Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

প্রবাদপ্রতিম গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন

একদিন বড়মামুর (গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার) রামগড়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি আর তিনি মেন রাস্তার উপরে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। যত দূর মনে পড়ছে, যাচ্ছিলাম দেশপ্রিয় পার্কের কাছে, সুরকার নীতা সেনের বাড়িতে। হঠাৎ দেখি, ওপারের তিনতলার জানালা থেকে একটি বাচ্চা মেয়ে ফাঁক দিয়ে পা গলিয়ে বড়মামুকে লাথি দেখাচ্ছে। আমি বড়মামুর সঙ্গে যেখানেই গিয়েছি, শুধু সম্মান পেতেই দেখেছি। কিন্তু এ কী!

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।

Share Links:

সিদ্ধার্থ সিংহ

আমি তখন খুবই ছোট। ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। দেশ, আনন্দবাজার এবং যুগান্তর পত্রিকায় তখন সবেমাত্র কয়েকটি লেখা বেরিয়েছে। কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য সুনীলদা, মানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে দু’টি কবিতা দিয়েছিলাম। পরপর দু’টি সংখ্যায় সেই কবিতা ছাপা না হওয়ায় আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিই একটি পত্রিকা বার করার। যদিও পরবর্তীকালে সুনীলদা আমার বহু কবিতা ছেপেছেন এবং আমার আর সুনীলদার যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে বহু সংকলন। দীর্ঘদিন চাকরিও করেছি একই অফিসে। কিন্তু সে সময় আমি যে পত্রিকাটি বার করার সিদ্ধান্ত নিই, তার নাম দিয়েছিলাম ‘শিল্প ইস্তাহার’। সেই পত্রিকার বিজ্ঞাপন লিখে দেওয়ার জন্য বড়মামু (গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার)-কে বলতেই তিনি লিখে দিয়েছিলেন, ‘শিল্প ইস্তাহারে পাবেন / শিল্পলোকের খবর, / অল্প কথায় বলা হলেও / বক্তব্যে জবর।’ বড়মামু যখন যা লিখতেন, একটি ছোট্ট গান লিখলেও টেবিলের উপরে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন বাংলা ডিকশনারির যে কোনও একটি খুলে প্রত্যেকটি বানান চেক করে নিতেন। শুধু জটিল বা সন্দেহজনক বানানই নয়, খুব সাধারণ বানানও।

একদিন বড়মামুর রামগড়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি আর তিনি মেন রাস্তার উপরে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। যত দূর মনে পড়ছে, যাচ্ছিলাম দেশপ্রিয় পার্কের কাছে। সুরকার নীতা সেনের বাড়িতে। হঠাৎ দেখি, ওপারের তিনতলার জানালা থেকে একটি বাচ্চা মেয়ে ফাঁক দিয়ে পা গলিয়ে বড়মামুকে লাথি দেখাচ্ছে। আমি বড়মামুর সঙ্গে যেখানেই গিয়েছি, শুধু সম্মান পেতেই দেখেছি। কিন্তু এ কী! বড়মামুর দিকে তাকাতেই আমি অবাক। দেখলাম, লাথির প্রত্যুত্তরে তিনি মেয়েটিকে হাত নাড়ছেন। টা-টা করছেন। ছোটদের কাছ থেকেই হোক বা বড়দের, কোনও অপমানকেই তিনি গায়ে মাখতেন না।

একবার বড়মামুকে সঙ্গে নিয়ে মুম্বইয়ের একটি বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় ঢুকেছিলেন শচীন দেববর্মন। সেখানে বিখ্যাত সুরকার জয়কিষণের সঙ্গে হঠাৎ দেখা। শঙ্কর-জয়কিষণ জুটি তখন হিন্দি সিনেমার জীবন্ত কিংবদন্তি। জয়কিষণ উঠে গিয়ে শচীন দেববর্মণের সঙ্গে কথা বললেন ঠিকই, কিন্তু বড়মামুর দিকে ফিরেও তাকালেন না। সেটা আঁচ করে শচীন দেববর্মণ কিছুক্ষণ পরে বড়মামুকে দেখিয়ে জয়কিষণকে বলেছিলেন, ‘জানতা হ্যায়, ইয়ে কৌন হ্যায়? ইয়ে হ্যায় কলকাত্তা কা মজরুহ সুলতানপুরি।’ এ কথা শুনে বড়মামু নিজেও চমকে উঠেছিলেন। কারণ মজরুহ সুলতানপুরি তখন এ দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার।

রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে বড়মামু জানতে চেয়েছিলেন, এই অবিশ্বাস্য তুলনার কারণ কী? উত্তরে শচীন দেববর্মন বলেছিলেন, ‘এরা আমাকে মূল্য দেবে আর আমার সঙ্গে তুই আছিস, তোকে মূল্য দেবে না! আমার বিশ্বাস, তুইও একদিন মজরুহ সুলতানপুরির মতো হবি, হয়তো তার চেয়েও বড়।’ তিনি যে সেদিন খুব একটা ভুল বলেননি, তার প্রমাণ ইতিহাস। বড়মামুর লেখা গানের কথায় বাঙালি শ্রোতারা আজও সম্মোহিত হন। আহা! কী অসাধারণ সেসব গান! আমার ভালোলাগা তাঁর এক ডজন গানের প্রথম লাইনগুলি হল, ‘কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে’

‘আমার গানের স্বরলিপি’, ‘গানে মোর ইন্দ্রধনু’, ‘ও নদীরে, একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে’, ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়, এ কী বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু’, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে’, ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’, ‘ প্রেম একবার এসেছিল নীরবে’, ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’, ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর’ এবং ‘তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা’।

অন্য পোস্ট: জাতীয়তাবাদী বাঙালির নব উন্মেষ (পর্ব ১)

১৯২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের পাবনার গোপালনগর গ্রামে জন্মেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। ডাকনাম ছিল বাচ্চু। বাবা গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক। মা সুধা মজুমদার ছিলেন একজন স্নাতক। তাঁর ছিল কবিতা ও প্রবন্ধ লেখার প্রতি অসীম আগ্রহ। সেই সাহিত্যপ্রীতি সঞ্চারিত হয়েছিল বড়মামুর মধ্যে। বাড়িতেই ছিল প্রচুর বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষার বই। খুব অল্প বয়সেই তিনি মাত্র ১৫ দিনে ইংরেজিতে অনুবাদ করে ফেলেছিলেন কালিদাসের ‘মেঘদূতম’। পরবর্তীকালে ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন।

১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট ৬২ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যান ১০ হাজারেরও বেশি গান এবং মূলত সিনেমার জন্য লেখা ১৯টি উপন্যাসের জনক প্রবাদপ্রতিম গীতিকার আমার বড়মামু। বাংলা গানের কথাকে ১০০ বছর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রবাদপ্রতিম গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের মৃত্যুর পর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘তাঁর মতো এত বড় একজন গীতিকার বম্বের অতিসাধারণ একটি হাসপাতালে প্রায় মাটিতে শুয়েই শেষের দিনগুলি দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে কাটান। এ কথা ভাবতে পারা যায়? তাঁর তো রাজার মতো চলে যাওয়ার কথা। একজন ভিখারির মতো তাঁর মৃত্যু কেন হবে?’ প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু উত্তর পাওয়া যায়নি।

চলবে

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

নববর্ষ

একুশে ফেব্রুয়ারি

গদ্যের বারান্দা ৪৩-৬০

গদ্যের বারান্দা ৪২

গদ্যের বারান্দা ৪১

গদ্যের বারান্দা ৪০

প্রিন্টআউট

গদ্যের বারান্দা ৩৬-৩৮

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল শিখা দীপ মুখোপাধ্যায়

গদ্যের বারান্দা ২৬-৩৫