Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

পরিবেশ বাঁচাতে চিপকো আন্দোলন আজ খুবই প্রাসঙ্গিক

ইদানীং জঙ্গলের জায়গা পেশিশক্তি আর দুর্বুদ্ধির জোরে জমি মাফিয়ারা দখল করছেন। বর্তমানে যেভাবে জঙ্গল কেটে, নদীনালা বুজিয়ে নগর তৈরির নামে বহুতল নির্মাণ চলছে, তাতে গত বছর ঘটে যাওয়া তুরস্ক ও সিরিয়ার মতো বীভৎস ভূমিকম্প হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। এই মুহূর্তে চিপকোর মতো আর একটা আন্দোলনের খুব প্রয়োজন। তাই সুন্দরলাল বহুগুণার মতো একজন মানুষ চাই।

চিপকো আন্দোলনের অধিনায়ক সুন্দরলাল বহুগুণা।

Share Links:

শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

গাছ চাই। আরও গাছ। বহু গাছ। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের প্রখর দাবদাহ সে কথাই বলে গেল। বৃক্ষরোপণের অর্থ পরিবেশকে পরিশুদ্ধ করতে সাহায্য করা। পরিবেশের কাছে আশা, চাহিদা থাকবে, আর পরিবেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকব, তেমনটি চলে না। পরিবেশ আমাদের পরিবার। পরিবেশকে ভালো রাখতে হলে যা যা করা দরকার,  তা করতেই হবে।

আজ ভারত বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূমিদূষণ, জলদূষণের ঠেলায় বিপর্যস্ত। গাড়ির ধোঁয়া, কয়লার ধোঁয়া, বাজির ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, শ্মশানের ধোঁয়া, ক্লিনিক্যাল বর্জ্যের দুর্গন্ধ, বড় বড় মাইক, অ্যামপ্লিফায়ার, কারখানার মেশিনের শব্দ, গাড়ির হর্ণ, প্লাস্টিক, রাসায়নিক সার, কীট, ছত্রাক, আগাছা, ভূমিক্ষয়, বেপরোয়া ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন সমগ্র ভারতে পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছে। কৃষিজমি কমছে। গোচারণভূমি কমছে। ভারতে এখন ৬.৪ কোটি হেক্টর বনভূমি আছে, যা মোট জমির প্রায় ১৯.৫ শতাংশ। পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডিং কমিটির অন সায়েন্স, টেকনোলজি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ফরেস্ট-এর ৩০তম রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতের ৬.৪ কোটি হেক্টর বনভূমির প্রায় ৪০ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের অবনমনের শিকার হয়েছে। জনসংখ্যা বাড়ছে। পৃথিবীর বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ ভারত। ভারতে জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান। জনসংখ্যার  নিরিখে চিনকে  হারিয়ে ভারত এখন পৃথিবীর প্রথম দেশ।

আমরা সবাই যে কথাটা জানি, তা হল, পরিবেশ দূষণমুক্ত করতে পারে গাছপালা, লতাপাতা। পরিবেশকে শুদ্ধ করতে হলে গাছপালা দেদার লাগাতে হবে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, গ্রিন হাউস গ্যাসের মাত্রা বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছে। গাছপালা ও বন্যজন্তুদের আবাসস্থল পরিবর্তিত হচ্ছে। আমাদের পরিবেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করতেই হবে। ফাঁকা জায়গায় বৃক্ষরোপণ করে শূন্যতাপূরণ খুব জরুরি। প্রকৃতিতে যত বেশি সবুজায়ন হবে, যত বেশি বৃক্ষ থাকবে, মানুষ ততই নিরাপদে আয়ুষ্মান হবেন। মূল্যবান গাছ অহেতুক কেটে ফেলা উচিত নয়। জঙ্গলে চুরি ঠেকাতেই হবে।

প্রকৃতির বার্তাবাহক ঋতু আর ঋতুদের অগ্রদূত গাছ বারবার নব বরবেশে কুহেলির অস্পষ্টতা কাটিয়ে সম্ভার-ভাণ্ডার নিয়ে উপস্থাপিত হয় প্রকৃতিতে। মধুবর্ষী মধুমাস ঋতুরাজ বসন্তে পুষ্পবিভোরতা হয়ে গন্ধ-সৌন্দর্য ছড়ায়। বাসন্তিকার মল্লিকা-মাধবী, পলাশে-শিমুলে রঙিন বর্ণময়তা নিয়ে আসে দিগন্তের অঙ্গনপ্রান্তে। বাঁকের মুখে জঙ্গল প্রান্ত আকাশের দিকে প্রসারিত ডালপালায় ঋতুরানি বর্ষায় ভেজা রেশমি কাপড়ে সজ্জিত হয়ে চাঁদ তোলে। শিশিরসিক্ত নবমল্লিকার শরীরে নতুন সূর্যের আলো পরশদানে অপরূপ রূপ বিচ্ছুরিত করে ফুল ফোটায় বৃক্ষ। প্রকৃতির পরিবেশ নির্মল হয় ডালে ডালে, ফুলে ফুলে, পাতায় পাতায়, গন্ধে গন্ধে।

অন্য পোস্ট: গান্ধীজিকে ‘মহাত্মা’ বলায় রবীন্দ্রনাথের ঘোরতর আপত্তি ছিল

জঙ্গল প্রকৃত অর্থে যেন ব্রহ্ম। জঙ্গলের বৃক্ষরাজি ব্যাহৃতিরূপী আদিত্যে, বৃক্ষরাজির পুষ্পপত্র ব্যাহৃতিরূপী ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত।  তবুও আমরা সেভাবে সচেতন নই। গরম থেকে রেহাই পেতে অফিস, ঘরে এসি চালাই। ভয়ানক শীতে ঘরে গিজারের জলে স্নান করি চোখের সামনে নির্বিচারে জঙ্গল ধ্বংস হতে দেখে। দাউ দাউ করে জঙ্গল পুড়তে দেখে চোখে ঠুলি পরে থাকি।

ইদানীং জঙ্গলের জায়গা পেশিশক্তি আর দুর্বুদ্ধির জোরে জমি মাফিয়ারা দখল করছেন। বর্তমানে যেভাবে জঙ্গল কেটে, নদীনালা বুজিয়ে নগর তৈরির নামে বহুতল নির্মাণ চলছে, তাতে গত বছর ঘটে যাওয়া তুরস্ক ও সিরিয়ার মতো বীভৎস ভূমিকম্প হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। এই মুহূর্তে চিপকোর মতো আর একটা আন্দোলনের খুব প্রয়োজন। তাই সুন্দরলাল বহুগুণার মতো একজন মানুষ চাই।

চিপকো আন্দোলন সবুজ অরণ্যের জন্য সুন্দরলাল বহুগুণার এক ঐতিহাসিক কৃতিত্ব। সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও উদ্গাতা ছিলেন প্রবাদপ্রতিম পরিবেশবিদ সুন্দরলাল বহুগুণা। ১৯৭৩ সাল। ভারতে তখন ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার। উত্তরপ্রদেশের গাড়োয়াল হিমালয়ের পাদদেশে (এখন উত্তরাখণ্ড) অলকানন্দা উপত্যকায় ঘন সবুজ মূল্যবান অরণ্য ছেদন করে খেলার সরঞ্জাম তৈরির শিল্পতালুক গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্র সরকার। শুরু হয়ে যায় নির্বিচারে অরণ্য নিধনযজ্ঞ। সেই নিষ্ঠুরতা ও গাছপালার গোপন অসহায় কান্না অনুভব করেছিলেন বিশিষ্ট পরিবেশবিদ সুন্দরলাল বহুগুণা। খবর পেয়েই কেন্দ্রীয় সরকারের নিষ্ঠুর বনচ্ছেদনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলন করেছিলেন অরণ্যসংলগ্ন রেনি ও অন্যান্য গ্রামবাসী। স্থানীয় মহিলা ধূমসিং নেগি ও বাচনি দেবী অরণ্যের গাছগুলিকে বুকে চেপে ধরে অরণ্য নিধনে বাধা দিয়েছিলেন। সুন্দরলাল বহুগুণার সেই কাজে স্বামীর পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী বিমলা বহুগুণা। ‘চিপে ধরো’ থেকে আন্দোলনের নাম চিপকো।    ক্রমশ সেই আন্দোলন গোটা উত্তরপ্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। গাছের বুক চেপে আকাশ-বাতাসে স্লোগান ওঠে, ‘ক্যায়া হ্যায় জঙ্গল কি উপকার, মিষ্টি পানি আউর বায়ার, জিন্দা রাখনে কি আধার’ ।

অবশেষে ১৯৮০ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হস্তক্ষেপে হিমালয় উপত্যকায় ১৫ বছরের বেশি বয়সি গাছ কাটায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। সেই নিষেধাজ্ঞা আজও কার্যকর রয়েছে।

গান্ধীবাদী, পরিবেশবিদ, হিমালয় রক্ষক, প্রবাদপ্রতিম সুন্দরলাল বহুগুণার জন্ম ১৯২৭ সালে উত্তরপ্রদেশের (বর্তমান উত্তরাখণ্ডে) তেহরি জেলার মারোদা গ্রামে। ১৯৮০ থেকে ২০০৪ সাল অবধি সুন্দরলাল তেহরি বাঁধ নির্মাণের বিপক্ষেও প্রতিবাদ করেন। ১৯৭৪ সালে ভুল বননীতি গ্রহণের জন্য দু’সপ্তাহ অনশন করেন। দেশের অভ্যন্তরে পরিবেশ, নদী, সব ঠিকঠাক আছে কি না, তা দেখতে হাজার হাজার মাইল পথ হাঁটেন। ২০০৯ সালে পদ্মবিভূষণ ছাড়াও অন্য বহু সম্মানে তিনি ভূষিত হন। পরিবেশ রক্ষায় অসামান্য ভূমিকার জন্য দেশ তাঁকে ‘হিমালয় রক্ষক’ তকমা দেয়। ২১ মে, ২০২১ সর্বজনপ্রিয় দেশদরদি সুন্দরলাল বহুগুণা করোনা আক্রান্ত হয়ে ৯৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন। বর্তমানে পরিবেশ দূষণের মাত্রা যেভাবে বেড়ে চলেছে, যেভাবে বৃক্ষছেদন চলেছে, তাতে চিপকো আন্দোলন  আজ খুবই  প্রাসঙ্গিক।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए