অধ্যাপক জয়ন্তকুমার দেবনাথ

কলকাতার সদা কর্মব্যস্ত রাইটার্স বিল্ডিং অনাদরে পড়ে আছে। বিল্ডিংয়ের চারপাশ গাছের পাতা, লতায় অপরিচ্ছন্ন হয়ে আছে। কয়েকজন পুলিশকর্মী মোবাইল ফোনে সময় কাটাচ্ছেন। একসময়ের সদাব্যস্ত মহাকরণ যেন ক্লান্ত!
রাইটার্স বিল্ডিং সংস্কারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মন্ত্রিসভার বিভিন্ন দফতর নবান্নে স্থানান্তরিত করেছিলেন। আশা করা গিয়েছিল, ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিংয়ের দ্রুত সংস্কার করে মুখ্যমন্ত্রী মন্ত্রিসভার সব দফতরকে এখানে ফিরিয়ে আনবেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের উজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী যে রাইটার্স বিল্ডিং, যেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের রূপকার ডা. বিধানচন্দ্র রায় সরকার পরিচালনা করেছেন, রাজ্য শাসন করেছেন আর এক প্রবাদপ্রতিম মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, সেই রাইটার্স বিল্ডিং আজ অবহেলায় পড়ে আছে!
১৭৮৯ সালে রাইটার্স বিল্ডিং গড়েছিলেন পরাধীন ভারতের শাসক ব্রিটিশরা। এখান থেকেই ব্রিটিশরা ভারত শাসন করতেন। তখন কলকাতা ছিল ভারতের রাজধানী। আর এখানেই ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আঁতুড়ঘর। আর রাইটার্স বিল্ডিং বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে বিনয়, বাদল, দীনেশের অসাধারণ সংগ্রামের জন্য।
ব্রিটিশ আমলে কারা বিভাগের অধিকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এন এস সিম্পসন জেলের মধ্যে স্বদেশি আন্দোলনে ধৃত বিপ্লবীদের ওপর যথেচ্ছ অত্যাচার করতেন। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সদস্য বিনয়,বাদল এবং দীনেশ সিম্পসনকে হত্যা করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ডালহৌসিতে অবস্থিত তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং (রাইটার্স বিল্ডিং)-এ। কিন্তু রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ছিল কড়া নিরাপত্তা। ইউরোপীয় পোশাকে সজ্জিত বিনয়কৃষ্ণ বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত সিম্পসনের ঘরে ঢুকে পরপর গুলি করে হত্যা করেন সিম্পসনকে। গুলির শব্দ শুনে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের প্রহরারত পুলিশ তাঁদের উদ্দেশ্য করে গুলি চালাতে থাকে। অল্প সময় উভয়ের মধ্যে গুলির লড়াই চলে। তিনজন ইংরেজ অফিসার গুলির আঘাতে গুরুতর আহত হন। কিন্তু বিনয়, বাদল ও দীনেশ বুঝে যান, তাঁরা অত সংখ্যক পুলিশের সঙ্গে লড়তে পারবেন না। আবার ধরাও দেবেন না। বাদল পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। বিনয় এবং দীনেশ নিজেদের পিস্তল দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। বাদল সঙ্গে সঙ্গেই মারা যান। কিন্তু দীনেশকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি সুস্থ হলে তাঁর ফাঁসি দেয় ব্রিটিশ সরকার।
তাই ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এই বিল্ডিংয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। স্বাধীনতার পর বিনয়, বাদল, দীনেশকে স্মরণ করে এই স্থানের নামকরণ করা হয় বিবাদী বাগ। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের জন্য পুরো বিবাদী বাগ ছিল জমজমাট। বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল এই বিল্ডিংকে কেন্দ্র করে। এই বিল্ডিংয়ের দু’পাশে ছিল খাবারের বহু দোকান। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ কাজের তাগিদে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে আসতেন। মন্ত্রিসভার বিভিন্ন দফতর নবান্নে সরিয়ে নেওয়ার পর অনেকের রোজগারেও টান পড়েছে। আমরা আশা করব, স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী রাইটার্স বিল্ডিয়ে আবার সব দফতর ফিরে আসবে এই বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়েছিল তৎকালীন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনিক কাজের জন্য। ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির করণিক এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের জন্য। যাঁরা এই ভবনে কাজ করতেন, তাঁদের বলা হত Writer। তা থেকেই বিল্ডিংটির নামকরণ হয় রাইটার্স বিল্ডিং।
অন্য পোস্ট: যাত্রাপালায় বাড়ছে আস্থা ও ভরসা (শেষ পর্ব)
২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসে। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শপথগ্রহণ করে রাজভবন থেকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে তাঁর দফতরে হেঁটে এসেছিলেন। তারপর ২০১৩ সালের ৪ অক্টোবরের পর মুখ্যমন্ত্রী রাইটার্স বিল্ডিং থেকে তাঁর মন্ত্রিসভার বিভিন্ন দফতর হাওড়ার নবান্নে স্থানান্তরিত করেন। কারণ ১৭৮৯ সালে সম্পন্ন হওয়া এই ঐতিহ্যবাহী বিল্ডিংয়ের সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ১২ বছর অতিক্রান্ত। এখনও কেন সংস্কার শেষ করা যায়নি, সেটা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে মানুষের কাছে। সাধারণ মানুষের মনে আরও প্রশ্ন, মুখ্যমন্ত্রী কি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে আর তাঁর মন্ত্রিসভা নিয়ে ফিরে আসবেন না? তিনি কি নবান্ন থেকেই সরকার পরিচালনা করবেন? কিছুদিন আগের খবর অনুযায়ী, রাইটার্স বিল্ডিংয়ের প্রধান ব্লক এবং ব্লক II ও ব্লক III-র সংস্কারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু ভিতরে ঢুকে দেখা গেল, এখনও অনেক কাজ বাকি এবং কাজের গতি আছে বলে মনে হয় না।

স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্য প্রশাসন রাইটার্স বিল্ডিং থেকেই পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার ২০১৩ সাল থেকে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর দফতর-সহ সব প্রধান দফতর স্থানান্তরিত করেছে। শুধু কয়েকটি দফতর রাইটার্স বিল্ডিংয়ে এখনও রয়েছে। আমরা আশা করব, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রাইটার্স বিল্ডিং দ্রুত স্বমহিমায় ফিরে আসুক।

সুন্দর তথ্যসমৃদ্ধ লেখা