দয়াময় পোদ্দার

সরকার দ্বারা যখন কোনও পুরস্কার দেওয়া হয়, তখন তার গুরুত্ব অনন্য হয়ে যায়, তা যে দলের হোক না কেন। সরকার দ্বারা দেওয়া পুরস্কার জনগণের মৌলিক অধিকারগুলির মধ্যে পড়ে। এবং সমাজকে একতাবদ্ধ, উদ্দীপ্ত রাখতে এরকম পুরস্কারের অবশ্যকতাও রয়েছে। তাতে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্যে যেমন কাজের প্রতি ধ্যানমগ্নতা বাড়ে, তেমন যাঁরা সেই ক্ষেত্রে যুক্ত থাকেন, তাঁদের মধ্যেও কাজটিকে আরও উন্নত করার আগ্রহ তৈরি হয়। ২০১১ সালের ২৫ জুলাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার দ্বারা বেসামরিক ক্ষেত্রে তিনটি পুরস্কারের প্রবর্তন হয়—বঙ্গবিভূষণ, বঙ্গভূষণ এবং বঙ্গরত্ন।
শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং জনকল্যাণমূলক কাজে বিশেষ অবদানের জন্য এই তিনটি পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রথম বছর বেশ জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার পেয়েছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট মানুষরা। তার মধ্যে ছিলেন অমলা শংকর, মহাশ্বেতা দেবী, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া দেবী, মান্না দে, আমজাদ আলি খান। এছাড়াও বিভিন্ন সময় এই পুরস্কারটি পেয়েছেন থাঙ্কুমণি কুট্টি, মিঠুন চক্রবর্তী, শত্রুঘ্ন সিনহা প্রমুখ। ২০১১ সালে শুরুর বছর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়ে মাত্র একজন ব্যক্তি পুরস্কারটি প্রত্যাখান করেছিলেন, তিনি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। যদিও পুরস্কারটি নিয়ে বিতর্ক হয়তো রয়েছে বা থাকতে পারে। সেই প্রেক্ষিতে সমালোচনারও অবকাশ হয়তো রয়েছে। কিন্তু এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্য তা নিয়ে পর্যালোচনা করা নয়। একজন ব্যক্তি, যিনি পুরস্কারটি গ্রহণ করেছেন এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতিই লেখাটির বিষয়বস্তু। তার আগে একবার দেখে নেওয়া যাক পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত তিনটি পুরস্কারের ক্রমপর্যায়— প্রথম: বঙ্গবিভূষণ, দ্বিতীয়: বঙ্গভূষণ, তৃতীয়: বঙ্গরত্ন। এ বছর বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার পেয়েছেন শ্রীরাধা বন্দোপাধ্যায়, শিবাজী চট্টোপাধ্যায়, নচিকেতা চক্রবর্তী, লোপামুদ্রা মিত্র, ইমন চক্রবর্তী, শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়, বাবুল সুপ্রিয়, নগেন্দ্র রায় (অনন্ত মহারাজ)।
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট মানুষের রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সে পার্থক্যকে প্রাধান্য দেওয়া সরকারের কাম্য নয়। গুণীজনের গুণের মূল্যায়ন করাই সরকার তথা রাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রধান কর্তব্য। এতে গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভারসাম্য বজায় থাকে। তবে এক্ষেত্রে যেমন সরকারের ভূমিকা রয়েছে, তেমন যেসব বিরোধী রাজনৈতিক দল রয়েছে, তাদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়বদ্ধতা রয়েছে। ভিন্নমতাবলম্বী হওয়ার কারণে অনেক সময় পুরস্কার গ্রহীতাদের নানারকম অপমানের শিকার হতে হয়। এ বিষয়ে সমস্ত রাজনৈতিক দলের আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়া দরকার। তাদের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের পরিণত মনের পরিচয় দিতে হবে।
এ বছর বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার গ্রহণ করার পর সামাজিক মাধ্যমে সংগীতশিল্পী ইমন চক্রবর্তীকে যে ট্রোলিংয়ের শিকার হতে হয়েছে, তা খুবই লজ্জার। বাঙালিরা জাতি হিসাবে যে গরিমা বহন করত, এ কাজ তার পরিপন্থী। অবাক বিষয় হল, ইমন একা নয়, আরও বেশ কয়েকজন এ বছর বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কারও কারও রাজনৈতিক মতাদর্শও স্পষ্ট, কিন্তু ইমনের ক্ষেত্রে তেমন নয়। অথচ তাঁকেই ট্রোলিংয়ের শিকার হতে হল!
কোনও পুরস্কারই কখনও কারও মুখ দেখে দেওয়া হয় না। সারাজীবনের কর্মের স্বীকৃতি হিসাবেই দেওয়া হয়। অতএব যখন আপনি কোনও পুরস্কার প্রাপককে অপমান করছেন, তখন আসলে সেই মানুষটির সৃষ্টিশীল কাজকেই হেয় করছেন। তার প্রভাব সামাজিক জীবনে ক্ষত তৈরি করে এবং তাতে সমাজের কোনও মঙ্গল হয় না।
