দুষ্কৃতীদের হাত থেকে বাঁচাতে পারেননি তাঁকে। তারপর দুষ্কৃতীরা পালিয়ে গেলে স্বামীকে নিয়ে কল্যাণী থানায় গিয়ে ওই নির্যাতিতা মহিলা লিখিত অভিযোগ করেন। পুলিশ লিখিত অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নেমে আটজনকে আটক করে। একই দিনে বর্ধমানের বাজেপ্রতাপপুরে রাতে প্রেমিককে বেঁধে রেখে তাঁর পরিচিত একদল যুবক এক তরুণীকে গণধর্ষণ করে। তরুণী বর্ধমান থানায় অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে।

গত ২৯ অক্টোবর দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলিতে এক পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়ে গিয়ে এক মূক ও বধির মহিলাকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ।

গত ২২ অক্টোবর আলিপুরদুয়ারে এক সাত বছরের বালিকাকে ধর্ষণ করে খুন এবং পরে পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনায় অভিযুক্ত চারজন পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। এই ঘটনার রেশ মিটতে না মিটতেই সাড়ে ছ’বছরের এক বালিকাকে ধর্ষণ করে খুন করার অভিযোগ ওঠে এক প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে। ওই প্রতিবেশী ব্যক্তি প্রায়ই তাকে খাবারের লোভ দেখিয়ে নিজের দোকানে নিয়ে যেতেন ওই প্রতিবেশী। ওইদিন বালিকার বাবা-মা কৃষিজমিতে কাজ করছিলেন। সে সময় বালিকা বাড়ির সামনে খেলছিল। তখন অভিযুক্ত জিলিপি খাওয়ানোর নাম করে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ ও খুন করে পাশের পুকুরে ফেলে দেন। তা জানতে পেরে প্রতিবেশীদের গণপ্রহারে অভিযুক্তের মৃত্যু হয়।

উত্তর ২৪ পরগনার এক প্রান্তিক এলাকায় গত ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় নির্জন রাস্তায় এক নাবালিকাকে ভয় দেখিয়ে হাত বেঁধে অপহরণ করেন বলে অভিযোগ তার এক প্রতিবেশী যুবকের বিরুদ্ধে। তারপর তাকে পাশের একটি মাঠে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন। মেয়েটি এ বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী।

গত ২ নভেম্বর হুগলির একটি গ্রামে ১৪ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ প্রতিবেশী এক যুবকের বিরুদ্ধে। বছর ২৩-এর ওই যুবককে মেয়েটি কাকা বলে ডাকত। ওইদিন বেলা সাড়ে ১২ নাগাদ মেয়েটি বাথরুমে স্নান সেরে ঘরে ঢুকতেই যুবকটি ওই কাণ্ড ঘটিয়ে পালায়। তখন বাড়িতে কেউ ছিলেন না।

গত ৪ অক্টোবর জয়নগরের গরানকাটি এলাকায় ৯ বছরের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে খুন করা হয় বলে অভিযোগ। টিউশন পড়ে ফেরার পথে তাকে অপহরণ করে অভিযুক্ত।

গত ১ নভেম্বর আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটায় ৬ বছরের এক বালিকাকে ধর্ষণ করে খুন করে প্রমাণ লোপাটের জন্য তার দেহ স্থানীয় পুকুরে ফেলে দেন অভিযুক্ত প্রতিবেশী। পরে গণপ্রহারে মৃত্যু হয় ওই অভিযুক্তের। ওইদিনই কুমারগ্রামের হলদিবাড়িতে ৯ বছরের এক বালিকাকে নদী থেকে তুলে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ২৭ বছরের এক যুবক ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ। গুরুতর অসুস্থ ওই বালিকাকে আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

গত ২৫ আগস্ট সকালে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর মহকুমার বাঁকাদহ এলাকার চাঁচর গ্রামের লাগোয়া জঙ্গলে উদ্ধার হয় এক বধূর অর্ধনগ্ন দেহ। অভিযোগ, তাঁকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে।

বোলপুর থানার বাহিরীপাঁচশোয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের করিমপুর গ্রামে গত ১৭ আগস্ট দুপুরে মাথায় আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে সন্তানের সামনেই বধূকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ। ধর্ষণের পর নির্যাতিতার যৌনাঙ্গে বন্দুক ঢুকিয়ে নৃশংস অত্যাচার করা হয়।

গত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের বিকেলে শিলিগুড়িতে একটি ফাঁকা মাঠে এক নাবালিকাকে গণধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর নাবালিকাকে ফাঁকা মাঠে ফেলে রেখে যান অভিযুক্তরা। বাড়ির লোকজন তাকে উদ্ধার করে রাতে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেন।

গত বৃহস্পতিবার ১৫ আগস্ট নদিয়ার কালীগঞ্জের অন্তর্গত পানিঘাটা পঞ্চায়েত এলাকায় এক সাড়ে তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে এক প্রৌঢ়ের বিরুদ্ধে। পরিবারের তরফ থেকে ঘটনার খবর পেয়ে অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

উপরের ঘটনাগুলি রাজ্যের নানা প্রান্তের মেয়েদের ওপর যৌন হেনস্থার ধারাবিবরণী। যৌন নির্যাতন শুধু নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা ধর্ষণের রূপ নিচ্ছে। কোথাও কোথাও গণধর্ষণের পর নৃশংস খুন করা হচ্ছে। শিশু থেকে গৃহবধূ, স্কুল পড়ুয়া থেকে কলেজ পড়ুয়া, এমনকী বয়স্ক মহিলারাও ধর্ষক-খুনিদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। এমনকী সন্নাসিনীরাও এই তালিকা থেকে বাদ নেই। বছর দশেক আগে রানাঘাটের একটি খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলের এক সন্ন্যাসিনী ডাকাত দলের হাতে ধর্ষিতা হয়েছিলেন। দৈনিক সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলগুলিতে প্রতিদিন রাজ্যের কোথাও না কোথাও ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার বিবরণ থাকে। এটা যে শুধু আমাদের রাজ্যের ঘটনা, তা নয়। সারা ভারতেই চলে এই ঘৃণ্য কাজ। মহিলাদের ওপর বলাৎকারের ঘটনা সমাজের একটি পুরোনো ব্যাধি। ইদানীং এটা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যারা এই কাজটি করছে, তারা হয় নিজে প্রভাবশালী কিংবা কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রচ্ছন্ন মদতে এ ধরনের জঘন্য কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের সমাজে এখনও অনেক পরিবার আছে, যারা লোকলজ্জার ভয়ে বা প্রতিবেশীর তীব্র কটাক্ষ ও কুৎসিত ইঙ্গিতের ভয়ে ঘটনা চেপে যাওয়ার চেষ্টা করে। বলে না, মানুষই মানুষের বড়ো শত্রু!  তাই কারও বাড়িতে এমন ঘটনা ঘটলে প্রতিবেশীরা মজা লোটার চেষ্টা করেন।  যাঁদের পরিবারে এই ঘটনা ঘটে, কেবল তাঁরাই এর যন্ত্রণা বোঝেন।  গত কয়েক দশক ধরে নারীরা অনেক কিছুতেই স্বনির্ভর। সরকারও তাঁদের পুরুষের সমানাধিকার দিয়েছে। তারপরও কি মহিলারা কর্মক্ষেত্রে লাঞ্ছিত হচ্ছেন না?  মহিলা কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, মহিলাদের সুরক্ষার জন্য তৈরি হলেও রেহাই নেই তাঁদের।

তবে গত ৯ আগস্ট আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তারি পড়ুয়ার নৃশংস খুনের পর জুনিয়র ডাক্তারদের নেতৃত্বে যেভাবে সাধারণ মানুষ বিচারের দাবিতে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে ঝাঁপিয়েছে, তা কিছুটা আশা জাগিয়েছে অবশ্যই।  আমরা যাঁরা সমাজে বাস করি, তাঁদের কার বাড়িতে মা, বোন, দিদি, স্ত্রী, পিসি, মাসি নেই বলুন তো? আর জি কর কাণ্ডের প্রতিবাদের মিছিলে অনেকরকম স্লোগান শুনেছি। তার মধ্যে একটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ— ‘পুলিশ তুমি ভেবে দেখো, তোমার মেয়েও হচ্ছে বড়’। নারী নির্যাতনের মতো অত্যাচারের বিরুদ্ধে যখন প্রতিবাদ মিছিল করা হয়, তখন আটকাতে এগিয়ে আসে পুলিশবাহিনী। কিন্তু তারা তো হুকুমের দাস।  তাদের উদ্দেশে যখন এই স্লোগান দেওয়া হয়, তা নিশ্চয়ই তাদের ভালো লাগে না। চাকরির দায়বদ্ধতার জন্য তাদের কিছু করার নেই। একদিন যে কোনও পুলিশকর্মীর মেয়ে বা স্ত্রী আক্রান্ত হবেন না, তার গ্যারান্টি কে দিতে  পারে! আবার আক্রান্ত পরিবার থানায় গিয়ে এফআইআর করতে গেলেও অনেক ঝক্কিঝামেলা পোয়াতে হয়। আবার অনেক সময় রক্ষকই ভক্ষক হয়ে ওঠে।

আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রীর নৃশংস খুনের ঘটনায় এখনও বিচার প্রক্রিয়া চলছে। জুনিয়র ডাক্তারাও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের সহপাঠীর জন্য। সাধারণ মানুষ এই জঘন্যতম ঘটনার বিরুদ্দে যে একজোট হয়ে প্রতিবাদে শামিল হয়েছে, এটা বর্তমান সমাজের কাছ থেকে বড় পাওয়া। যেখানে বাঙালি প্রতিবাদ করতে ঘর থেকে বেরোত না, সেখানে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, আমরা দেখেছি ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগানের ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে খেলার মাঠে চূড়ান্ত রেষারেষি চললেও আর জি কর কাণ্ডের প্রতিবাদে একসঙ্গে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন কলকাতা মাঠের আর এক প্রধান ফুটবল দল মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সমর্থকরাও। তাই এই প্রতিবাদ আন্দোলন ঐতিহাসিক।

আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রীর নৃশংস খুনের ঘটনার পর সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ চলছে। কিন্তু তাতে ধর্ষকদের কোনও হেলদোল নেই। কেন এত ধর্ষণের ঘটনা ঘটে চলেছে? আমার মনে হয়, এর প্রধান কারণ ধর্ষণ প্রমাণ করে দ্রুত শাস্তি দিতে না পারা। আবার তদন্তকারীদের গড়িমসি তদন্তকে বিলম্বিত করে। ফলে অভিযুক্ত অচিরেই জামিন পেয়ে ফের স্বমূর্তি ধারণ করেন। আর রয়েছে সমাজের সর্বস্তরে অবক্ষয়। সমাজ চলে যাচ্ছে বাহুবলীদের হাতে। এটা গণতন্ত্রের প্রতি অশনিসংকেত। রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায়  ধীরে ধীরে আঁধার ঘনিয়ে আসছে। পড়াশোনার পর যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের অভাব ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া বিমুখ করে তুলেছে। ফলে প্রকৃত শিক্ষার অভাবে যুবসমাজ অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। গত কয়েক বছর ধরে রাজ্যে যেসব দুর্নীতির ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে, তা প্রত্যেকেই টিভি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছে। এত বড় বড় দুর্নীতি করার পরও অভিযুক্তদের শাস্তির ব্যবস্থা এখনও হয়নি। এসবও বোধ হয় ধর্ষকদের কুকাজে উৎসাহিত করছে। ধর্ষকদের দ্রুত শাস্তি না হলে বোধ হয় এই দুষ্কর্ম বেড়েই চলবে। আর প্রশাসনকেও সৎভাবে দ্রুত তদন্ত করিয়ে বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ধর্ষণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। শাস্তি যত বিলম্বিত হবে, এ ধরনের দুষ্কর্ম ততই বাড়বে।

3 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए