শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

আমার মায়ের দিদির খুড়তুতো বোনের পিসির ছেলে কষ্টেসৃষ্টে মামা। কষ্টেসৃষ্টে কর। ‘কর’ পদবি। মামার আসল নাম ছিল কৃষ্ণসৃষ্টি কর। শৈশবে স্কুল এবং এখন আধার কার্ডে ‘কৃষ্ণসৃষ্টি’র মতো সুন্দর নামকে বিকৃতি করে ‘কষ্টেসৃষ্টে’ করে দিয়েছে। সেই থেকে কৃষ্ণসৃষ্টি মামার চরম দুর্ভোগ বেড়েছে। কষ্টেসৃষ্টে নামটা উচ্চারণ করা মহাশক্ত। অগত্যা আমি কষ্টমামা বলি। পরিচিতজন কষ্ট করে ‘কষ্ট’ বলেই ডাকেন। অপরিচিত লোকজন মামার নাম জিজ্ঞেস করলেই সমস্যা তৈরি হয়। ‘কষ্টেসৃষ্টে কর’ নাম বললেই ধমক খেতে হয়। ধমক দিয়ে লোকজন বলেন, ‘নাম জানতে চেয়েছি। কষ্টেসৃষ্টে কর বলবেন কেন? আমি কী কষ্টেসৃষ্টে করব?’
মামা বোঝান, ‘কষ্টেসৃষ্টে কর আমার নাম। বাবার দেওয়া নয়, স্কুলের দেওয়া নাম। নামই তো বলেছি। কষ্টেসৃষ্টে আপনাকে কিচ্ছু করতে বলিনি।’
কষ্টেসৃষ্টে মামার নিরীহ উত্তর শুনেও সন্তুষ্ট না হয়ে লোকজন কটমট করে কষ্টেসৃষ্টে মামার দিকে চেয়ে থাকেন।
মহাকেপ্পন এই কষ্টেসৃষ্ট মামাটি। তেমনই মিথ্যাবাদীও। মামিমা কষ্ট মামার মিথ্যা কথা বলা দেখে ভীষণ রেগে যান। মুখে যা আসে, তাই বলে দেন। আমাদের ঘরের খুব কাছেই কষ্ট মামা থাকেন। শহরের ভালো জায়গায় বেশ সুন্দর দোতলা ঘর বানিয়েছেন। দরজার পাশে নিজের নামে নেমপ্লেট দিয়েছেন— ‘কষ্টেসৃষ্টে কর’ । এ নিয়েও দু’দিন ছাড়া বিপত্তি তৈরি হয়। পাড়ার ছেলেদের কেউ কেউ সাদা কাগজে রং দিয়ে লিখে আটকে দিয়ে চলে যান, ‘আপনি মশাই কষ্টেসৃষ্টে করুন। উপদেশ দেবেন না। মানুষকে তুই-তোকারি বলা বন্ধ করুন। নয়তো ঘরে কাঁঠাল পড়বে।’
কষ্ট মামা একবার সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে কারা এই পোস্টারগুলি সাঁটাচ্ছে, তা দেখার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিল। খরচের ভয়ে আর পা বাড়ায়নি। এখন পোস্টার ছেঁড়া কষ্ট মামার একটা কাজ হয়েছে। একবার থানায় এ নিয়ে অভিযোগ জানাতে গিয়ে পুলিশ অফিসারের কাছে এমন ধমক খেয়েছিল যে, মামা থানার কথা আর মুখেও আনেনি। আমি সঙ্গে ছিলাম। মামা ভটভটিতে চেপে থানায় পা রাখতেই পুলিশ অফিসার বলেছিলেন, ‘বাইকটাতে অমন ভটভট শব্দ কেন? কতকাল সারাই করাননি? অমন ভটভট শব্দের ভটভটি এর পরের বার থানায় নিয়ে এলে কেস খাইয়ে দেব।’
কষ্ট মামা মাথা চুলকে ভয়ে পুলিশ অফিসারকে বলেছিলেন, ‘আর ভুল হবে না স্যার। এই ভটভটে গাড়িকে এখানে আর আনব না।’
থানার লম্বা বেঞ্চে বসিয়ে পুলিশ অফিসার শান্ত মেজাজে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলুন, কেন এসেছেন? ডায়েরি লেখাবেন? পকেটমারি হয়ে গিয়েছে? কিছু হারিয়েছে?’
অন্য পোস্ট: গোয়া: অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন
পুলিশ অফিসার প্রশ্নগুলি করে কষ্ট মামার দিকে তাকালেন। কষ্ট মামা হাত নেড়ে বললেন, ‘ওসব কিছুই হয়নি স্যার। এক বিপত্তি ঘটেছে।‘
পুলিশ অফিসার নাকে এক চিমটি নস্যি টেনে রুমালে নাক মুছে বললেন, ‘বিপত্তি হয়েছে তো, তাই বলুন। আপনাদের নিয়ে কাজ করার এই হচ্ছে কষ্ট।‘ বলেই পুলিশ অফিসার হ্যাঁ—হ্যাঁ—হ্যাঁচ্চো শব্দে মস্ত এক হাঁচি ঝেড়ে প্রশ্ন করলেন, ‘নাম বলুন?’
কষ্ট মামা নিজের নাম বললেন, ‘কষ্টেসৃষ্টে কর।‘
নাম শুনেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন পুলিশ অফিসার। সোজা উঠে দাঁড়িয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে থানা গোল করে চিল্লাতে চিল্লাতে বললেন, ‘কষ্টেসৃষ্টে করব? জ্ঞান দিতে এসেছেন? তুই-তোকারি? মেরে হামাগুড়ি দেওয়াব। লকাপে ভরে দেব। গেট আউট?’
কষ্ট মামা তাকিয়ে দেখলেন চোখে আগুন বৃষ্টি করতে করতে পুলিশ অফিসার তাঁর দিকে তাকিয়ে থরথর করে কাঁপছেন। কষ্ট মামা বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ‘আমি তুই-তোকারি করিনি স্যার। আমি আমার নাম বলেছি। বাবার দেওয়া নাম নয়, স্কুলের দেওয়া নাম। আমি জ্ঞান দিইনি স্যার।‘
পুলিশ অফিসার কোনও কথা শুনলেন না। কষ্ট মামা সমেত আমাকে থানা থেকে বের করে দিলেন।
অন্য পোস্ট: দ্রুত স্বমহিমায় ফিরুক রাইটার্স বিল্ডিং
ভীষণ মিথ্যুক ও কৃপণ আমার এই কষ্ট মামাটি। সে কারণে আমাদের কষ্টের অন্ত নেই। একবার কষ্ট মামা দু’খানা বড় মোবাইল ফোন সেট কিনে এনে আমাকে বলল,
‘কেল্টু, দুটো ফোন কিনে নিলাম। বড্ড দরকার হচ্ছিল। বহু দেশে ফোন করতে হয়। সবাই উপদেশ চায়। একটি ফোনে আর চলছিল না।‘
আমি তো দেখে ও শুনে হাঁ হয়ে গেলাম। যে কেপ্পন মামার পকেট থেকে দশটা পয়সা খসে না, যে মামার কথা শুনে গাধাও হাসে, সেই মামা কিনবে একজোড়া মোবাইল ফোন সেট! তাঁর পরামর্শ নেবেন বিদেশিরা!’
আমি কষ্ট মামাকে বললাম, বাঃ-বাঃ! কী ভালো কাজ করেছ কষ্ট মামা! একেবারে দু’-দুটো মোবাইল ফোন কিনেছ! তা, কত দাম পড়ল কষ্ট মামা?’
কষ্ট মামা উত্তর দিল, ‘দাম বলেছিল ৫০ হাজার টাকা প্রতিটি। দুটোতে এক লক্ষ টাকা। আমি রাশিয়ায় ফোন করলাম। ওখানকার এক রাশভারী সার্জেনকে ফোন করতেই দুটো ফোনের দাম কমে দাঁড়াল ৫০ হাজার। আমি আবার ফোন করলাম জার্মানির এক বিখ্যাত জার ও মানি কারখানার মালিককে। দুটো ফোনের দাম কমে দাঁড়াল ২০ হাজার টাকা। ফের আমি ফোন করলাম চিনের প্রাচীর মন্ত্রীকে। দুটো ফোনের দাম কমে দাঁড়াল দশ হাজার টাকা। দেখলাম, বিদেশে ফোন করলেই তো হু-হু করে মোবাইল ফোনের দাম কমছে। আবার ফোন করলাম ইটালির ইটভাটার মালিক আলিখুড়োকে। দুটো ফোনের দাম কমে দাঁড়াল ২ হাজার টাকা। এবার ফোন করলাম আমাদের পাশের দেশ শ্রীলঙ্কার লঙ্কাগুঁড়ো কলের মালিককে। মহিলা কণ্ঠ ভেসে এল, চোখে লঙ্কাগুঁড়ো ঘষে দেব। মোবাইল কিনতে পয়সা? ও তো পকেটমার! কার পকেট মেরেছে, কে জানে! আবার দরদাম? ফোন বিক্রেতা তা শুনে মোবাইল দুটো ফেলে দিয়ে দৌড়। আমি কুড়িয়ে পকেটে ভরে নিলাম। কোনও টাকা লাগল না।’ বলেই ভকভক করে হাসতে লাগল কষ্ট মামা।

একদিন কষ্টেসৃষ্টে মামার ঘরে গিয়েছি। মামিমা ঠাকুরের বাসনপত্র ধুতে কলতলায় ব্যস্ত ছিল। ‘মামা কোথায়?’ জিজ্ঞেস করতেই মামিমা রাগে গজগজ করতে করতে বলল, ‘দ্যাখো গে, উপরের ঘরে বসে দেশ উদ্ধার করছে।’
আমি ঘরে ঢুকে কষ্ট মামাকে ফোন করলাম, ‘মামা, তুমি ঘরে আছ?’
কষ্ট মামার উত্তর, ‘কে, কেল্টু? না বাবা, আমি ঘরে নেই।‘
—‘তাহলে তুমি কোথায়?’
—‘বাজারে এসেছি। ডাক্তার দেখাতে।’
মামার ডাঁহা মিথ্যা কথা। আমি মনে মনে বেশ হাসলাম। মামাকে জব্দ করতে হবে।
অন্য পোস্ট: ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতিতে বাঙালির কাছেই ব্রাত্য বাংলা আজ আভিজাত্যে প্রকাশমুখর
মিথ্যাবাদী কষ্টেসৃষ্টে মামাকে জব্দ করতে আমি ফোনে বললাম, কিন্তু আমি তো তোমার ঘরে ফেলো কড়ি দানাকে নিয়ে এসেছি। দানাবাবু কড়ি ফেলতে এসেছেন। পাঁচ হাজার টাকা এনেছেন তোমাকে দেবেন বলে। তাহলে ফিরে যেতে বলছি?‘
শুনেই কষ্টমামা প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল, ‘এই, ফিরে যেতে দিস না কেল্টু। আম আধঘণ্টার মধ্যে ঘরে ফিরছি।‘
আমি বললাম, কিন্তু দানাবাবু বলছেন, অতক্ষণ তাঁর দ্বারা অপেক্ষা করা সম্ভব হবে না।‘
ফোনে কষ্ট মামার আকুতি, ‘দশ মিনিট থাকতে বল। আমি ফিরছি।‘
আমি জানালাম, ‘মামা, উনি রাজি হচ্ছেন না। আমি টাকাটা নিয়ে নিজের কাছে রেখে দেব?’ মামার জবাব এল, ‘এক মিনিট বসতে বল। আমি এসে যাচ্ছি।‘
মামা সত্যিই এসে গেলেন। আমি কষ্টেসৃষ্টে মামাকে বললাম, ‘ঘরে থেকে বাজারে আছ, এমন মিথ্যা কথা কেন বলো? মোবাইল হাতের মুঠোয় আসায় মিথ্যা কথা বলতে বেশ সুবিধা হয়েছে বলো? শোনো মামা, ফেলো কড়ি, গোটাও কড়ি, কেউ আসেননি। আমি কেল্টু, তোমার বজ্জাতি আর মিথ্যা কথা ধরতে মিথ্যা করে ফোন করেছিলাম। কখনও মিথ্যা কথা বলো না মামা। বুঝলে তো?’
