Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

নারীজাতি আজও প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি

যখন নারীদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়, তখন তাঁরা গৃহপ্রাঙ্গণের চার দেওয়াল থেকে রাজপথে বেরিয়ে আসেন। শুরু হয়ে যায় স্বতঃস্ফূর্ত নারী জাগরণ। কেউ কেউ একে নারীবিদ্রোহ বলতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। স্বতঃস্ফূর্ত এই বিদ্রোহে শাসকের বন্দুকও স্তব্ধ হয়ে যায়।

Share Links:

আরতি রায়

শিক্ষা–সংস্কৃতির আলোকধারা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের সব দেশে। এ দেশও শিক্ষার সুমন্দ বাতাসে অবগাহন করছে। ভারতে ভাষা ও সাহিত্যকে যাঁরা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন, তাঁরা হলেন, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, ডা. আম্বেদকর প্রমুখ। এই জ্ঞানী ও গুণীরা সাহিত্যকে চন্দন সৌরভে মুড়ে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে চেতনা, প্রগতি ও ভাষা প্রয়োগের মাধুর্য। তা সত্ত্বেও এ সমাজ আজও শব্দ প্রয়োগ বা শব্দচয়নে তার দৈন্য কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অপশব্দের প্রয়োগে তার সামন্তবাদী চিন্তাধারা থেকে এখনও বেরিয়ে আসতে পেরেছে কি?

মানুষ নামের জীব তিনটি লিঙ্গে বিভক্ত। তবে তার মধ্যে মূলত রয়েছে নারী ও পুরুষ। পুরুষকে বলা হয় বীর্যবান, শক্তিমান ও বলদর্পী। নারীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দ হল, সতীসাধ্বী, ফর্সা, কালো ইত্যাদি। পুরুষের ক্ষেত্রে রং বিচার্য নয়। বেঁটে বা কুৎসিত বলে কিছু নেই। পুরুষ হল পৌরুষময়। পুরুষাঙ্গহীন না হলেই হল। নারীদের কি মানুষ হিসাবে গণ্য করা হয়? তাঁদের ক্ষেত্রে বলা হয় মেয়েমানুষ। মানুষ, তবে মেয়ে যুক্ত আছে। আসলে এই শব্দটি ঘৃণাবাচক। আগেকার দিনে জমিদাররা বাড়িতে মেয়েমানুষ পুষতেন। সুধী পাঠক, এবার এ শব্দটির অর্থ কী দাঁড়ায়, আপনারা বুঝে নিন। শব্দ এমন একটি হাতিয়ার, যা দিয়ে একটি গোটা সমাজ বা জাতিকে ঘৃণার গো-ভাগাড়ে ঠেলে ফেলা যায়।  অন্যদিকে চণ্ডাল শব্দের স্থানে মতুয়া নেতা গুরুচাঁদ ঠাকুর জাতির নাম নমঃশূদ্র করে দেন, অর্থাৎ অবনমিত না করে উন্নয়ন করে দেন।

অন্য পোস্ট: স্বাধীনতা বহু দেশবাসীকেই স্বদেশে পরবাসী করেছে

আবার আমরা দেখি যে, দুর্গাপুজোর সময় ‘অসুর’বিনাশী শব্দ প্রয়োগ করা হয়। যাঁরা বিদ্যোৎসাহী, তাঁরা কি জানেন না যে, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ডে ‘অসুর’ জাতির অস্তিত্ব বিদ্যমান। ভারতের সরকারি জাতিতালিকায় তাদের নাম রয়েছে। মহিষাসুরকে তারা তাদের মহান সম্রাট বলে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে। ভারতের বহু জায়গায় মহিষাসুর শোক উৎসব পালিত হয়। এই উৎসব নিয়ে লেখালেখির জন্য সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশকে প্রাণ দিতে হয়। সুধীসমাজ জেনে, নাকি না জেনে এ সকল শব্দ ব্যবহার করে চলেছে?

যাই হোক, ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া হল। এবার ফেরা যাক মূল আলোচনায়। আমার আলোচ্য বিষয় নারীর প্রতি বঞ্চনা। অতীতে বলা হত, নারী হল সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র। নারী মানব জমিনের কৃষিক্ষেত্র। সেখানে পুরুষ হাল চালাবে। বীজ বপন করবে। তারপর ফসল উৎপাদন হলে যথাসময় তা ঘরে তুলবে। পুরাকালে মাতৃগর্ভে নিয়োগী সন্তান উৎপাদন করা হত।

তবে আজ এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, নারীমুক্তিতে পুরুষের একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সতীদাহ প্রথা রদ করতে রামমোহন, বিধবা বিবাহে বিদ্যাসাগর, সম্পত্তিতে নারীর অধিকার স্থাপন ও চাকুরিরতা মহিলাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি, নারী মজুরদের পুরুষের সমান মজুরি প্রদানে ডা. আম্বেদকরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এত কিছুর পরেও নারীজাতি প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ এখনও গ্রহণ করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ ক্ষমতায়নে নারীকে সেভাবে সামনের সারিতে আসার সুযোগ দেওয়া হয়নি। পঞ্চায়েত ও পুরসভায় সংরক্ষণ দেওয়া হলেও সেখানে পুরুষ পিছনে ছড়ি ঘোরায়।

অন্য পোস্ট: ব্রিটিশদের একদিন ভারত ছেড়ে যেতেই হত

এবার আসা যাক সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে। আজকাল বেশ কিছু জায়গায় নারীরা সুনামের সঙ্গে সাংবাদিকতার কাজ যথাযথ ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করে চলেছেন। কিন্তু সাহিত্য জগতে নারীদের তেমন আনাগোনা নেই। যে দেশে গার্গী, খনা, সঙ্ঘমিত্রার জন্ম হয়েছিল, যে দেশে সাবিত্রীবাঈ ফুলে, বেগম রোকেয়ার জন্ম হয়, সে দেশে সাহিত্য জগতে নারীদের তেমন আনাগোনা না থাকার কারণ খুঁজে দেখা দরকার। অনেকে বলবেন, সাহিত্য মস্তিষ্কের বিষয়। নারীরা এগিয়ে না এলে করার কিছু নেই। আমার মত হল, সাহিত্য সেমিনারের মাধ্যমে নারীদের কলম ধরতে উৎসাহিত করা হোক। আমার হাতে খুন্তি যেমন থাকে, তেমন অবসর সময় কলমও উঠে আসে। কারণ নারীদের মনের, সুখ-দুঃখের কথা আমরাই তুলে ধরতে পারি। আমাদের কলমে নারীদের অনেক না জানা কথা পাপড়ি মেলতে পারে। নারীদের লেখা হোক না একটু কম উন্নত, তাঁরা লিখুন না সহজ সরল ভাষায়, সেটাই তো তাঁদের চিন্তার প্রতিফলন। তাঁদের লেখা গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা হোক না ছাপা দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক বা মাসিক কাগজে। তাঁদের মনের কথা ভাষায় ধরুন না তুলে। আমার মনে হয়, তাহলে বাংলা সাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হবে। এর পরিণামস্বরূপ আগামীতে নারীসমাজের মধ্য থেকে অনেক গল্পকার, প্রবন্ধকার ও কবির জন্ম হবে। অর্ধেক আকাশের অধিকারী নারীসমাজ সাহিত্য জগতেও নিজেদের মেলে ধরতে পারবে। বিভিন্ন পত্রিকা থেকে যে সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়, নারীদের ক্ষেত্রেও তার একটা সংরক্ষণ রাখা হোক না।

অন্য পোস্ট: এবার কি দাড়ীশ্বরের পালা!

আজ সব ক্ষেত্রে নারীসমাজ এগিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়, সাগর, মহাশূন্য এবং সামরিক বাহিনীতে মহিলারা পারদর্শিতা দেখাচ্ছেন। তাই তাঁদের অবহেলা করা মানে অর্ধেক সমাজকে অন্ধকারে রাখা। নারীদের ওপর শোষণ, যৌন নির্যাতন কমেছে বটে, কিন্তু একটা বাতির চারপাশে যেমন অন্ধকার থাকে, তেমনই নারীদের জীবনেও এখনও সেটা রয়ে গিয়েছে। কিন্তু যখন তাঁদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়, তখন তাঁরা গৃহপ্রাঙ্গণের চার দেওয়াল থেকে রাজপথে বেরিয়ে আসেন। শুরু হয়ে যায় স্বতঃস্ফূর্ত নারী জাগরণ। কেউ কেউ একে নারীবিদ্রোহ বলতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। স্বতঃস্ফূর্ত এই বিদ্রোহে শাসকের বন্দুকও স্তব্ধ হয়ে যায়।

তাই নারীকে অবমাননা নয়, যথাযথ সম্মান দিতে হবে। ভুলিও না হে পুরুষ সমাজ, এ নারী তোমার গর্ভধারিণী জননী, তোমার স্নেহের ভগিনী, তোমার ভালোবাসার জীবনসঙ্গী, তোমার সন্তানের জননী। নারীকে মানুষ ভাবো। তাকে তার যোগ্য মর্যাদা দাও। তবেই সমাজ ও রাষ্ট্র হবে অনিন্দিত সুমহান।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Sakti Kumar Chattopadhyay
Sakti Kumar Chattopadhyay
1 year ago

বেশ ভালো লেখা হয়েছে ।

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए