অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

থমকে গেল পুজো। আটকে গেল প্রতিমা গড়ার কাজ। রেকর্ড গড়তে গিয়েছিল পুজো কমিটি। এ বছর ১১২ ফুটের প্রতিমা তৈরি করে নজির সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন নদিয়ার কামালপুর গ্রামের চাষিরা। কিন্তু প্রশাসনের অনুমতি মেলেনি। তাই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন পুজো উদ্যোক্তারা। তবে শেষরক্ষা হল না। পুজো বন্ধ করারই সিদ্ধান্ত নিল পুজো কমিটি।
কামালপুর রানাঘাটের ধানতলা থানার অন্তর্গত একটি গ্রাম। সেখানকার বেশির ভাগ বাসিন্দাই কৃষিজীবী। বর্তমানে অধিকাংশ জমিতে চাষিরা ফুলের চাষ করে থাকেন। নিকটবর্তী নোকারি এবং ধানতলা ফুলের বড় বাজার। প্রতিদিন সেখানে ভোর ৪টে থেকে ফুলের বাজার বসে যায়। দূরদূরান্তের ফুল ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে ফুল কিনে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যান। কামালপুরে বিঘার পর বিঘা জমিতে বিভিন্নরকম ফুলের চাষ করা হয়।
দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে হঠাৎই কামালপুর গ্রামটি এখন উঠে এসেছে সংবাদ শিরোনামে। সেখানকার কিছু মানুষ চেয়েছিলেন তাঁদের গ্রামকে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি দিতে। তাই তাঁরা এবারের দুর্গোৎসবকে কাজে লাগিয়ে সবার নজর টানতে চেয়েছিলেন। তাঁরা ফাইবারের এমন একটি দুর্গাপ্রতিমা গড়তে চেয়েছিলেন, যার উচ্চতা রেকর্ড করবে। গত ছ’মাস ধরে তাঁরা কাজও এগিয়েছিলেন। ১১২ ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা গড়ার জন্য মৃৎশিল্পী নিয়ে যান। যে দুর্গাপ্রতিমা উচ্চতায় ১১২ ফুট, তার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, অসুর, সিংহ, মহাদেব, প্রত্যেকের আকারও মানানসই করতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই বিশালাকার অসুর, মহাদেবের নির্মাণ শুরু হয়েছিল অনেকদিন আগেই। কিন্তু বাধ সাধে সরকারি প্রশাসন। তারা সংকীর্ণ রাস্তা, বহু মানুষের জমায়েত সামলানোর পরিকাঠামো, যানবাহন চলাচলের সমস্যা, দমকলের যাতায়াতের অপরিসর রাস্তা ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে পুজোর অনুমতি রদ করে দেয়।
বিশ্বে নজির গড়তে এবং নিজেদের গ্রামের নাম ছড়িয়ে দিতে কামালপুরের অভিযান সংঘ ১১২ ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে জেলা প্রশাসন অনুমতি না দিলে তারা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। হাইকোর্টের বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের এজলাসে মামলাটি ওঠে। বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজ জেলাশাসককে পুজোর অনুমতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যায় কি না, তা আলোচনা করে গত ৩ অক্টোবর কোর্টে জানাতে বলেন। কিন্তু অভিযান সংঘ তার আগেই পুজো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর কারণ হিসাবে জানা যায়, পুজো কমিটির হাইকোর্টে মামলা চালানোর আর্থিক ক্ষমতা নেই। আর প্রশাসনের সঙ্গেও তারা দ্বন্দ্ব চায় না।
অন্য পোস্ট: রবীন্দ্রনাথও বিদ্যাসাগরকে চেনাতে পারেননি
কামালপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, পুজোমণ্ডপের বিশাল উচ্চতার বাঁশের কাঠামো চাষের জমিতে করা হয়েছে। আর তার চারদিকে চাষের জমি। পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে একদিকে নোকারি এবং অন্যদিকে ধানতলা যাওয়ার পিচের রাস্তা। রাস্তার যেদিকে পুজোমণ্ডপ, সেদিকে কোনও বাড়িঘর নেই। শুধুই চাষের জমি। রাস্তার অন্যদিকে কামালপুর গ্রাম।
গ্রামের চাষিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের চাষ গত ৬ মাস ধরে বন্ধ রেখেছেন। মণ্ডপের চারদিকে চাষের জমি। সেখানে মেলা বসানোর ভাবনা ছিল পুজো উদ্যোক্তাদের। রাস্তা ভালো, যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো, চাষের কয়েকশো বিঘা জমি রয়েছে মণ্ডপের সামনে।
নদিয়ায় বড় দুর্গাপুজোর জন্য বাদকুল্লা খ্যাত। বেশ কয়েকটি বড় বাজেটের পুজো হয় বাদকুল্লায়। সেখানে মণ্ডপের আশপাশে এত জায়গা নেই, যা রয়েছে কামালপুরের মণ্ডপের চারদিকে। আর কলকাতা তো এমনিতেই ঘিঞ্জি। তার ওপর দুর্গাপুজোর সময় লক্ষ লক্ষ দর্শক সমাগম হয়। এমন একটি জায়গায় কি সব নিয়ম মেনে পুজো কমিটিগুলি পুজো করে! তাই গ্রামের মানুষের মুখ চেয়ে কি এই পুজোর অনুমতি দেওয়া যেত না? মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় কলকাতার দুর্গোৎসব ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের শিরোপা পেয়েছে। তাই রেকর্ড করতে চাওয়া কামালপুরের বাসিন্দাদের আবেদন কি বিবেচনা করা যেত না?
মহালয়ার দিনেই সারা গ্রামে নেমে আসে বিষণ্ণতা, যখন সংগঠকরা জানিয়ে দেন, এ বছর আর পুজো হবে না। চাষের জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইল অর্ধসমাপ্ত প্রতিমার কাঠামো। ৪০-৫০ জন শিল্পীর গত ছ’মাসের কাজ মূল্যহীন হয়ে গেল।
