শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

টিভিতে ছোটদের জন্য একটি কার্টুন সিরিজ সম্প্রচারিত হয়। নাম ‘মোটু পাতলু’। খুব জনপ্রিয় সিরিজটি। আমিও খুব দেখি। দেখা যায়, হরেকরকম কাণ্ডের মধ্যে একটি গাড়ি চলতে চলতে আকাশে হেলিকপ্টারের মতো উড়ে যাচ্ছে। রামায়ণে রাবণ রাজার পুষ্পক রথকে মনে পড়ে যায়। কল্পনাগুলি যুগে যুগে কেমনভাবে মিলে যায়! একসময় শিশু-কিশোর, এমনকী বড়দের গল্পেও কল্পবিজ্ঞানের কত আজগুবি ঘটনা লেখা হত। কল্পবিজ্ঞানের গল্প আজও ভীষণ জনপ্রিয়। একশ্রেণির মানুষ যদিও মিথ্যা, বাঁধানো, অবাস্তব বলে কল্পবিজ্ঞানকে উড়িয়ে দেন, কিন্তু দেখা যায়, একদিন যা ছিল অবাস্তব, তাই ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নেয়।
রোবট একসময় ছিল অবাস্তব একটি কল্পনা মাত্র। সেই কল্পনাকে সাহিত্যপত্রে নানা অলংকারে পাঠক-পাঠিকাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সমস্ত বয়সের পাঠক-পাঠিকারা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তা পড়তে থাকেন। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন উপন্যাসে রোবটের কল্পনা সেই সময়কার মানুষের মনে খুব করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। জার্মান সাহিত্যিক মেরি শেলির বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাস ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। বইটিতে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্পে প্রকৃতি বিজ্ঞানের সুইস ছাত্রের দ্বারা মৃতদেহের টুকরো জুড়ে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার কাল্পনিক ও ভৌতিক কাহিনি আছে। এই কাল্পনিক কাহিনি রোবট সৃষ্টির প্রথম ভাবনা হিসাবে ধরা হয়।
এছাড়াও রাশিয়ার কল্পবিজ্ঞান লেখক এবং বিজ্ঞানী আইজ্যাক অ্যাসিমভ আধুনিক রোবটের ধারণা নিয়ে আসেন। সায়েন্স ফিকশন এবং কল্পবিজ্ঞানের গল্প শিশু-কিশোররা খুব মনযোগ দিয়ে একসময় পড়ত। জগদীশচন্দ্র বসু তো বাংলার কল্পবিজ্ঞানের জনক ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের কল্পবিজ্ঞানের গল্প বুড়োরাও পড়তেন। প্রফেসর শঙ্কুর ‘রোবু’ কত না কাণ্ডকারখানা ঘটিয়েছে। আধুনিক কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক গল্পে অদ্রীশ বর্ধন খুব জনপ্রিয়।
অন্য পোস্ট: মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ
একদিন যা ছিল কল্পবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু, আজ পৃথিবীর বহু উন্নত দেশে তা-ই হয়েছে বাস্তব। চোখ মেলে পশ্চিমের উন্নতশীল দেশগুলির দিকে তাকিয়ে দেখলে মানুষের মতো অবিকল রোবটগুলিকে কাজ করতে দেখা যায়। অর্থাৎ একদিনের কল্পনার বস্তু আজ আবিষ্কৃত হয়ে গিয়েছে। তা সম্ভব হয়েছে আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্সের জন্যই। স্টিভেন স্পিলবার্গ কয়েক দশক আগে আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্সে ভর করে প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিলুপ্ত ডাইনোসরদের একটি সিনেমায় হাঁটিয়েছেন, ছুটিয়েছেন। রোবট আর কল্পনায় নেই। রোবট আবিষ্কৃত হয়ে কারখানা, পরীক্ষাগার, চিকিৎসাবিদ্যায় কাজে লাগছে। এমআইটি-র গবেষণামূলক প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, আর একটি বছর পর অর্থাৎ ২০২৫ সাল নাগাদ আবিষ্কৃত রোবটগুলি সমগ্র বিশ্বে ২০ লক্ষ মানব শ্রমিকের কাজ করবে। একটি বইয়ে পড়ছিলাম, ২০১২ সালের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে আমেরিকার ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রোজেক্টস এজেন্সি বা ডারপা রোবট বানানোর একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। শর্ত ছিল, মানুষের মতো দেখতে হবে সেই সমস্ত রোবট এবং যে কোনও বিপর্যয়ে উদ্ধারকাজ চালানোর মতো সামর্থ্য সেগুলির থাকতে হবে। ১৬টি দল ছিল প্রতিযোগিতায়। ২০১৩ সালে প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় মায়ামিতে। রোবটগুলিকে আটটি পরীক্ষা দিতে হয়। গাড়ি চালানো, মই বেয়ে উপরে ওঠা, ঝোপঝাড়, মাঠ পার হওয়া, ড্রিল ব্যবহার করে দেওয়ালে গর্ত করা ইত্যাদি। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিল জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিক্স ল্যাবে তৈরি মানুষের মতো দেখতে ‘শ্যাফট’ নামের রোবট। পেয়েছিল ৩২ পয়েন্টের মধ্যে ২৭। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিল ফ্লোরিডার ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান অ্যান্ড মেশিন কগনিশন।
এখন রোবটের যুগ। ভাবা গিয়েছিল রোবট আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে স্পেস, বিজ্ঞান, গবেষণা প্রভৃতি ক্ষেত্রে রোবটকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা যাবে। কিন্তু তা হচ্ছে না। পৃথিবীর যুদ্ধপ্রিয় দেশগুলি রোবটকে এখন যুদ্ধের কাজে লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এক দেশের সঙ্গে আর এক দেশের যুদ্ধ, পরমাণু যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া, এমনকী লেসার যুদ্ধেও রোবটকে কাজে লাগানোর ভাবনা শুরু করে দিয়েছে বর্তমান বিশ্ব।

খুব সুন্দর হয়েছে ।