শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

খাবার খাওয়ার পর মুখে পানটি ভরে সবেমাত্র জিভের ডগায় চুনটুকু ঠেকিয়েছি, অমনি আমার সহধর্মিণী গিন্নিটি গায়ের দিকে থলিটা ছুড়ে দিয়ে আদেশ করল, ‘ঘরে চাল বাড়ন্ত। থলে দিলাম। বাজার থেকে নিয়ে এসো। কতবার বলেছি, একটু বেশি করে চাল এনো। তা নয়, সেই টুকু-টুকু, টুকু-টুকু। ঘরে বেশি চাল থাকলে যেন আমি বিক্রি করে গয়না গড়িয়ে নেব। পাজি, হাড়কেপ্পন কোথাকার!’ গিন্নি গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে ঢুকে গেল।
আমি বিরক্তির সঙ্গে হেঁকে বললাম, এই খাবারটুকু খেলাম।বাইরে ভয়ানক রোদ। আর এই বৃদ্ধকে চাল নিয়ে আসার আদেশ দিচ্ছ! বুঝেছি, আমার প্রতি তোমার মায়া-দয়া কিস্যু নেই।
গিন্নি শুনে পরোটার মতো মুখ করে ভেংচে বলল, ‘মায়া-দয়া? ওরে, আমার কীর্তনীয়া রে! পদাবলি গাইতে গাইতে আবলি বলতে শুরু করলে! তোমাকে মায়া-দয়া করে আমার কী লাভ হবে, বলতে পারো বংশীমুখো? বিয়ের পর থেকে আমাকে ক’ফোঁটা মায়া-দয়া করেছ? ছেলেপুলের মায়ায় তোমার মতো শুকনো তেঁতুলের সঙ্গে আমি ঘর করছি, নইলে কবেই ঘর-সংসার ছেড়ে পালিয়ে যেতাম। বোঝা গেল কিছু?’
আমি বুঝলাম, এই ডাবমুখী গিন্নির সঙ্গে তর্ক করা ভালো নয়। কখন হাতের খুন্তি পিঠে বসিয়ে দেবে, কেউ জানে না। শান্তভাবে বললাম, জানি গিন্নি। কিন্তু বাজার থেকে চাল না এনে হোটেল থেকে দিন দিন ভাত নিয়ে চলে আসাই তো ভালো ছিল। তোমাকে আর হাঁড়ি চড়িয়ে সেদ্ধ করার হ্যাপা পোয়াতে হত না।
গিন্নি কড়াৎ করে রেগে গিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ‘ইয়ার্কি হচ্ছে আমার সঙ্গে? গায়ে আলকুশি ঘষে দেব। শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর থেকে আমিই তোমাকে ছেলের মতো স্নেহ দিয়ে মানুষ করে চলেছি। আমার সঙ্গে ইয়ার্কি! হোটেল থেকে ভাত আনবে! ভাতের চাল বোঝো না কিছু। বাউন্ডুলে।’
অন্য পোস্ট: একমাত্র ভারতই পৃথিবীর সব ধর্মের মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে
গিন্নি আমাকে পুত্রবৎ স্নেহ করে শুনে আমি অর্ধেকটা পাগল হয়ে গেলাম। গিন্নিকে ফের বললাম, সেদিন দুর্গাপুর গিয়েছিলাম গিন্নি। অবাক হয়ে দেখলাম, ওখানকার বহু মানুষ চাল কেনে না। ভাত উনুনে বসায় না। অর্ডার দিলেই হোটেলের লোক ঘরে ভাত দিয়ে চলে যায়। তাই বলছিলাম। এই আর কী।
গিন্নি আমার কথা শুনতে শুনতে কখন উঠে গিয়ে এক গ্লাস ঠাসা কেরোসিন এনে আমার মুখের কাছে ধরে বলল, ‘মুখে কেরোসিন ভরে দেব, বলে দিলুম। তোমার মুখে ভাত-রামায়ণ শুনতে চাই না। কঁক্-কঁক্ করে গিলিয়ে দেব। এক চুমুকেই গড়চুমুক নয়, সোজাসুজি যমের ঘর পাঠিয়ে দেব।’
আমি আর না দাঁড়িয়ে থেকে থলিটা নিয়ে ঝাঁপ দিলাম রাস্তায়। বাজারে চাল আনতে। পত্নীটি মানসিক রুগি। বলা যায় না, সত্যিই আমাকে জ্যান্তই যমের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে পারে। তাছাড়া চেঁচামেচিকে আমি ভীষণ ভয় পাই। পড়শিরা এই চেঁচামেচি শুনলে ভীষণ খুশিই হবে। গাঁ হোক বা শহর, প্রতিবেশীর কষ্টে পড়শিরা বিনোদন পায়। সমাজটায় আজ পচন ধরেছে। মানসিক চিকিৎসক বলেই দিয়েছিলেন, ‘এই ঝগড়ুটে মহিলার রোগ নিরাময়যোগ্য নয়। এঁর রোগ মনে নয়, চরিত্রে।’

খেটেখুটে পদাবলি গেয়ে সংসার চালাই। বিবাহযোগ্যা বোনের বিয়ে দেওয়ার জন্য টাকা নিয়ে এই খেজুরপাতামুখো মহিলাকে বিয়ে করেছিলাম। ভগবান কৃষ্ণ সইতে পারেননি। তাই এই ভয়ংকরী কৃষ্ণভাবিনী আমার গলায় ওলের কুটকুট জ্বালা নিয়ে বসে গিয়েছে। মাঝেমধ্যে ভাবি, এই প্যাঁচামুখী গিন্নিটিকে ডিলিট করে দিই। কিন্তু পারি না। বৃদ্ধ হওয়া বড় জ্বালা! তবু বৃদ্ধ হলেও রাগ থাকে। তাই একদিন আমি সন্তর্পণে আমার পত্নীর নামের তলায় ডিলিট লিখে ঘরের বাইরে সাঁটিয়ে দিলাম।
সেই সাইনবোর্ড পড়বি পড় একেবারে প্রতিবেশী মুখুজ্জেদার চোখে! সেদিন মুখুজ্জেদা ঘরে এসে দুঃখ-দুঃখ মুখ করে বললেন, ‘তুমি ভাই ভাগ্যবান। একজন ডি. লিট. স্ত্রী পেয়েছ। আমারটা এইট পাশ। মুখের চপা মারাত্মক! ঘরে টেকা যায় না। এক্কেবারে কেন্দ্র-রাজ্যের সম্পর্ক।’
আমি বিস্মিত হয়ে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলাম, আমার স্ত্রী ডি. লিট., আপনি জানলেন কীভাবে? মুখুজ্জেদা তেতো খাওয়ার মতো মুখ করে বলল, ‘সে কী কথা ভাই? তুমিই তো দরজার সাইনবোর্ডে লিখে রেখেছ!’
আমি গাল চুলকে চুপিচুপি বললাম, শুনুন দাদা, আপনাকে বলি। আমার পত্নী ডি. লিট. নয়, এইট পাশ।
আমার কথা শুনে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে মুখুজ্জেদা বললেন, ‘সে কী কথা! এইট পাশ! তাহলে যে সাইনবোর্ডে ডিলিট লিখে রেখেছ?’
আমি বললাম, লিখে রেখেছি। তবে ওটা ডি. লিট. নয়, ডিলিট। ওর দুর্ব্যবহারের জন্য ক্ষোভে আমি আমার পত্নীটিকে ডিলিট করে দিয়েছি।
এমন সময় আমার কৃষ্ণভাবিনী গিন্নিটি দু’জনের কথাবার্তার মধ্যেই আমাদের মাঝে এসে হাজির। আমি লক্ষ করিনি। পটাং করে মোবাইল ফোনটা টেবিলে নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার সম্পর্কে যত্ত পারো অকথা-কুকথা মুখুজ্জেদাকে বলে দাও। মনের সুখ মিটিয়ে নাও। হে ভগবান, এ কেমন স্বামী দিলে আমাকে ভগবান?’ বলেই মুখুজ্জেদার সামনেই ডুকরে কেঁদে উঠল আমার পত্নী। আমার কী লজ্জা! বাইরের লোকের কাছে আর কতটা নীচে নামানো হবে আমাকে!
আমি শান্ত গলায় বললাম, অমনভাবে কাঁদছ কেন গিন্নি? মুখুজ্জেদা রয়েছেন। তাঁর অপমান হচ্ছে না?
গিন্নি আটামাখা হাতে কাপড়ের খুঁটে আঁটা সেফটিপিনটা খুলে আমার দিকে তাক করে কান্না থামিয়ে বলল, ‘হোক অপমান! এই সেপটিপিনটা দেকেচ? আমার সম্পর্কে কুকথা বললেই সটান পেটে সেঁধিয়ে দেব।’
মুখুজ্জেদা পরিস্থিতি দেখে ভয়ে কম্পিত হয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, ‘ভাই, আমি চললুম । এ তো তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক দেখছি রাশিয়া-ইউক্রেনের মতো!’
অন্য পোস্ট: আর জি কর কাণ্ড ও নারী আন্দোলন
মুখুজ্জেদা চলে যেতেই গিন্নি ধপ ধপ করে এসে আমাকে প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, রাতকানা, হাড়গিলে, কঙ্কাল জ্যাঠামশাই, তা, তোমার ওই মুখুজ্জেদার সঙ্গে ডিলিট নিয়ে কী কথা হচ্ছিল?’ গিন্নির প্রশ্ন শুনে আমি যেন আমার মুখে এক লক্ষ গিমেশাকের তেতো রসের অনুভূতি পেলাম। আতঙ্কে ছোলা সেদ্ধর মতো মুখ বাঁকিয়ে বললাম, ডিলিট নিয়ে আমার সঙ্গে মুখুজ্জেদার আবার কবে কথা হল? তুমি ভুল শুনেছ আমার কৃষ্ণভাবিনী। তোমার সম্পর্কে কারও কাছে আমি বদনাম করতে পারি? একটু সোহাগ মিশিয়ে জবাব দিলাম। এবার তোষামোদী কণ্ঠে গিন্নিকে বললাম, ওই যে আগে কী যেন বলেছিলে, সন্তান-টন্তান কী সব। ওই সম্পর্কটাই থাক না গিন্নি। আমাকে আবার জ্য্যাঠামশাই-টশাই বলা কেন? সম্পর্কটার বহুবিশেষণ ভালো হয় না। ঘরে রাহু ও শনি ঢোকে। গিন্নি কর্কশ কণ্ঠে ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘রাহু-শনি ঘরে ঢুকুক। ঢুকতে বাকিটা কোথায় আছে?’ তারপরই একটা মস্ত হাই তুলে জলহস্তীর মতো বিশাল মুখগহ্বরটা বন্ধ করে প্রশ্ন করল, ‘সত্যি কথা বলো। মুখুজ্জেদাকে আমার সম্পর্কে কী বলছিলে?’
আমি বুঝলাম, মহাবিপদে পড়েছি। আমার চাকা লাইনচ্যুত হয়েছে। মুশকিল আমার শিয়রে। আমার শিয়রে কাল-পত্নী! ভেজা কাঠে যজ্ঞ করা আর এমন ঘরনি নিয়ে ঘর করা, দুই-ই সমান। আমি ফৎ-ফৎ করে হাসতে হাসতে গিন্নিকে বললাম, তোমার সঙ্গে আমার গলাগলির সম্পর্কের কথা হচ্ছিল প্রিয়ে কৃষ্ণভাবিনী?’
গিন্নি চকিতে চাকতির মতো ঘুরে আমার গালে সপাটে মারল এক চড়। ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, ‘গলা-গলির সম্পর্ক? ফাটা কলাপাতা? গলা গোয়ালার নোংরা নর্দমার গলিটা ভেবেছ আমি দেখিনি? পচা দুর্গন্ধময় গলি! গলা-গলি মানে সেই গলা গোয়ালার গলির সঙ্গে আমার তুলনা!’
যন্ত্রণায় গালে হাত বোলাতে বোলাতে টের পেলাম ৩২টির ছ’টি দাঁত লাইনচ্যুত হয়ে উপড়ে আমার হাতে পড়ে গিয়েছে! বাকি হতাহতের খবর নেই। আঘাতে গিন্নির হাতের কাপলিং খুলে পড়ার আশঙ্কা হয়েছিল। তবে তেমন কিছু হয়নি। কিছু ঘটলে গিন্নির চিকিৎসা সেই আমাকেই করাতে নিয়ে যেতে হত। সেটা না হলেও আপাতত আমিই চললাম হাসপাতালে। সুস্থ হতে হবে। কারণ এর নাম সংসার।

Golpo ti pore valo laglo
গল্পটা সত্যি খুব সুন্দর
Awesome story