প্রোজ্জ্বল মণ্ডল
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন তাঁর প্রতিপক্ষ হিসাবে নিকট আত্মীয়দের দেখে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নেন। এই অবস্থায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বলেন যে, অর্জুন, তুমি শুধু তাঁদের দেহের বিনাশ করবে। আত্মা অবিনাশী হওয়ায় তাঁদের আত্মার হত্যা তো তুমি করতে পারো না। এখানে ভগবান আত্মার অমরত্বের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, পূর্বে আমি কখনও ছিলাম না, এমন নয়। তুমি কখনও ছিলে না, তাও নয় বা এই নৃপতিগণও ছিলেন না, এটাও সত্য নয়। এই দেহধারণের পূর্বে আমরা সকলেই নিত্য আত্মা রূপে বিদ্যমান ছিলাম। এই দেহত্যাগের পরেও যে আমরা কেউ থাকব না, তাও নয়। বর্তমানে দেহ সত্ত্বেও আমরা নিত্য আত্মস্বরূপে বিদ্যমান আছি এবং দেহান্তে ভবিষ্যতেও নিত্য আত্মা রূপে বিরাজমান থাকব।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরও বলেছেন, এই আত্মা কখনও জাত বা মৃত হয় না। কারণ পূর্বে না থেকে পরে বিদ্যমান হওয়ার নাম জন্ম এবং পূর্বে থেকে পরে না থাকার নাম মৃত্যু। আত্মায় এই দুই অবস্থার কোনওটিই নেই। অর্থাৎ আত্মা জন্ম ও মৃত্যুরহিত, অপক্ষয়হীন এবং বৃদ্ধিশূন্য। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা বিনষ্ট হয় না।
পরবর্তী ক্ষণে পুনর্জন্মের সমর্থনে শ্রীভগবান বলেছেন, মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে অন্য নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে, আত্মা সেরূপ জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে অন্য নতুন শরীর গ্রহণ করে। এটাই গীতোক্ত পুনর্জন্মবাদের সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ। দেহ তথা শরীরের দেহান্তরপ্রাপ্তিতে দেহী তথা আত্মার মৃত্যু ঘটে না। আত্মা অবিকৃত থাকে এবং দেহের মৃত্যুর পর আত্মা অন্য দেহ প্রাপ্ত করে। এজন্য শ্রীভগবান অর্জুনকে উপদেশ দিয়েছেন, যেমন দেহীর (আত্মার) এই দেহে কৌমার, যৌবন ও জরা ক্রমে উপস্থিত হয়, তাতে দেহী বা আত্মার কোনও পরিবর্তন হয় না, সেরূপ দেহান্তরপ্রাপ্তিতে (মৃত্যুতে) দেহী অবিকৃত থাকে। মৃত্যু দৈহিক বিকারমাত্র। এজন্য দেহান্তরপ্রাপ্তি বিষয়ে জ্ঞানীগণ মোহগ্রস্ত হন না।
এখান থেকেও পুনর্জন্মের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। কেবল পুনর্জন্ম হলেই তো হবে না, সেই পুনর্জন্ম কীরূপে হবে, তা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন— জাত ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত এবং স্বীয় কর্মানুসারে মৃত ব্যক্তির পুনর্জন্ম অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং এখানে দেখা গেল, স্বীয় কর্মানুসারে মৃত ব্যাক্তির পুনর্জন্ম হয়।
এবার পুনর্জন্মের কারণ সম্পর্কে দেখা যাক। শ্রীভগবান বলেছেন, পুরুষ (ভোক্তা, ক্ষেত্রজ্ঞ) প্রকৃতিতে অবস্থিত হয়ে সুখ-দুঃখ-কার্য-কারণ রূপে পরিণত ও মোহাকারে অভিব্যক্ত প্রকৃতির গুণসমূহ ভোগ করে। এ সকল গুণে আত্মভাবই পুরুষের দেবাদি সৎ জন্ম ও পশ্বাদি অসৎ জন্ম ও সদসদ্বযোনিরূপ মনুষ্য জন্ম গ্রহণের প্রধান কারণ।
অন্য পোস্ট: সত্য প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসন (পর্ব ১)
পুনর্জন্ম হিসাবে আত্মা কোন কোন প্রাণীর দেহে প্রবেশ করবে, তা সম্পূর্ণরূপে পূর্বজন্মের স্বীয় কর্মের ওপর নির্ভর করে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন, সত্ত্বগুণের বৃদ্ধিকালে মানুষ দেহত্যাগ করলে হিরণ্যগর্ভাদি উপাসকদের সুখময় ব্রহ্মলোকাদিতে গমন করে। রজোগুণের বৃদ্ধিকালে মৃত্যু হলে কর্মভূমি মনুষ্যলোকে জন্ম হয় এবং তমোগুণের বৃদ্ধিকালে মৃত্যু হলে পশ্বাদি মূঢ়জন্ম প্রাপ্ত হয়।
এরপর দেখা যাক, এই পুনর্জন্ম থেকে কীভাবে নিস্তার পাওয়া যায়। একমাত্র আত্মজ্ঞান তথা মোক্ষলাভ করলে এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র তথা পুনর্জন্ম থেকে উদ্ধার হওয়া যায়। তা লাভ করলে জীব সংসাররূপ মায়া, জন্ম-মৃত্যুর চক্র, জরারূপ দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করে এবং জীবের ব্রহ্মপদ প্রাপ্তি ঘটে, অর্থাৎ ব্রহ্মের স্বরূপ তথা পরমাত্মাকে জানতে পারে। যা লাভে সংসারে পুনর্জন্ম ঘটে না, তাই হল মোক্ষ বা মুক্তি। মোক্ষ হল পুনর্জন্মনাশক। আত্মজ্ঞান ব্যতীত পুনর্জন্ম রোধ হয় না। ব্রহ্মজ্ঞান, ব্রহ্মনির্বাণ ও মোক্ষ একার্থবোধক।

