ভাস্কর সেনগুপ্ত

যখন জন্ম নিলাম, বাবা-মা ভাবল, সেটা তাদের সফলতা। যখন হাঁটতে শিখলাম, মনে হল, সেটাই সফলতা। যখন কথা বলতে শিখলাম, মনে হল, সেটাই সফলতা। তারপর স্কুলে গেলাম। সবার চেয়ে বেশি নম্বর পাওয়াটাই সফলতা বলে শিখলাম। তারপর বুঝলাম, না, আসলে মাধ্যমিকে স্টার পাওয়াটাই সফলতা। ভুল ভাঙল। বুঝলাম, উচ্চমাধ্যমিকে এই রেজাল্টটা ধরে রাখাই সফলতা।
এখানেই শেষ নয়। তারপর বুঝলাম, ভালো বিষয়, যেটা পড়লে একটা ভালো চাকরি পাওয়া যাবে, সেটা নিয়ে ভালো কলেজে চান্স পাওয়াটাই সফলতা। আরও পরে বুঝলাম, না, কলেজ শেষে ভালো চাকরি পাওয়া এবং অনেক রোজগার করাটাই সফলতা। তারপর বুঝলাম, না, নিজের টাকায় একটি ভালো ফ্ল্যাট কেনাটা সফলতা। পরে বুঝলাম, সেটাও নয়, নিজের টাকায় গাড়ি কেনাটাই আসল সফলতা। আবার ভুল ভাঙল। দেখলাম, ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করে সুখে সংসার করাটাই আসল সফলতা।
বছর ঘুরল। দেখলাম, আসলে বিয়ে করে বংশধর এনে তাকে ভালোভাবে বড় করাটাই সফলতা। ছেলে হলে তাকে প্রতিষ্ঠিত করাটাই সফলতা, আর মেয়ে হলে একটি ভালো ফ্যামিলির উচ্চপদে চাকরিরত ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়াটাই সফলতা।
তারপর এল আমার রিটায়ারমেন্টের সময়। তখন মনে হল, সারা জীবনের জমানো টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারাই সফলতা। তারপর মরার একটু আগে বুঝলাম, পৃথিবীতে সফলতা বলে স্থায়ী লক্ষ্য কিছু নেই, পুরোটাই এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজের তৈরি করা একটি প্রতিযোগিতা, যার মূলে রয়েছে আকাশছোঁয়া আকাঙ্ক্ষা। তা কখনও পূর্ণ হওয়ার নয়।
সফলতা কাকে বলে জানতে হলে সেটা কার, তা জানতে হবে। জীবন কাকে বলে জানতে হবে। ‘আমি’ কাকে বলে জানতে হবে। একটু তলিয়ে দেখি আমার বাড়ি, আমার গাড়ি, আমার চাকরি, আমার সুখ, আমার দুঃখ, আমার হাত, আমার দেহ, আমার বিদ্যা। ‘আমি’ কে? আমি আমাকেই চিনি না। আমার সফলতা কোনটা, তা কেমনভাবে জানব?
এই জগৎ মায়ার দ্বারা সৃষ্ট। ভগবান মায়াকে অবলম্বন করে এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন। আমরা সকলে সেই মায়ায় আবিষ্ট। দাদাভাই আরও সরলীকরণ করে বলেছেন, ‘তুমি যে কাজ করবে, সব ভগবানের কাজ বলে করবে। ঘরসংসারের কাজ হোক বা অফিসের, যাগযজ্ঞ, তপস্যা, সমাধি হোক বা শিক্ষাদীক্ষা, জানবে, কোনও কাজই ব্যর্থ নয়। আর্য ঋষিরা যে পঞ্চঋণের মার্গ প্রদর্শন করেছেন, সবই ভগবানের সৃষ্টি রক্ষার্থে। সে কর্তব্য সম্পাদন আমাদের সফলতার চাবিকাঠি। সফলতাকে যতক্ষণ না মানুষ সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারবে, ততক্ষণ মনুষ্যজীবন গড্ডালিকা প্রবাহে মাথা খুঁড়ে মরবে। শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, প্রয়াস, সব ব্যর্থ।

