শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

একটা সময় ছিল, যখন গ্রামবাংলার প্রত্যেক ঘরেই দড়ির খাটিয়া অবশ্যই থাকত। তখন গৃহের আসবাব সামগ্রী এত আধুনিক ছিল না। মুষ্টিমেয় হাতেগোনা কয়েকটি ঘরে পালঙ্ক ছিল। কাঠের সাধারণ তক্তা অধিকাংশ ঘরেই থাকত। ছয়-সাতের দশকে বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এলে মাটিতেই বিছানা পেতে শোয়ানো হত। আটের দশক থেকে বেশকিছু সচ্ছল বাড়িতে দামি কাঠের ডিভান ঢুকতে শুরু করে। সাধারণ কাঠের তক্তা ধীরে ধীরে অচল হতে শুরু করে।
১০-২০ বছর আগেও দড়ির খাটিয়া সব বাড়িতে না হলেও বহু বাড়িতে দেখা যেত। বিশেষত প্রান্তিক দরিদ্র মানুষের উঠোনে খাটিয়া থাকতই। অতিথির আগমন হলে দড়ির খাটিয়ায় বসিয়ে পিতল বা অন্য কোনও ধাতুর ঘটিতে জল দেওয়া হত তাঁর পা ধোয়ার জন্য।
ইদানীং আর দড়ির খাটিয়া তেমন চোখে পড়ে না। দড়ির খাটিয়ার জায়গা নিয়েছে প্লাস্টিকের চেয়ার। লোহার ফোল্ডিং খাটিয়াও এসেছে দড়ির খাটিয়ার জায়গায়। দড়ির খাটিয়া আজ গ্রামাঞ্চলের বিলুপ্তপ্রায় একটি ঐতিহ্যবাহী আসবাব। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সমগ্র ভারতের গ্রামাঞ্চলে একদিন দেখা যেত দড়ির খাটিয়া।
বাবুই দড়ি বা নারকেল দড়ির ছাউনির কাঠের খাটিয়ার বিকল্প লোহার খাটিয়া হতে পারেনি। কারণ লোহার ফোল্ডিং খাটিয়ার চড়া দাম। আর গ্রামীণ মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেই তৈরি করা যেত দড়ির খাটিয়া। গ্রামের মানুষ নিজেরাই দল বেঁধে কাঠের খাটিয়ার ছাউনি করতে পারেন।
একসময় গ্রামবাংলায় ডাক্তার অমিল ছিল। দু’-তিনটে গ্রাম ব আরও বেশি এলাকার মানুষের চিকিৎসা সাধারণ কমপাউন্ডারই করতেন। গ্রামের মানুষ চিকিৎসার জন্য রোগীকে সেই কমপাউন্ডার বা হাতুড়ে ডাক্তারের কাছেই নিয়ে যেতে বাধ্য হতেন। তখন এত বেশি যন্ত্রণা উপশমের ট্যাবলেট বা ওষুধ ছিল না। পিঠ, পা, ঘাড়, মাথায় ব্যথা হলে ডাক্তারবাবু দড়ির খাটিয়ায় শোয়ার নিদান দিতেন।
দড়ির খাটিয়া বয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ। রোদ উঠলে দড়ির খাটিয়া উঠোনের রোদে রাখা হত। তাতে ছারপোকা বা অন্যান্য পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হত। দড়ির খাটিয়া রোদে দেওয়ার ফলে জীবাণু ধ্বংস হয়ে যেত। মরণাপন্ন রোগী দড়ির খাটিয়ায় দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকলেও ঘা হত না। বনেদি বাড়ি বা একান্নবর্তী পরিবারে খাটের উপর কাপড় পেতে রোদে মুড়ির চাল শুকোতে দেওয়া, আচারের কাচের জার রোদে দেওয়া ছিল পরিচিত দৃশ্য।
অন্য পোস্ট: সত্য প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসন (পর্ব ১)
গ্রামীণ জীবনে খাটের পায়ায় পোষ্যদের দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার দৃশ্যও চোখে পড়ত। গ্রামীণ মানুষ খাটিয়াকে খাট বলতেন, আজও বলেন। গ্রামাঞ্চল, এমনকী শহরেও নবজাতককে তেল মাখিয়ে দড়ির খাটে শুইয়ে রোদ খাওয়ানো হত। দড়ির খাটিয়া বা খাট প্রত্যন্ত গ্রামে অ্যাম্বুল্যান্সের কাজ করত। যখন গ্রামাঞ্চলে রিকশা, গাড়ি প্রভৃতি পরিবহণের কথা কল্পনাও করা যেত না, তখন মরণাপন্ন রোগীকে দড়ির খাটে শুইয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে হাসপাতাল বা নিকটস্থ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হত। শ্মশানে শবদাহ করর জন্য মৃতদেহ বহন করা হত দড়ির খাটিয়ায়। কিছুদিন আগেও জাতীয় সড়ক বা রাজ্য সড়কের পাশে ধাবা বা লাইন হোটেলে দড়ির খাটিয়া প্রচুর দেখা যেত। এখনও দু’-চার জায়গায় দেখা যায়।
দড়ির খাট বা খাটিয়ায় থাকে চারটি বাহু ও চারটি খুরো বা পায়া। দড়ির খাটিয়া সাধারণত আয়তাকার হয়। মোটা কাষ্ঠখণ্ড বা লগ থেকে দড়ির খাটিয়ার বাহু, পায়া বা খুরো তৈরি হয়। শাল, ইউক্যালিপটাস, কেন্দু প্রভৃতি গাছের লরা বা পোল থেকেও খাটিয়ার বাহু ও পায়া তৈরি হয়। গ্রামীণ গাজনমেলা, রথের মেলা প্রভৃতিতে দড়ির ছাউনি ছাড়া খাট বা খাটিয়া কিনতে পাওয়া যায়। তাছাড়াও এলাকার ছুতোর বা কাঠের মিস্ত্রিরা অর্ডার পেলেই খাটিয়া তৈরি করে দেন। গ্রামীণ মানুষ অনেক সময় নিজেরাই স্থানীয় বনবাদাড় থেকে গাছের সরু লম্বা ডাল কেটে এনে খাটিয়ার ঠাট তৈরি করে ফেলেন। অনেকেই সেই খাটিয়ার ঠাটে রং করেন। বাজার থেকে বাবুই দড়ি বা নারকেল দড়ি কিনে নিয়ে এসে দল বেঁধে খাটিয়ার ছাউনি দেন। বিভিন্ন ডিজাইন ও হাতে তৈরি অসাধারণ নকশা ফুটিয়ে তোলেন।
সুদূর অতীত থেকে ভারতে ব্যবহৃত আসবাবপত্রের মধ্যে দড়ির খাটিয়া অন্যতম ছিল। কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, সমাজ আধুনিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দড়ির খাটিয়া বিলুপ্ত হতে বসেছে। তবে গ্রামাঞ্চলে আজও দড়ির খাটিয়ার ব্যবহার খুব বেশি না হলেও লক্ষ করা যায়।

Nice