বিবেকানন্দ চট্টোপাধ্যায়
প্রধান শিক্ষক, চিত্তরঞ্জন উচ্চবিদ্যালয়, পুরুলিয়া

মেকলে সাহেব ভারতীয়দের থেকে কিছু ইংরেজি জানা করণিক চেয়েছিলেন। তার জন্য তাঁর বিখ্যাত ’মেকলে মিনিট’-এ তিনি এ দেশে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রস্তাবিত শিক্ষার টার্গেটেড সেকশন ছিল সমাজের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। পরিষ্কার করে বললে বলতে হয়, আপামর ভারতবাসী শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধুনিকমনস্ক হোক ও এগিয়ে যাক, এটা ইংরেজের উদ্দেশ্য ছিল না।
প্রাচীন ভারতের বৈদিক গুরুকুল শিক্ষাব্যবস্থায় কিন্তু সমাজের সমস্ত শ্রেণির (লিঙ্গ নির্বিচারে) মানুষের অবাধ সম্পৃক্ততা ছিল। আর এজন্যই গার্গী, লোপামুদ্রাদের মতো বিদূষী নারীরা এবং ধীবরপুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস বৈদিক শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পেরেছিলেন। ভাষা, ব্যাকরণ, গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, যোগ, অস্ত্রচালনা, ধনুর্বিদ্যা, এমনকী আয়ুর্বেদীয় শল্যচিকিৎসা গুরুকুল শিক্ষা ব্যবস্থার অঙ্গীভূত ছিল। ভারতের প্রাচীন যুগে বৈদিক যুগোত্তর (late Baidic era) কাল খণ্ডে বিশেষত ভগবান বুদ্ধের আবির্ভাবের পর ভাষা হিসাবে সংস্কৃত ক্রমশ রাজ দরবার এবং যজন-যাজন ক্রিয়া শিক্ষার প্রয়োজনে পণ্ডত পুরোহিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পালি, ব্রাহ্মী, খরোষ্ঠি ইত্যাদি ভাষা তার জায়গা নেয় আপামর ভারতবাসীর কথ্য ভাষা হিসাবে। রাজা অশোক এবং সমুদ্রগুপ্তের শিলা ও স্তম্ভলিপিতে তাই সংস্কৃত ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। মধ্যযুগে ইসলামি ভারতবর্ষের রাজ দরবারের ভাষা ছিল আরবি, ফারসি। কালক্রমে সংস্কৃতের সঙ্গে এই ভাষাদ্বয়ের সংশ্লেষের ফলে এক নতুন ভাষা জন্ম নেয়, যার নাম উর্দু। ভাষা হচ্ছে ভাবের বাহন এবং শিক্ষার মাধ্যম।
অন্য পোস্ট: আন্দামান বাঙালিদের কাছে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র
স্বাভাবিকভাবেই যে ভাষায় আপামর জনগণ কথা বলে, সেই ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি না হলে, তার মাধ্যমে শিক্ষাদান না হয়ে থাকলে, শিক্ষাই পিছনের সারিতে চলে যায়। ভারতবর্ষে ঠিক এটাই ঘটেছিল। ভারতের প্রাচীন যুগের শেষ কয়েকশো বছর এবং মধ্যযুগের (১১৯২ থেকে ১৭০৭ সাল) শুরুর দিকের ২/৩ শতাব্দী ছিল ভারতীয় শিক্ষার অন্ধকার যুগ ঠিক এ কারণে। সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত প্রাদেশিক ভাষাগুলো মোটামুটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষদিক থেকে বিকশিত হতে শুরু করে। পরবর্তীতে সে সমস্ত ভাষায় পাঠদান ও সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। মূলত তখন থেকেই ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থার সুফল সমাজের তৃণমূল স্তর পর্যন্ত পরিব্যপ্ত হয়। আধুনিক যুগে ইংরেজ আসার পরে ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থা আরও উৎকর্ষ লাভ করে। মধ্যযুগীয় বর্বরতা, অজ্ঞানতার অমানিশা, রাজ পৃষ্ঠপোষকতাহীনতার কারণে চরক, সুশ্রুত, বরাহমিহির, কণাদ, আর্যভট্টদের উত্তরসূরিদের আমরা পেলাম না। মধ্যযুগে সুদীর্ঘকাল ধরে ভারতবাসী তার অতীত ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষাকারী উল্লেখযোগ্য সেরকম কিছু উদ্ভাবনী দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। প্রায় ৭০০ বছরের দিনগত পাপক্ষয়ের অবসান হয় উনবিংশ শতকে ব্রিটিশরাজের পৃষ্ঠপোষকতায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচলনের মাধ্যমে। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে, উনবিংশ শতকের পূর্বে কি ভারতে কোনওরূপ শিক্ষাব্যবস্থার অস্তিত্বই ছিল না? অবশ্যই ছিল। তবে টোল, চতুষ্পাঠী, মাদ্রাসা, মক্তব ইত্যাদি নামের শিক্ষাকেন্দ্রগুলিতে ভাষা, যেমন, সংস্কৃত, আরবি, ফরাসি, ব্যাকরণ এবং কিঞ্চিৎ গণিত ব্যতীত কিছুই শেখানো হত না। এই শিক্ষাব্যবস্থা সমাজকে দেন কিছু ব্রাহ্মণ্যবাদী গোঁড়া পণ্ডিত ও পরমত অসহিষ্ণু কট্টর হুজুর। স্বভাবতই সাধারণ আপামর ভারতবাসীর মধ্যে এই শিক্ষার প্রতি বিশেষ ভালোবাসা ছিল না। ফলস্বরপ কালক্রমে জাতি শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়ে।
তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালায়ালাম বাদ দিয়ে ভাষা হিসাবে সংস্কৃত বিশেষ করে উত্তর বৈদিক যুগে (post vedic era) বাকি ভারতের আপামর জনসাধারণের মুখের ভাষা ছিল না। সে কারণে সংস্কৃত সাহিত্য সম্ভার তৎকালীন সময়ে যথেষ্ট উন্নত ও বৃহৎ হলেও মানুষ সংস্কৃত শিক্ষার প্রতি আকর্ষণ হারায়। জনপ্রিয় কোনও ভাষা (mass language) এবং তার নিজস্ব হরফ (script) ছাড়া কার্যকরী ও ব্যাপক শিক্ষাদান (effective transmission of education) একেবারেই সম্ভব নয়। সংস্কৃত ভাষা থেকে সৃষ্ট আজকের ভারতের যে আঞ্চলিক ভাষাগুলো রয়েছে, যেমন, বাংলা, ওড়িয়া, গুজরাটি, রাজস্থানি, অসমিয়া, মৈথিলি, মাগধি ইত্যাদির মানুষের প্রয়োজনের তাগিদেই দিন দিন সংস্কার হতে থাকে এবং ক্রমে আধুনিক রূপ নেয়।
