ড. রাজকুমার মোদক

৭৫ বছরের বৃদ্ধ ভুবনমোহন রায় আজও তাঁদের পারিবারিক দুর্গাদালানে রাখা ঘটটিতে প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যাপ্রদীপ দেখালেন। তারপর লালমাটির রাস্তায় উঠে পড়ন্ত বিকেলের রোদে সবুজ মাঠের দিকে তাকিয়ে ধানগাছগুলির খিলখিলিয়ে হাসির আওয়াজ পেয়ে একটু চমকে উঠলেন। এ আওয়াজ তাঁর বড়ই চেনা। ফি-বছরই ধানগাছগুলি গর্ভবতী হলেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠে তাঁকে জানান দেয়। তিনি অবশ্য কাউকে এ সকল কথা বলেন না। তবে তাঁরা যে রামমোহন রায়ের বংশধর ছিলেন, তা খানাকুলের রাধানগর গ্রামের সকলেই জানে। তারা তাঁকে মানে, সম্মান ও শ্রদ্ধাও করে। তিনি আর একটু খেয়াল করে দেখলেন, ধানগাছগুলি শরতের হাওয়ায় হেলেদুলে শিশির আগায় নিয়ে তাঁকে আগমনীর বার্তা দিচ্ছে। পোটো দালানে ঠাকুরের কাঠামো প্রস্তুত করে বারদুই মাটির প্রলেপ দিয়েছে। আগমনীর বার্তায় মনটা তাঁর আনন্দে ভরে যায়।
আজ প্রায় দশদিন পর একটি ডিঙিতে চড়ে সেদিনের দেখে যাওয়া সদ্য গর্ভবতী ধান গাছগুলির সলিলসমাধির উপর দিয়ে এসে এই দালানে উঠে ভুবনবাবু যেদিকে তাকান জল, জল আর জল। ঠাকুরের কাঠামোয় উইপোকা। শৈশবকাল থেকেই তিনি দেখছেন তাঁদের এই জায়গাগুলি বন্যাপ্রবণ। দামোদর এখানে কানা। তাকে হাত ধরে না চালনা করলে ঠোক্কর খায়। আর ডিভিসি জল ছাড়লে তো কোনও কথাই নেই। কান পেতে শুনলেন ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নেওয়া কলেজের দোতলার ঘরগুলি থেকে ভেসে আসা মানুষের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর। আর নাকে এসে লাগল ত্রাণ শিবিরের খিচুড়ির গন্ধ। মুঠফোনটিতে টুং করে একটি মেসেজ ঢোকার আওয়াজে তাঁর ভাবনার তাল কেটে গেল। মেসেজ বক্স খুলে দেখলেন, আরামবাগের এসডিও দুর্গাপুজোর অনুদান ১ লক্ষ টাকার চেক নিতে কালকেই ডেকেছেন।
শেখ তাজউদ্দিন আহমেদ খাঁ এই মহকুমায় এসডিও হিসাবে জয়েন করেছেন মাসতিনেক হল। তিনি এই কয়েকদিন একটু চাপেই আছেন। গত সেপ্টেম্বর মাসে ঘটে যাওয়া ঘটনার নানা ঘাত-প্রতিঘাত, তার ওপর বন্যা, আর গোদের ওপর বিষফোঁড়া এখনও তাঁর হাতে বেশ কতকগুলি পুজো কমিটির চেক রয়ে গিয়েছে। অষ্টমীর দিন হয়ে গেল। এখনও পর্যন্ত ওই পাঁচটি পুজো কমিটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতেই পারেননি। তিনিও নবাব আলিবর্দি খাঁর বংশধর। মেজাজ তাঁর ভীষণ কড়া। চেহারাটাও দাপুটে। টাকমাথা, চাপ দাড়ি। পুরো যেন বাহুবলীর কাটাপ্পা। চারপাশের লোক তাই-ই বলে। তিনি নিজেও যথেষ্ট এনজয়ই করেন। রাজকাজে তাঁর কোনও ফাঁকি নেই। একজন সিভিক পুলিশ খবর দিলেন, রাধানগরের রায় বাড়িতে এবার কোনও দুর্গাপুজোই হচ্ছে না। ১ লাখ টাকার পুরোটাই নাকি ভুবন পুরোহিত মেরে দিয়েছেন।
কথাটা শুনে তাজউদ্দিন খেপে উঠলেন। এখন তো জল নেমে গিয়েছে। প্রায় সব জায়গাতেই পুজো হচ্ছে। রাগ সম্বরণ করে তাঁর মাথাটা তিনি কাটাপ্পার মতো না খাটিয়ে বাহুবলীর মতো খাটালেন। সঙ্গে দু’জন সাব-ইন্সপেক্টর ও চারজন সিভিক নিলেন। আর নিলেন সাতটি ধুতি, সাতটি গেঞ্জি, সাতটি গামছা, একটি বড় ঢাক, দু’টি ঢোল আর চারটি কুড়কুড়ে বাজনা। বানালেন একটি কুড়কুড়ে বাজনার দল। জিপে করে ডিভিসুরের রাস্তা দিয়ে ঘুরে ঘুরে এসে কলেজের সামনে জিপটাকে দাঁড় করালেন।
অন্য পোস্ট: পরিবেশ বাঁচাতে চিপকো আন্দোলন আজ খুবই প্রাসঙ্গিক
সকলে সাজপোশাক এমনভাবে বদলে নিলেন, যেন শেওড়াফুলির কালীবাড়ি থেকে আগত পেশাদার কুড়কুড়ে বাজনার দল। তিনি নিলেন ঢাক, আর দুই সাব-ইন্সপেক্টর নিলেন ঢোল। বাকি চারজন সিভিক নিলেন চারটি কুড়কুড়ে। তাঁরা ওই মোরাম রাস্তার উপর দিয়ে বাজাতে বাজাতে আমবাগানটির পাশ দিয়ে দুর্গাদালানে এসে ঢাক বাজানো থামিয়ে দালানে উঁকি দিয়ে দেখলেন, অসমাপ্ত কাঠামোর সামনে ঘট বসিয়ে ভুবনমোহন রায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাশভারী গলায় মন্ত্র আওড়াচ্ছেন, ‘দেহি সৌভাগ্যম আরোগ্যম দেহি মে পরমং সুখমরূপম দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেবি দ্বিষো জহি।। সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে শরণ্যে ত্রয়মবকে গৌরী নারায়নী নমোহস্তু তে।। সৃষ্টি-স্থিতি বিনাশানং সর্বভূতে সনাতনী গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণী নমোহস্তু তে।’ তিনি বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, প্রাঙ্গণ পূর্ণ হয়ে রয়েছে সদ্য বন্যায় ঘর হারানো শরণার্থীতে। সকলে খিচুড়ি খাওয়ার আনন্দে মাতোয়ারা। তিনি এও দেখলেন, চারদিক আলো করে ওই দালান থেকেই নানা অলংকারে সুসজ্জিত এক দশভুজা নারী বার হয়ে মুখে ভুবনমনোহর হাসি নিয়ে পরিবেশনে রত। তিনি ভাবলেন, মনের ভুল। চোখ কচলে নিয়ে ফের দেখলেন। তাতেও বিশ্বাস হচ্ছে না দেখে কোমর থেকে পিস্তলটি বার করে তাঁর নিজের টাক মাথায় বাঁটের বাড়ি দিয়ে মারলেন এক গুঁতো। মাথাটা ঝনঝন করে ওঠার পরেও ওই একই দৃশ্য দেখে তাঁর মনে আর কোনও সংশয় থাকল না।
দ্রুতগতিতে সকলকে নিয়ে জিপে ফিরে এলেন। জিপ থেকে চেক বিলির ফাইলটি থেকে বেঁচে যাওয়া পাঁচটি চেক নিজের হাতে ভুবনমোহন রায়ের নামে করে ফাইলটি ক্লোজ করলেন। আর শুনতে পেলেন দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা বিকেলের নমাজের সুর, আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ…
