শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বেতারের এই ঐতিহাসিক বিশেষ প্রভাতী সংগীতালেখ্যর অনুষ্ঠান। ৯১ বছর ধরে সম্প্রচারিত একটি বেতার অনুষ্ঠান আজও স্বমহিমায় পবিত্র। ১৯৩২ সাল থেকে সম্প্রচারিত ঐতিহ্যমণ্ডিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ মহালয়ার ভোরে আকাশবাণী কলকাতা গীতাঞ্জলি ও অন্যান্য সর্বভারতীয় চ্যানেলে সম্প্রচারিত হয়। মানুষ আজও বেতারে সম্প্রচারিত এই অনুষ্ঠানকে ‘মহালয়া’ বলে। যদিও এই অনুষ্ঠানকে মহালয়া বলা ঠিক নয়।
‘মহিষাসুরমর্দিনী’ আলেখ্যর রচনা ও প্রবর্তনা বাণীকুমারের (আসল নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য)। সংগীত পরিচালনা করেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। ১ ঘণ্টা ২৯ মিনিটের অনুষ্ঠানটির গ্রন্থনা ও শ্লোকপাঠে ঋত্বিক একজনই, তিনি প্রবাদপ্রতিম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। তাঁর ডাকনাম ছিল বুশী।
১৯৭৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ‘দেবীং দুর্গতিহারিনী’ সম্প্রচারিত হয়। রচনাকার ছিলেন পণ্ডিত ড. ধ্যানেশ নারায়ণ চক্রবর্তী। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। স্তোত্রপাঠে ছিলেন গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়, মাধুরী মুখোপাধ্যায় এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। গ্রন্থনায় ছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার। ‘দেবীং দুর্গতিহারিনী’ তৎকালীন সময়ের মানুষের পছন্দ হয়নি। এ কারণে ১৯৭৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বহু বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়েছিল আকাশবাণী ভবনকে।
১৯০৫ সালের ৪ আগস্ট কিংবদন্তি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জন্ম উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায়। তাঁর শিক্ষক রাজেন্দ্রনাথ দে এবং একটি পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতিকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। রাজেন্দ্রনাথ দে ছিলেন মোহনবাগানের হাফব্যাক ফুটবলার। তিনি আইএফএ শিল্ড বিজয়ী দলের সদস্য ছিলেন। কণ্ঠস্বরটিও ছিল শ্রুতিমধুর। সুকণ্ঠের জন্য বেতারের ঘোষক ও সংবাদ পাঠকের চাকরি পান। রাজেন্দ্রনাথ দে ও সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সে সময় বেলুড় মঠে যেতেন। সঙ্গে থাকত বালক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। বেড়াতে বেড়াতেই অনর্গল চণ্ডীস্তোত্র তাঁদের শোনাত বালক বুশী। বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠে চণ্ডীস্তোত্র শুনে রাজেন্দ্রনাথ দে তাঁর বাড়িতেই দুর্গাপুজো শুরু করে বালক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে দিয়ে চণ্ডীপাঠ করাতেন।
তরুণ বয়সে পূর্ব রেলে স্থায়ী চাকরি পান বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। চাকরি করতে করতেই বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে গারস্টিন প্লেসে আড্ডা দিতে যেতেন। গারস্টিন প্লেসের গারস্টিন ভবনে তখন ছিল রেডিয়ো স্টেশন। বাংলার ষষ্ঠ সার্ভেয়ার মেজর জেনারেল গারস্টিনের নামানুসারে ছিল ওই নাম। ১৯৬১ সালে গারস্টিন ভবনে থেকে ইডেন গার্ডেনে আকাশবাণী ভবন স্থানান্তরিত হয়ে যায়। ১৯৩৬ সালে যার নাম হয় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’।
অন্য পোস্ট: প্রেমিক বিভুতিভূষণ তাঁর প্রকৃতিপ্রেমের মতোই আন্তরিক
বড্ড মজার ও রসিক মানুষ ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। মুখেই বহু ধরনের বাঁশি, বাজনা অনায়াসে বাজাতে পারতেন। সে সময় (১৯২৯-’৩০) গারস্টিন প্লেসে বেতার অনুষ্ঠানের ডিরেক্টর নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার, যিনি ছিলেন বিশিষ্ট ক্ল্যারিওনেটবাদক ও অনুষ্ঠান পরিচালক, তিনি বেতারে ডাকেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে। অডিশন নেন। কিন্তু বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠস্বর বেতার উপযোগী নয় বলে নৃপেন্দ্রবাবু তাঁকে অডিশনে ‘ফেল’ করিয়ে দেন। ১৯৩০ সালে ‘মহিলামহল’ অনুষ্ঠানের পরিচালক কোনও কারণে অনুপস্থিত হলে ডেকে পাঠানো হয় ‘ফেল’ করা বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে। বেতার ভবনের একটি ঘরে সেই মুহূর্তে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। ‘মেঘদূত’ ছদ্মনামে ‘মহিলামহল’-এর হাল ধরেন। বিরতিতে নিজেই মুখে বাজাতেন বিরতির কনসার্ট। সেই ছিল তাঁর প্রথম রেডিয়ো অনুষ্ঠান। ‘মহিলামহল’-এর আকাশচুম্বী সাফল্যে বেতার কর্তৃপক্ষ তার নাম বদল করে ‘মহিলা মজলিশ’ দেয়। ‘মহিলা মজলিশ’ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ উপস্থাপনা করতেন ‘বিষ্ণুশর্মা’ ছদ্মনামে। তারপরই বেতারে দায়িত্ব পান প্রোগ্রাম ডিরেক্টরের। মেঘদূত ছদ্মনামে ‘সবিনয় নিবেদন’ ছাড়াও ‘লাউড স্পিকার’ ছদ্মনামেও বহু অনুষ্ঠান করেছেন। ‘বিরূপাক্ষ’ ছদ্মনামে লিখেছেন সাহিত্য। তখন বেতারের ডিরেক্টর ছিলেন জে পি স্টেপলটন।
ধীরে ধীরে রেডিয়োর অপরিহার্য হয়ে যান বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। চাদরমুড়ি দিয়ে ‘বেতার জগৎ’ বিক্রি করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে রেডিয়োয় রামায়ণ, মহাভারত পড়েছেন। ধারাবিবরণী দিয়েছেন। নাটক প্রযোজনা করেছেন। নাটকে অভিনয় করেছেন। রেলের চাকরি পরিত্যাগ করেছেন।
অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো থেকে অবসর গ্রহণের পর থেকেই আজন্ম স্মৃতিধর মানুষটি স্মৃতিহীনতার ভীষণ অসুখে পড়েন। সামনে কাউকে দেখলেও চিনতে পারতেন না। পেনশন ছিল না। ছিল নিদারুণ অর্থাভাব। ১৯৯১ সালের ৩ নভেম্বর ভারতীয় সংস্কৃতির উজ্জ্বল অমর ব্যক্তিত্ব, বাঙালির ঐতিহ্যপুরুষ প্রবাদপ্রতিম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহাপ্রয়াণ হয়।
