Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

পুরো শিক্ষাটাই যখন মাটি

Share Links:

রাজকুমার মোদক

মধুপুর প্রাইমারি স্কুলকে মধুবাবু রাস্তার ধারে কাঠা দশেক জমি দান করে ছিলেন এই আশায় যে, গ্রামের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখবে আর তার চাকরিটা একদিন না একদিন পাকা হবেই। যদিও স্কুলটা যে দিন উদ্ধোধন হয়, প্রাইমারি স্কুল শিক্ষামন্ত্রী নিজে এসে ভরা সভায় চাকরির বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান। ছোটবেলা থেকেই মধুবাবুর এটাই ছিল লক্ষ্য, প্রাইমারি স্কুলে পড়ানো। তবে এই লক্ষ্য স্থির করার অন্য একটি কারণও ছিল। তিনি দেখতেন, তাঁর এক দূর সম্পর্কের দাদু মাঝেমধ্যেই তাঁদের বাড়িতে আসতেন। তিনি প্রাইমারি স্কুলে পড়াতেন, চাষ করতেন, সঙ্গে আবার লটারির টিকিটও বিক্রি করতেন। তাই তিনি প্রায় বছর তিরিশেক পড়াচ্ছেন, কিন্তু চাকরি আর পাকা হল না। প্রাইমারি স্কুলে তিনি অবৈতনিক ছোট মাস্টার হিসাবেই থেকে গেলেন। ছাত্রছাত্রীরা তো অত বোঝে না। তাই পড়ানোয় তিনি কোনও দিন বিন্দুমাত্র শৈথিল্য প্রদর্শন করেননি। তবে সংসার প্রতিপালন করতে গিয়ে বর্তমানে তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হয়। স্বপ্ন দেখানো দাদু করতেন লটারির টিকিট বিক্রি, আর তাঁকে করতে হয় ফুল বিক্রি। ফলে এখনও তাঁকে কষ্ট করতেই হচ্ছে। তবে এই কষ্টের চেয়েও তাঁর বেশি কষ্ট স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা মাত্র ২০। যেখানে প্রথম জীবনে বাচ্চাদের কলকাকলিতে স্কুলটা ভরে থাকত, সেখানে এখন চলছে স্কুলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। তিনি মনে মনে ভাবেন, হায় রে প্রাইমারি স্কুল, তোকেও আমারই মতো টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে! ডারউইনের অস্তিত্বের লড়াই ও প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব যে কতটা সত্য, তা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। তিনি তাঁর স্ত্রী, পুত্র ও কন্যার কাছে স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন রামকানাই। চাকরি পাকা হল পাকা হল, এ আশায় বিয়েটাও একটু বেশি বয়সেই করেছেন। ছেলেটি সবে উচ্চমাধ্যমিকের পর জয়েন্ট দিয়েছে। মেয়েটিও মাধ্যমিক দিল। এদিকে কখন যে তাঁর বয়স ষাটের ঘরে ঢুকে পড়েছে, তিনি খেয়ালই করেননি। মনে মনে আফশোস করলেন, হায়! যদি রাস্তার ধারে এই দশ কাঠা জামিটা থাকত, তাহলে তিনি এখন কোটিপতি। অবশেষে হঠাৎ ভগবান তাঁর মুখের দিকে চাইলেন। তবে একটু ভিন্ন পথে। তাঁরই এক প্রাক্তন ছাত্র নান্টু বিশ্বাস, যাকে লোক এখন ডাকে বান্টু অবিশ্বাস বলে, সে এখন ফুলে ফেঁপে ঢোল। স্থানীয় নেতার কল্যাণে সেও এক বড় নেতা। প্রোমোটারি করে বেশ কিছু টাকা করেছে। এসে বলল, স্যার, আপনার দান করা যে দশ কাঠা জায়গায় প্রাইমারি স্কুলটা রয়েছে, সে জমি এখনও আপনার নামেই। স্কুল এখনও মিউটেশন করায়নি। আপনি যে দানপত্র করছিলেন, তা এখন ইনভ্যালিড। আর মিউটেশনের জন্য কাজে লাগবে না। আপনি এখন ওই জমি আমাকে বিক্রি করে দিন, বাকিটা আমি বুঝে নেব। তবে হ্যাঁ, দামটা এখন আমি আপনাকে অর্ধেক মানে নগদ ৫০ লাখের বেশি দিতে পারব না। আর সঙ্গে একটা তিন কামরার ফ্ল্যাট আর আপনার দুই ছেলে ও মেয়েকে দু’টি দোকান ঘর। যেদিন দলিল করে দেবেন, সেদিনই আপনার বাড়িতে টাকা আমি পৌঁছে দেব।

এ কথা শুনে মধুবাবুর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের তো আনন্দ আর ধরে না। সত্যিই তাদের মধুবাবু বেঁচে থাকার ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দ্যটা তো দিতে পারেননি।

স্ত্রী বলল, দেখো, আমাদের পৈতৃক বাড়িটা একটু মেরামত না করলেই নয়। ছাদ থেকে চাঙড় খসে খসে পড়ছে।

ছেলে বলল, বাবা, আমি যদি সরকারিভাবে ডাক্তারি পড়ার চান্স না পাই, তাহলে কিন্তু বেসরকারিতেই ভর্তি হব।

মেয়ে বলল, আমায় বেশি নয়, লাখখানেক টাকা দিও। তাহলেই আমার ফ্যাশন ডিজাইনিং কোর্সটা পড়া হয়ে যাবে।

মধুবাবু দলিল রেজিস্ট্রি করার জন্য সাবরেজিস্ট্রার অফিসে গেলেন। ফিরেও এলেন। কিন্তু নান্টু বিশ্বাস আর এল না। মধুবাবুর স্ত্রী, পুত্র এবং কন্যা মনে মনে ভাবল, টাকাটা আগেভাগে নিয়ে রাখলেই ভালো হত। কী ভুলটাই না তারা করল‍! তাদের একদম উচিতই হয়নি মধুবাবুকে এভাবে একা একা ছেড়ে দেওয়া।

সন্ধ্যাবেলায় নান্টু বিশ্বাস এল। এসে বলল, এখনও আপনার মতো এত বোকা মানুষ আছে! কী দরকার ছিল নিজের টাকায় ফের ওই একই জমিকে স্কুলের নামেই দানপত্র করার?

5 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Angshu Pal
Angshu Pal
1 year ago

🙂Bantu Obiswas abar Nantu Biswas holo?

এই বিভাগে

নববর্ষ

একুশে ফেব্রুয়ারি

গদ্যের বারান্দা ৪৩-৬০

গদ্যের বারান্দা ৪২

গদ্যের বারান্দা ৪১

গদ্যের বারান্দা ৪০

প্রিন্টআউট

গদ্যের বারান্দা ৩৬-৩৮

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল শিখা দীপ মুখোপাধ্যায়

গদ্যের বারান্দা ২৬-৩৫