সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

পরকীয়া শব্দটির সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। ইংরেজিতে একে বলে অ্যাডাল্টারি। আর ভালো বাংলায় বলা হয় ব্যভিচার। কিন্তু পরকীয়া শব্দটির একটি আলাদা তাৎপর্য আছে, যা শেষের দুটো শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না। এর চারদিকে একরকমের রোমান্টিক রিং পরানো আছে। এটা সম্ভব হয়েছে কবি চণ্ডীদাসের সেই বিখ্যাত লাইনের কারণে— ‘পরকীয়া প্রেম নিকষিত হেম’ (খাঁটি সোনা)। পরকীয়া প্রেম সোনা এবং খাঁটি সোনা কি না, তা আমরা দেখব এই আলোচনায়। সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্রে আইন এড়িয়ে কিছু করা যায় না। তাই প্রথমে আমরা দেখব, আইন কী বলে। তারপর আলোচনা করব আইনের ঊর্ধ্বে উঠে পরকীয়া প্রেম খাঁটি সোনা কি না।
২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পরকীয়া সম্পর্ক বিষয়ে যুগান্তকারী রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট মূলত সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ২১ ধারার ওপর ভিত্তি করে। ধারা ১৪: প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিক রাষ্ট্রের চোখে সমান এবং রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিককে সমানভাবে সুরক্ষিত রাখবে। ধারা ১৫: রাষ্ট্রের কাছে ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মস্থান নির্বিশেষে প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের প্রতি সমান, অর্থাৎ কোনও নাগরিকের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না। ধারা ২১: কোনও ভারতীয় নাগরিক তাঁর জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না। আইন প্রত্যেক নাগরিকের এই দু’টি অধিকার সুনিশ্চিত করবে, অর্থাৎ প্রেম ও প্রেমের উত্তরণজনিত প্রয়োজনকে একপ্রকার মৌলিক প্রয়োজন হিসাবে মেনেছে সুপ্রিম কোর্ট। এই রায় আসলে নারী-পুরুষের যৌথ সম্পর্ককেন্দ্রিক, তা বৈবাহিক, অবৈবাহিক সহবাস বা পরকীয়া সম্পর্ক, যাই হোক। এই তিন ধরনের সম্পর্ক পরস্পর নানাভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এক ধরনের সম্পর্ক আলোচনা করলে অন্য দুটো আসবেই। এই যৌথ সম্পর্কে নানা ধরনের সাংবিধানিক অধিকার, সব নাগরিকের সমমর্যাদা, রাষ্ট্রের বহুমাত্রিক দায়িত্বের কথা উঠে আসে।
রায় খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায়, এর প্রতিটি বাক্য লিঙ্গসমতায় গুরুত্ব দিয়ে সব নাগরিকের জীবনের ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি অধিকতর যত্নশীল হয়েছে, নাগরিকের ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকাকে আধুনিক মন নিয়ে ভেবেছে। এমনকী প্রেম, যৌনতা, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সর্বোপরি বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম এবং/অথবা যৌন ‘সম্পর্ক’কে ভিন্ন সামাজিক চোখে দেখার কথা বলেছে। এর মধ্যে কোনও নীতি বা নৈতিকতার প্রশ্ন আসে না।
শুধু এই রায় নয়, পরকীয়া সম্পর্ক গোড়া থেকেই আইনের সংজ্ঞায় যৌন সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। ‘যৌন সম্পর্ক’ শব্দ দু’টি ব্যবহৃত হয়েছে পরকীয়া সম্পর্ক ‘প্রেমের সঙ্গে জড়িত’, এমনটা বোঝাতেই। আর প্রেমের স্বাভাবিক পরিণতি যৌনতা। এখানে বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতা ও তা থেকে উৎপন্ন সম্পর্ক সমাজে (আমরা ভারতীয় সমাজ নিয়েই মূলত ভাবিত) যেসব উৎপাত তৈরি করে, সে সম্পর্কে আইনি স্বচ্ছতা দিয়েছে এই রায়। অর্থাৎ আইন কোনও বাধা নয়, পরনারী বা পরপুরুষের সঙ্গে প্রেমজ সম্পর্কে, এমনকী তা যদি দেহজ সম্পর্ক অবধি গড়ায়, তাতেও কোনও আইনি বাধা নেই, এ কথাই বলেছে এই রায়।
রায়টি ‘পরকীয়া’ প্রসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যা উল্লেখ করেছে, তা হল, দাম্পত্য সম্পর্কে নারী তাঁর পুরুষসঙ্গীর ‘সম্পত্তি’ নয়। সম্পর্কে অধঃস্তন অবস্থান কোনও সঙ্গীরই নয়, উভয়ই সমান। আগের আইনে পরকীয়া প্রসঙ্গে বলা ছিল, কোনও পুরুষ যদি কোনও বিবাহিত নারীর সঙ্গে তাঁর স্বামীর সহমতি ছাড়া যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে সেই যৌন সম্পর্ক ‘অপরাধ’ হিসাবে পরিগণিত হবে। পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় পরকীয়া সম্পর্কে লিপ্ত নারীর স্বামীর অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারসাপেক্ষে পরকীয়ায় লিপ্ত পুরুষের পাঁচ বছর কারাবাস ও জরিমানাও হতে পারে। নতুন রায়ে পরকীয়া সম্পর্কে স্বামীর সহমতিদানের বা তাঁর অভিযোগের কোনও সুযোগই থাকছে না। কারণ নতুন রায় অনুযায়ী, পুরুষসঙ্গী আর নারীসঙ্গীর মালিক বা কর্তা নন। যেহেতু কেউ কারও সম্পত্তি নন, তাই পরপরুষ বা পরনারীর সঙ্গে প্রেম ও তার পরিণতিতে যৌনতা কোনও অপরাধ নয়।
অন্য পোস্ট: নেতাজি ও ডাক্তারজি: আদর্শের দুই ভিন্ন রূপ
অন্যদিকে আগের আইনানুসারে ‘পরকীয়া’ নামক ‘অপরাধ’-এ জড়িত ‘নারী’ কোনওভাবেই আইনের চোখে অপরাধী হতেন না। মনে করা হত যে, তিনি অপরাধী তো ননই, পরকীয়াঘটিত যৌনসম্পর্কের যে ‘অপরাধ’, তাতে স্বেচ্ছায় যোগদান করেও তিনি অপরাধে ‘যোগদানকারী’ বা ‘সাহায্যকারী’ বা ‘উৎসাহ প্রদানকারী’ও নন। আপাত স্বস্তিকর এই ব্যবস্থাপনা নারীকে ‘অপরাধ’-এর শাস্তির হাত থেকে রক্ষা করত বটে, তবে একইসঙ্গে অস্বীকার করত তাঁর স্বাতন্ত্র্য, সামর্থ্য, বৌদ্ধিক যোগ্যতা, আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে, এমনকী নাগরিক মর্যাদাকেও। সম্ভবত মনে করা হত, যৌনসম্পর্কে প্ররোচনা দেওয়ার মতো উচ্চবৌদ্ধিক স্তরের কাজ করতে পারেন কেবল মস্তিষ্কধারী পুরুষ। নারী সেসবের যোগ্য নন। নারী কেবল পুরুষের দ্বারা চালিত হতে পারেন। অতএব তিনি শিশুর মতোই নির্বোধ। তাঁকে শাস্তি দেওয়া চলে না।
পুরোনো আইনটি দর্শনগতভাবে সংবিধানের ধারা ১৪ ও ১৫-র বক্তব্যের বিরোধী ছিল। একই অপরাধে স্বেচ্ছায় অংশ নেওয়া নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে আইন সমান ছিল না। আইন একপ্রকার লিঙ্গবৈষম্য ঘটিয়ে একই পরিস্থিতিতে দুই নাগরিকের প্রতি ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করত। আবার পরকীয়ায় জড়িত বিবাহিত পুরুষের স্ত্রীর অভিযোগ করার বা বিচার চাওয়ার যেহেতু কোনও উপায় থাকত না, তাই তাঁর সুরক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করতে আইন ব্যর্থ হত।
সুপ্রিম কোর্টের ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরের রায় অনুযায়ী স্বামীর সহমতির কোনও প্রাসঙ্গিকতা রইল না, কারণ দাম্পত্য সম্পর্কে পুরুষ নারীর আইনসম্মত জীবনসঙ্গী হলেও দর্শনগতভাবে আর তাঁর ‘স্বামী’ (মালিক অর্থে) রইলেন না। তাহলে কি ‘স্বামী’-র সহমতি থাক বা না থাক, ‘পরকীয়া’ সততই ‘অপরাধ’ হয়ে দাঁড়াল? না, বরং উলটো। এই রায় কেবল ‘নারী’-কে ব্যক্তিগত সম্পত্তি রূপে দেখার মূলেই কুঠারাঘাত করল না, ‘পরকীয়া’-কে সার্বিকভাবেই আর ‘অপরাধ’ হিসাবে দেখতে রাজি হল না। বলা যেতে পারে, সম্পর্কের জটিল গতিকে সরল করে ‘বিবাহ’ বন্দোবস্তে পরিণতি দেওয়া গোঁজামিল আইনি ব্যবস্থা। তাই সেই গোঁজামিলে ‘পরকীয়া’কে আইনের চোখে ‘অপরাধ’ হিসাবে না দেখা আশাব্যঞ্জক ও দায়িত্বশীল এক দর্শন।
রায়ে উল্লেখ আছে, সঙ্গীর সহমতিনিরপেক্ষ হওয়া সত্ত্বেও ‘পরকীয়া’ বিবাহকেন্দ্রিক একটি বিষয়, যদিও তা দু’টি মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এই অবস্থায় আইনের এমন ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রতিবিধানের উদ্যোগ করা বা অপরাধ হিসাবে দেখে তার বিচার করা একপ্রকারে সংবিধানের ধারা ২১ বিরোধী। নতুন রায় অনুযায়ী নাগরিকের জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার (ধারা ২১) সুনিশ্চিত করতে পরকীয়া প্রসঙ্গে আইন নাগরিকের জীবনের সঙ্গে যুক্তিযুক্ত দূরত্ব বজায় রাখবে এবং বিষয়টি কেবল বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্র হিসাবে গ্রাহ্য করবে। এক্ষেত্রে ‘যুক্তিযুক্ত’ বলতে সংবিধানের ধারা ১৪, ১৫ ও ২১-কে মেনে যে দূরত্ব রাখা জরুরি, তাকে বোঝানো হয়েছে। রায়ে এমন বাক্যের ব্যবহারও রয়েছে, যেখানে পুরোনো আইনটিকে ‘সংবিধানের ধারা লঙ্ঘনকারী’ মায় ‘অসাংবিধানিক’ও বলা হয়েছে।
অন্য পোস্ট: পরিবেশ বাঁচাতে চিপকো আন্দোলন আজ খুবই প্রাসঙ্গিক
রায়ে নির্দিষ্টভাবে বলা আছে, যদি কোনও একজন সঙ্গী অন্যজনের পরকীয়া সম্পর্কের জেরে আত্মঘাতী হন, তবে ‘পরকীয়া’ সম্পর্কটিকে আইনি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। তবে সেক্ষেত্রেও যথেষ্ট প্রমাণ আইনের সামনে রাখতে হবে, যাতে আত্মঘাতীর মানসিক বা শারীরিক বিপর্যস্ত অবস্থার কারণ হিসাবে সঙ্গীর পরকীয়াকে দায়ী করা যায়, আত্মহত্যায় প্ররোচনা হিসাবে পরকীয়া সম্পর্কটি প্রতিষ্ঠিত করা যায়। কেবল এক সঙ্গীর ‘পরকীয়া’ সম্পর্কের জেরে অন্যজন আত্মঘাতী হয়েছেন, এমন সরলরেখায় বিষয়টিকে দেখা হবে না। এক্ষেত্রে ‘পরকীয়া’ নয়, পরকীয়াজনিত কোনও ‘অপরাধ’ ঘটে থাকলে, সেটি ‘অপরাধ’ হিসাবে গ্রাহ্য হচ্ছে। যেমন, গৃহহিংসা বা অন্য যে কোনও স্বীকৃত ‘অপরাধ’।
মোটের ওপর সুপ্রিম কোর্টের এই রায় আশাব্যঞ্জক। যদিও রায়টি বারকয়েক পড়লে একটি উল্লেখযোগ্য প্রশ্ন মনে আসে, সংবিধানের ধারা ২১-কে মাথায় রেখে যদি পরকীয়া সম্পর্কে রাষ্ট্রের প্রবেশ অন্যায্য হয়, অনধিকার চর্চা হয়, তবে তো তা নাগরিকের জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের কারণেই। ফলে একাধিক পরকীয়ায় রাষ্ট্রের আপত্তি থাকছে না। অথচ বেশির ভাগ ধর্মেই একাধিক বিবাহে কিন্তু রাষ্ট্রের ঘোর আপত্তি। তাহলে ‘বিবাহ’ নামক বন্দোবস্তটি কি রাষ্ট্রের বিধিরীতির চারণভূমি? বিবাহ কি তবে এতটাই সামাজিক যে, সেই চারণভূমিতে রাষ্ট্র চাইলেই যে কোনও অনুশাসনের স্তম্ভ পুঁতে দিতে পারে? স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আর কিছু বস্তুগত সুযোগ-সুবিধার লেনদেন ছাড়া বিবাহে কি ব্যক্তিগত কিছুই নেই তেমন? বিবাহ কি তবে নিখাদ আইনি ‘চুক্তি’? না, বিবাহ আইনি চুক্তি নয়। এটা সামাজিক চুক্তি, কিন্তু সামাজিক চুক্তিরও কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে, নতুবা তা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র, সব কিছুকে ধ্বংস করবে। একটি আর একটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। যেহেতু আমরা গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনযাপন করি, তাই সেই গোষ্ঠী বা সমষ্টিগত জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা আমরা এড়াতে পারি না। গোষ্ঠী নাগরিকের ব্যক্তিগত সমস্যারও দেখভাল করে। একেবারে সমষ্টির বাইরে কেউ বাঁচতে পারে না। অন্তত সংখ্যাগুরু মানুষের জন্য এ কথা প্রযোজ্য। আর তাই বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ হয়েছে বহু মনীষীর সুচিন্তিত পর্যবেক্ষণের ফলশ্রুতিতে।
