Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

আজকের দিনে ভগবান ও ধর্মের কী প্রয়োজন

ভারত ধর্মের যে ধারণা দিয়েছে, তা সমগ্র পৃথিবীর সমস্যা সমাধান করে। আমার মত গ্রহণ না করলে তুমি বধযোগ্য, এই বোধ নয়, যেটা না থাকলে আমি নেই, সেটাই আমার ধর্ম। ধর্ম কারও মত নয়। ধর্ম অভ্যাস করার বিষয়। যে গুণ না থাকলে মানুষের মনুষত্ব থাকে না, সেটা অভ্যাস করাই ধর্ম।

Share Links:

ভাস্কর সেনগুপ্ত

পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে গিয়েছে মুষ্টিফোনের দৌলতে। যে কোনও মুহূর্তে যে কোনও প্রান্তের সংবাদ এখন হস্তামলকবৎ। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে একদিনের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায়। যে কোনও জিনিস নেট দুনিয়ার আশীর্বাদে ঘরে বসেই পাওয়া যায়। ভ্রমণ পিপাসুরা ভূমণ্ডল পরিত্যাগ করে মহাকাশে পাড়ি দিযেছেন। এই অবস্থায় ধর্ম, ভগবান এসবের প্রয়োজন অবলুপ্ত। সকল রহস্যের অবগুণ্ঠন উন্মোচিত। নেই প্রয়োজন ব্যোম-বরুণ-বহ্নির আরাধনা। নেই  ঈশ্বর-ভীতির অবকাশ। ধর্ম ধরিত্রী ধস্ত। আধুনিক দুনিয়ার গান এই ছন্দে গাঁথা।

এক প্রফেসর ছাত্রদের বললেন, ‘তোমাদের ভগবত অনুসন্ধান অব্যাহত আছে তো?’ 
ছাত্ররা অট্টহাস্য করলেন। বললেন, ‘স্যার আপনি প্রাগৈতিহাসিক যুগে বিচরণ করছেন। না আছে ভগবানের অস্তিত্ব, না প্রয়োজন তার মান্যতার।’
প্রফেসর বললেন, ‘কিন্ত তোমরা যে সকলেই ভগবত অনুসন্ধানে রত।
—‘কী করে হয়, স্যার?’
—‘আমি প্রমাণ করে দিচ্ছি। তোমাদের মধ্যে যারা বিজ্ঞানের ছাত্র, তারা কি বলতে পারো, কী তোমাদের উদ্দেশ্য?’
—‘স্যার, সত্যকে আবিষ্কার করা।’
—‘ঠিক আছে। যারা আর্টসের ছাত্র, তারা বলো, তোমরা কী করতে চাও?
—‘স্যার, সুন্দর জিনিস।’
—‘এবার বলো যারা সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র, তোমরা কী চাও?’
—‘স্যার, সমাজের কল্যাণ।’ 
—‘তাহলে বোঝা গেল, তোমরা সত্য, কল্যাণ ও সুন্দরকে চাও। এটাই  তো আমাদের ভগবান। সত্যম, শিবম, সুন্দরম্। তোমরা সকলেই ভগবানকে চাও। কিন্ত জানো না।’

মনু সংহিতায় ধর্মের লক্ষণ বলা আছে। ধৃতি, ক্ষমা, যম, অস্তেয়, শৌচম, ইন্দ্রীয় নিগ্রহ, ধী, বিদ্যা প্রভৃতি। ধৃতি অর্থাৎ ধৈর্য যার নেই, তাকে খিটখিটে বলি। যার ক্ষমা গুণ নেই, তাকে নৃশংস বলি। যার যম অর্থাৎ অন্তর শুদ্ধ নয়, তাকে বলি নোংরা মনের মানুষ। যে অস্তেয় অর্থাৎ অচৌরয় নয়, তাকে চোর বলি। যার  শৌচম নেই, তাকে নোংরা বলি। যার ইন্দ্রীয় নিগ্রহ নেই, তাকে লম্পট বলি। যার ধী নেই, তাকে বলি মাথা মোটা। যার বিদ্যা নেই, তাকে বলি গাধা। ধর্মের লক্ষণগুলি যার নেই, তাকে আমরা কখনওই গ্রহণ করি না।

এরপরও কি বলবেন, আমরা ধর্ম মানি না? প্রকৃতপক্ষে ধর্মই জগৎকে ধারণ করে আছে, আমরা  জানি না, কিন্ত মানি।

অন্য পোস্ট: নেতাজি ও ডাক্তারজি: আদর্শের দুই ভিন্ন রূপ

সদা সত্য কথা বলবে, এই শিক্ষা ধর্ম দেয়। কোনও বিজ্ঞানের গ্রন্থে এই কথা পাওয়া যাবে না। পরের দ্রব্য না বলে নিলে চুরি করা হয়। চুরি করা অন্যায়। এই শিক্ষা ধর্মগ্রন্থ দেয়। গুরুজনকে সম্মান করবে। ধর্ম ছাড়া এই শিক্ষা আর কে দেয়? নারী মাতৃসম। তাকে রক্ষা করা অবশ্যকর্তব্য। এটাই ধর্মের শিক্ষা। মানুষকে ভালোবাসাই ঈশ্বরকে ভালোবাসা। এটা ধর্মের শিক্ষা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, জাতি, সমাজ, দেশ, বিশ্বকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় ধর্ম। যত ধর্মকে নস্যাৎ করেছে বিশ্ব, তত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।

পৃথিবীতে ১৯৫টি দেশ আছে। তার মধ্যে বহু দেশ এই মুহূর্তে যুদ্ধরত। মানুষের প্রগতি, বিজ্ঞানের জয়যাত্রা, জল, স্থল, অন্তরীক্ষ ও মহাকাশের দখলদারির সকল শক্তির এই ধস্তাধস্তিতে পরিসমাপ্তি। শিল্প, কলা, কাব্য, জ্ঞান, সবই কি মূল্যহীন? বিশ্ব আজ দিগভ্রান্ত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, ভিক্ষুক।

মানুষের অন্ন, আভরণ, আবাস অনুসন্ধানের জন্য বহু মহাপুরুষের আবির্ভাব হয়েছে এই পৃথিবীতে। বহু ism-এর আবির্ভাব ও তিরোভাব দেখেছে এই পৃথিবী। মানুষ কি যথার্থ সুখ-শান্তির সন্ধান পেয়েছে?

পৃথিবী দেখেছে বহু সভ্যতার উত্থান, বিকাশ ও পতন। মিশরীয় সভ্যতা, সুমেরীয় সভ্যতা, ব্যাবিলনীয় সভ্যতা, অ্যাসিরিয় সভ্যতা, চৈনিক সভ্যতা, হিব্রু সভ্যতা, গ্রিক সভ্যতা, রোমান সভ্যতা, মায়া সভ্যতা, ইনকা সভ্যতা ইত্যাদি ছিল। আধুনিককালেও দেখা গিয়েছে Green revolution, Industrial revolution, Scientific growth, খ্রিস্টান ধর্মের প্রসার, ইসলাম ধর্মের প্রসার। পৃথিবী নীরব দর্শক মানুষের হাস্যকর ব্যর্থ চিৎকার, চেঁচামেচি, লাফালাফিতে। পৃথিবী নীরব সাক্ষী ছিল, যখন স্বমত প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত ধর্মের নামে পৃথিবী রুধির রঞ্জিত হল। পৃথিবী নীরব সাক্ষী ছিল, যখন সত্য সন্ধানের প্রয়োজনে পৃথিবী ফুঁড়ে, পর্বত ভেঙে, নদীর স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ করে, ব্যোম মার্গ কলুষিত করে বিজ্ঞান দানবের দামামা কর্ণ বধির করেছে। পৃথিবী নীরব সাক্ষী ছিল, যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়। পৃথিবী নীরব সাক্ষী ছিল, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্যাস্ত হত না। পৃথিবী নীরব সাক্ষী ছিল, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়। পৃথিবী নীরব সাক্ষী ছিল, যখন শুধু আবিষ্কারের আনন্দে দু’টি শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকিকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলা হয়। পৃথিবী নীরব সাক্ষী ছিল, যখন মানুষ চন্দ্রবক্ষে আস্ফালন করেছিল।

সবই শূন্যে পর্যবসিত। আতঙ্কবাদীদের আগ্রাসনে পৃথিবী আতঙ্কিত। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনেক দেশ আতঙ্কবাদী আবাদ করছে। পৃথিবী দ্বিধাবিভক্ত। চাই কান্ডারি। চাই আশ্রয়। চাই মার্গ। চাই সঠিক নীতি।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সুনক, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বাইডেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন, পৃথিবীর প্রায় সকল রাষ্ট্রপ্রধান বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন সময় ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। তাঁরা জানেন, ভারতের গর্ভে সেই সম্পদ আছে, যা পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে, পৃথিবীকে মার্গ প্রদর্শন করতে পারে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আজকের পৃথিবীর সমস্যার সমাধান আছে ভারতে।

ভারতের সনাতন ধর্ম কিন্তু একইভাবে বিদ্যমান। আজ থেকে ২৫ লক্ষ বছর পূর্বে রামচন্দ্র যে মন্ত্র পাঠ করে সীতা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন, আজও আমরা সেই এক মন্ত্র পাঠ করে বিয়ে করি। আজ থেকে প্রায় ২০০০  বছর পূর্বে শঙ্করাচার্য যে গায়েত্রী মন্ত্র পাঠ করে সন্ধ্যাবন্দনা করেছিলেন, আজও আমরা সেই একই মন্ত্র পাঠ করে সন্ধ্যাবন্দনা করি। আজ থেকে ৫০০ বছর পূর্বে চৈতন্যদেব যেভাবে সূর্যবন্দনা করেছেন, আজও সেভাবেই চলছে।

ভারতই উদাত্ত কণ্ঠে বিঘোষিত করেছে, বসুধৈব কুটুম্বকম। বিশ্ব আমার কুটুম্ব অর্থাৎ  অতিথি। ভারতীয় ধর্মগ্রন্থের সার গীতা জানিয়েছে, যে যথা মাং প্রপদন্তে ত্বাং স্তথৈবভজাম্যহম।  যে আমাকে যেমনভাবে ডাকবে, আমি তার কাছে তেমনভাবে যাব। অর্থাৎ পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের মানুষই হোক, আমি তার সঙ্গে আছি।

ভারত ধর্মের যে ধারণা দিয়েছে, তা সমগ্র পৃথিবীর সমস্যা সমাধান করে। আমার মত গ্রহণ না করলে তুমি বধযোগ্য, এই বোধ নয়, যেটা না থাকলে আমি নেই, সেটাই আমার ধর্ম। ধর্ম কারও মত নয়। ধর্ম অভ্যাস করার বিষয়। যে গুণ না থাকলে মানুষের মনুষত্ব থাকে না, সেটা অভ্যাস করাই ধর্ম।

ধৃতিঃ ক্ষমা দমো স্তেয়ং  শৌচামিন্দ্রিয় নিগ্রহঃ।
ধী বিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম্।। অর্থাৎ ধৈর্য, দয়া, আত্মনিগ্রহ, চুরি না করা, পরিষ্কার থাকা, লোভ ত্যাগ, বুদ্ধি, জ্ঞান, সত্য, রাগ না করা।

আবার অন্যত্র আছে, যতঃ অভ্যুদয় নিঃশ্রেয়সিদ্ধিঃ সোধর্ম। অর্থাৎ যার দ্বারা সমগ্র জগতের কল্যাণ ও মুক্তি, তাই ধর্ম। এখানে কোনও দেশ, কাল, পাত্র, জাতি, কিছু বলা নেই। আবার বলা আছে, ধারণাৎ ধর্ম, অর্থাৎ যে ধারণ করে থাকে। পতন প্রতিবন্ধক।

অন্য পোস্ট: রোবট: কল্পবিজ্ঞান ও বাস্তব

মহাভারতের কর্ণ অধ্যায়ে আছে, যা সমাজকে, জাতিকে ধারণ করে, সেটাই ধর্ম।

অহিংসা-সত্যমস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়সংযমঃ।
এতো সমাসিকং ধর্মং চাতুর্বণর্হব্রবীৎ মনুঃ।।

যেরূপ ব্যবহারে তার নিজের যেরূপ সুখ-দুঃখ হয়, এটুকু বুঝে অপরের সঙ্গে ব্যবহার করবে। এটাই অহিংসা। নিজ অধিকার সীমা জেনে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করা। এটাই অস্তেয়।

সৎ কথা, সৎ আলোচনা অন্তর শৌচ আর পরিষ্কার থাকা বাইরের শৌচ। সংযম অর্থাৎ পঞ্চেন্দ্রিয়ের পশ্চাতে ধাবমান না হওয়া। এই শিক্ষা কোনও দেশ বা জাতিতে সীমাবদ্ধ নয়। সকলের জন্য। এজন্যই ভারতের শিক্ষা থেকে আজকের বিশ্ব আপন মার্গ খুঁজে পাবে। তারা শিক্ষা দেয়, তোমরা কিছু অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছ। সেগুলি ছিনিয়ে নেওয়া তোমার জীবনের উদ্দেশ্য। তাই তারা জন্ম থেকেই আন্দোলন ও আস্ফালনে প্রমত্ত। আর আমরা শিক্ষা দিই, তোমরা পঞ্চঋণ নিয়ে জন্মছ। সেই ঋণ শোধ করা তোমার জীবনের উদ্দেশ্য।

ঋষিঋণ: ঋষিরা যে জ্ঞান বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, বিবিধ শাস্ত্রের মাধ্যমে আমাদের দিয়ে গিয়েছেন, তাতে আমাদের ঋণ হয়েছে, যা শোধ হবে অনুশীলনের মাধ্যমে।

দেবঋণ: এই গগন, পবন, পাবক, পানীয়, মেদিনী আমরা পেয়েছি বিনা আয়াসে। বিভিন্ন দেবতা সেই শক্তির উৎস। তাঁদের তুষ্টির নিমিত্ত যজ্ঞ করা কর্তব্য। তবেই দেব ঋণ শোধ হবে। আজকের বিজ্ঞান একই কথা বলে। Ecology balance করার জন্য যজ্ঞ অপরিহার্য।

পিতৃমাতৃ ঋণ: আশৈশব যাঁরা না থাকলে আমরা বেড়ে উঠতে পারতাম না, তাঁদের রক্ষণাবেক্ষণ আমাদের অবশ্যই কর্তব্য।  পিতামাতার সেবা করলে এই ঋণ শোধ হবে।

নৃ-ঋণ:  মানুষ একা কখনওই বেঁচে থাকতে পারে না প্রতিবেশী, জাতির সাহায্য ছাড়া। তাই আমরা সকল মানুষের কাছে ঋণী। মানুষকে সাহায্য করলে এই ঋণ শোধ হবে। মানুষে মানুষে দ্বন্দ্বের অবসান হবে।

ভূতঋণ: পশুপক্ষী, কীটপতঙ্গ ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না। তাই পশুপালন অবশ্যকর্তব্য।

আর্য ঋষিরা এই যে বিধান দিয়ে গিয়েছেন, এই শিক্ষা স্কুল-কলেজের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তা কিছুটা কার্যকর হলেও আধুনিক বিশ্বের সমস্যা লঘু হবে।

রামচন্দ্র যখন বনে যাত্রা করছিলেন, তখন লক্ষ্মণের মা বলেছিলেন, রামম্ দশরথং বিদ্ধি। সীতা মাম্। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পিতৃসম। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃজায়া মাতৃসম। আজকের বিশ্ব এই শিক্ষাই ভারতের কাছ থেকে চাইছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে নিয়ে যাবে।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए