স্বপনকুমার মণ্ডল
প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

‘পুজো’র সঙ্গেই বাঙালির বেড়ে ওঠা। সেখানে হরেক পুজো, হরেক আয়োজন। বারো মাসে তেরো পার্বণের ঘটা তার লেগেই আছে। শুধু তাই নয়, পুজোকে উৎসবে শামিল না করা পর্যন্ত তার স্বস্তি নেই। পুজোর কথা শুনলেই মন আনচান করে উঠত।
অবশ্য তখনও পূজা পুজো হয়ে ওঠেনি। আর পুজো মানেই দুর্গাপুজো ছিল না। কী করে পার্বতীকে সমতলবাসী ভেতো বাঙালি একান্ত আপন করে নিল, তা ভাবলে আশ্চর্য মনে হয়। অবশ্য ঘরমুখো বাঙালির মধ্যে আগমনী আর বিজয়ার ছকটি বড় চেনা। সেখানে দেবী দুর্গার মায়ের আসন ক্রমশ পাকা হয়ে উঠেছে। সেই সপরিবারে আগমন থেকে বিচ্ছিন্নভাবে পুজো লাভের আয়োজন, সবই মানিয়ে নেওয়ার সহজতায় তার আবেদন ক্রমশ নিবিড়তা লাভ করেছে। অবশ্য তার মধ্যে দুর্গাপুজোর রেশ মেলাতে না মেলাতে শ্যামা কালীর দীপাবলির আলো জ্বলে ওঠে। সেই আলোয় উৎসবমুখর বাঙালি ফের পুজোর ছুটির আমেজে শেষবারের মতো উষ্ণতা উপভোগ করে। অবশ্য সকলে তো রামপ্রসাদ বা বামাখ্যাপা কিংবা রামকৃষ্ণ নন, তাই মা কালীর আলো আলোতেই মিলিয়ে যায়, আমোদের পথে বিস্তারলাভ করে না। সেখানে দেবী দুর্গার মা দুর্গা হয়ে ওঠাটা ছিল স্বাভাবিক। ছোটবেলায় সেই মায়ের পুজোর সঙ্গেই পরিচয় হয়েছিল। তখনও পুজো উৎসবে মিলিয়ে যায়নি, আর পুজো ছিল পূজা। ভক্তির রং চড়িয়ে পল্লির মানুষের কাছে তা-ই ছিল ভগবতী পূজা। সেখানে ভগবতীর নামটি শুনে শিবকে ভগবান ভাবার মতো ভাবনাও যুক্তি খুঁজে পায়নি। তখনও বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর। বিশ্বাস ও ভালোবাসার জগতে শ্রদ্ধাবোধের অভাব ছিল না। প্রতিমার সামনে রূপ-ঐশ্বর্যের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ হত, পিছনের বাঁশ-কাঠ-খড়ের না-ঢাকা পিছনের দেহাংশের দিক থেকে চোখ আপনাতেই সরে আসত। পুজোর আগমন তখনও আবির্ভাব, এখনও সমান সচল। অবশ্য এখনকার মতো বিসর্জনের পর থেকে দিন গোনার বাতিক ছিল না। অথচ তা নিয়ে উত্তেজনার অভাব দেখিনি। হ্যাজাকের আলোয় ছুটে আসা পতঙ্গের মতো পল্লির মানুষ আনন্দে মুখর হয়ে উঠত।
পুজোর সেই জনসংযোগে আমার বাবা রোডসংলগ্ন নবগঠিত খুদ্র জনপদ চড়কডাঙা কলোনিতে বারো মাসে তেরো পার্বণ শুরু করেছিলেন। সেই সূত্রে আমাদের বাড়িতে দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়েছিল। শৈশবের খেলাঘর ভেঙে আসার পর্ব তখনও শেষ হয়ে যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই পুজোর উত্তেজনার চেয়ে প্রতিমার আকর্ষণ আমায় পেয়ে বসেছিল।
গ্রামে তো আর কুমোরটুলি নেই। দুর্গার প্রতিমা গৃহস্থের বাড়িতেই তৈরি হয়। সেই প্রতিমা গড়ার দিন থেকেই আমার পুজোর আনন্দ ক্রমশ নিবিড় হতে শুরু করত। মৃৎশিল্পীর গড়ে তোলা মূর্তি কীভাবে সালংকারা প্রতিমা হয়ে ওঠে, তা শিশুমনে অপার বিস্ময় বয়ে আনত। তখন সেই শিল্পীকে মনে হত জাদুকর। অবশ্য শিল্পীমাত্রেরই জাদুশক্তি থাকে। সেদিক থেকে পল্লিবাংলার মৃৎশিল্পীরা বড়ই উপেক্ষিত মনে হয়। পেশাদারিত্বের বাইরে তাঁদের শৈল্পিক সত্তায় দেখার দৃষ্টি সেখানে অগভীর। অথচ কী গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাঁরা সেই প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠায় সক্রিয় থাকেন, তা আমি ছোটবেলা থেকেই লক্ষ করেছি। কাঠ-বাঁশ-খড় দিয়ে গড়ে তোলা দৈহিক কাঠামোর উপরে মাটির প্রলেপ ও ছাঁচ দিয়ে মুখমণ্ডল-সহ অন্যান্য অংশ বানিয়ে খড়িমাটির পালিশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁর মনের ছবিটা স্পষ্টতা লাভ করে না। সেখানে সিংহের হাঁ-মুখ থেকে ইঁদুরের উঠে দাঁড়ানো, সবকিছুই বিস্ময় মাখানো। তারপর যখন রঙে রঙিন করে সাজপোশাক পরিয়ে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ঘামতেলে সজীব করার প্রয়াস চলত, তখন চোখের সম্মুখে মা দুর্গার দুর্গতিনাশিনী রূপটি দৈবিক অনুভূতি এনে দিত। সেই বিস্ময়বোধ পুজোর শিল্পায়নে আরও বিস্তারলাভ করে। প্রতিমা থেকে মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা থেকে পরিবেশ রচনা, সবকিছুতেই শৈল্পিক প্রকাশ প্রতিযোগিতামুখর।
যেখানে দেখনদারির বাৎসরিক আয়োজন চলে, সেখানে আড়ম্বরের আয়োজন অনিবার্য হয়ে ওঠে। দেবদেবীর মুখ নায়ক-নায়িকার মতো করলে সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় ঠিকই, কিন্তু তাতে আর ভক্তির আন্তরিকতার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে না। এজন্য কৃত্রিমভাবে অনেকদিন আগে থেকে পুজোর উত্তেজনা তৈরির প্রয়াস অবশেষে বিড়ম্বনায় শেষ হয়। মহালয়ার শব্দদানবের আমন্ত্রণেই তার সূচনা। ভাবা যায়! সেখানে পুজোর বিনোদনী পাঠ বড় আন্তরিক হয়ে ওঠে। পুজোয় কী কী করব, কোথায় কোথায় যাব, কার কার সঙ্গে ঘুরব, তার কত আয়োজন, ফন্দি ফিকির!
অন্য পোস্ট: নেতাজি ও ডাক্তারজি: আদর্শের দুই ভিন্ন রূপ
পুজোর ছুটি মানেই সময় কাটানোর নানা আয়োজন। সেখানে পুজোয় পিকনিকের আয়োজন থেকে ভ্রমণের প্রয়োজন, সবই হাতছানি দিয়ে ডাকে। পুজোর আনন্দবোধ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে ওঠে না বলেই তার আয়োজনে আমাদের অনিয়ন্ত্রিত প্রয়াস। সেখানে ঢাকের তালে কোমর দুললেও মনের সাড়া মেলে না। অথচ মুখে ছোটে ‘খুশিতে মন ভরে যায়‘। অবশ্য মননের চর্চায় বাঙালির বিস্তার সর্বত্রগামী। সেক্ষেত্রে শারদার সঙ্গে সারদাকে মিলিয়ে দেওয়াটা ছিল সময়ের অপেক্ষামাত্র।
এই পুজোয় পত্রপত্রিকার বিপুল আয়োজনে সেই মনের খোরাক কিছুটা হলেও আভিজাত্য লাভ করে। পুজোর প্রসাদের চেয়ে আত্মপ্রসাদ লাভে অস্থির মনকে নির্মল আনন্দ দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে এসব পত্রিকার আয়োজনের উন্মাদনাই বাঙালির বনেদি মনের পরিচয়বাহক। ফলে দুর্গাপুজো এখন শুধু শিল্পে আত্মগোপন করেনি, শিল্পী-সাহিত্যিককেও পুজোর নৈবেদ্যর আয়োজনে শামিল করেছে। পুজোর সেই পবিত্র আনন্দ হারিয়ে গেলেও তার অস্তিত্ব নিঃস্ব হয়ে পড়েনি। তাই খুঁজে ফিরি শৈশবের স্মৃতিতীর্থ আর সেই নৈবেদ্যর আয়োজনে। অবসরের খোলা হাওয়ায় তার সৌরভ আমায় আমোদিত করে চলে অবিরত, অবারিত।
