প্রদীপ মারিক
কানিং বন্ধুমহলে অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে বড় মেলা বসে। মেলায় নানারকমের পসরা সাজিয়ে দোকানিরা বিক্রি করেন। বসে নাগরদোলা, সার্কাস। এর সঙ্গে চলে নানা অনুষ্ঠান। যাত্রা, তরজা গান, গাজন প্রভৃতি।
বেশ কয়েকবছর আগের কথা। অজগর পত্রিকার সম্পাদক হাননান আহসান একটি ছড়া অনুষ্ঠানের জন্য আমন্ত্রণ পেলেন বন্ধুমহল ক্লাবের কাছ থেকে। দক্ষ সঞ্চালক হিসাবে তাঁর আলাদা পরিচিত রয়েছে। আমি তখন সবে ছড়া লেখা শিখছি। আমাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বড় বড় কবি, ছড়াকার মঞ্চে বিরাজমান। তার মধ্যে আমি একেবারে নবীন। কানিংয়ের বন্ধুমহলের মঞ্চের সামনে থিক থিক করছে মানুষ। তাঁরা এসেছেন গাজন শুনতে। প্রথমে কয়েকজন কবি-ছড়াকার মঞ্চে উঠে কবিতা, ছড়া পাঠ করলেন। কিন্তু কিছুতেই দর্শকদের মন ভরছে না। একজন মহিলা তো মঞ্চের সামনে এসেই বলেই দিলেন, ‘এ কাদের এনেছিস, ছাবাল পোনরা! এদের লাবিয়ে গাজন দে। মনের মধ্যে আমার ধুকপুক করছে। জীবনে প্রথমবার গ্রামবাংলায় ছড়া পাঠ করতে এলাম, এখন কি ছড়া পাঠ করতে পারব না!’
সঞ্চালক হাননান বুঝলেন দর্শকদের আবদার। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মঞ্চে উঠে সব দর্শককে বুঝিয়ে বললেন, ‘এত বিচক্ষণ মানুষ আপনারা, আপনাদের জন্যই এখানে এসেছেন দীপ মুখোপাধ্যায়। তাঁর ছড়াগুলি শুনুন।’
পরনে লাল পাঞ্জাবি। ধবধবে ফর্সা চেহারা। পান চিবোতে চিবোতে একগাল মিষ্টি হাসি নিয়ে দীপ ধরলেন ছড়া ‘টু প্লাস খুব ভালো মেয়ে’। সব শ্রোতা হাততালি দিয়ে উঠলেন। তারপর একের পর এক ছড়া। দর্শকদের আবদার বেড়ে যায়। কিছুক্ষণ আগেও যাঁরা গাজন শুনবেন বলে ভাবছিলেন, তাঁরা দীপের ছড়া শুনতে চান।
সঞ্চালক হাননান আহসান এসে একবার মাইক্রোফোন নিয়ে বললেন, ‘খুশি হয়েছেন?’ সবাই তারস্বরে চেঁচিয়ে বললেন, ‘খুব ভালো।’ যে বয়স্ক মহিলা কিছুক্ষণ আগেও বলছিলেন, ‘এদের লাবিয়ে গাজন দে’, তিনি মঞ্চের সামনে এসে চেঁচাতে লাগলেন, ‘চালিয়ে যা, বাপ দীপ, আরও শুনব।’ এই হলেন দীপ মুখোপাধ্যায়। প্রাণবন্ত হাসির মানুষ।
বাংলার শ্রেষ্ঠ ছড়াকারদের অন্যতম দীপ মুখোপাধ্যায়ের আর একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি পেঁচা বিশেষজ্ঞ। তাঁর সংগ্রহে ছিল নানা ধরনের পেঁচার মূর্তি। সারা বিশ্বের পেঁচার সাংস্কৃতিক অবস্থান সম্পর্কে তাঁর ছিল অসীম জ্ঞান। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। তবে ছড়াতেই সিদ্ধি ছিল সর্বাধিক। চমৎকার অন্ত্যমিলের মজার পাশাপাশি নান্দনিক চিত্রকল্প তৈরিতেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ‘লোকাল ট্রেনে কিংবা বাসে/ টিকিট কাটে লোকে/ রাত কেটে যায় খিদের জ্বালায়/ ঘুম আসে না চোখে/ পকেটমারে পকেট কাটে/ নাপিত কাটে চুল/ সময়গুলো ভালোই কাটে/ যেই ছুটি ইস্কুল।’ বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর আলাদা অনুভূতি ছিল। বাংলা ভাষাকে বিশ্বের কাছে মর্যাদা এনে দিয়েছে বাংলাদেশ। সেই অনুভূতি নিয়েই তাঁর লেখা ছড়া, ‘চট্টগ্রামের কৃষ্ণপদর/ জনশ্রুতি, দারুণ কদর!/ মানুষ তিনি গুণের।/ এমন পানাসক্তি যে তার,/ নজর কাড়েন মন্ত্রী-নেতার।/ ব্যবসা করেন চুনের!’
দীপ প্রবন্ধ রচনাতেও ছিলেন সাবলীল। কবিতা হোক কিংবা ছড়া, সবকিছুই তিনি উপভোগ করতেন। সেজন্য তিনি ভালো লিখতে পারতেন। তাঁর লেখা কখনও হয়ে উঠেছে শাশ্বত প্রতিবাদের শব্দচিত্র। তিনি স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টিকুশলতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়াকে প্রাণ দিয়েছেন। কৃত্রিমতা বা চাতুরির কোনও স্থান দেননি। নতুন সহস্রাব্দে আমরা যতই এগোই না কেন, ছন্দের বন্ধনে সমষ্টিগত লোকমনের সৃষ্টি সেই ছড়া চিরনতুন এবং সর্বজনীন। দম নিতে জানে, বাঁক নিতে জানে না। আর যদি বাঁক নিতেই থাকে, তখন সেটি আর ছড়া থাকে না। অন্য রূপ ধারণ করে।
দীপ মুখোপাধ্যায়ের লেখা বইগুলির মধ্যে ‘টালিগঞ্জের নবাব’, ‘গোলকুন্ডার হীরে’, ‘জাদু ওস্তাদ’, ‘ভবিষ্যতের ভূত’, ‘কুমড়োপটাশ’, ‘বাংলাদেশনামা’, ‘মুনিয়ার নবাব’, ‘রূপকথাপুর’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠ থেকে পাঠ শেষ করে তিনি কলকাতা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। চাকরি করতেন বার্ন স্ট্যান্ডার্ড কোম্পানিতে। তাঁর প্রাণের জায়গা ছিল সাহিত্য, যেখানে তিনি সবকিছুর ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০২৩ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী পুরস্কার পান। প্রাণখোলা মিষ্টি হাসির মানুষটি বাংলা সাহিত্যে ঠোঁটকাটা ছড়া থেকে মিষ্টি খুকুর দুষ্টু পুতুলে শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সিলেবাস এবং ব্যস্ত রুটিন যে তাদের রূপকথার কল্পনাকে কতটা ক্ষতি করছে, তা তীব্র ব্যঞ্জনাত্মকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলা সাহিত্যের দীপ জ্বেলে গিয়েছেন দীপ মুখোপাধ্যায় তাঁর শাণিত লেখনীতে।
