Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সুলতানের ছবিতে আছে নিম্নবর্গের মানুষের সংগ্রাম

এস এম সুলতানের আঁকা ছবি 'নদী পারাপার'।

Share Links:

শিশির  আজম

এস এম সুলতান ধারাবাহিকভাবে কখনওই ছবি আঁকেননি। বোহেমিয়ানিজম তাঁর শিল্পচর্চাকে যে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে, এটা যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবেন। তাঁর শিল্পচর্চায় বিভিন্ন পর্যায়ে বড় বড় ছেদ আমরা দেখি। কিন্তু সারা জীবনের চিত্রকর্মে কোনও না কোনওভাবে বাংলার প্রকৃতি আর মানুষ থেকেছে, কলকাতা আর্ট কলেজে ইউরোপীয় ঘরানায় চিত্রশিক্ষা সত্ত্বেও। থেকেছে বললে ভুল হবে, প্রবলভাবেই তারা থেকেছে।

হ্যাঁ, সুলতানের কাজে মানুষ আর প্রকৃতি আসলে একই। ১৯৮৭ সালে আঁকা ‘নদী পারাপার’ ছবির কথা বলছি। এটি সুলতানের শেষ পর্বের ছবিগুলির একটি। এ ধরনের ছবিগুলিতে আমরা মানুষ আর প্রকৃতির যে নিবিড় মন্ময়তা অনুভব করি, তা গগাঁর তাহিতি পর্বের কাজে ইতিপূর্বে দেখেছি। অবশ্য গগাঁকে প্রকৃতির নিবিড় অনুভব পেতে পশ্চিমি সভ্যতার জঙ্গমতা থেকে নিজেকে ছিন্ন করতে হয়েছিল। এর প্রাথমিক কারণ ছিল হয়তো নিজের আত্মার শান্তি বা যন্ত্রসভ্যতার মানববিমুখতা-প্রকৃতিবিমুখতা থেকে মুক্তি। কিন্তু সুলতানকে নিজের শেকড় থেকে বিচ্যুত হতে হয়নি। বরং শেকড়েই আপন অপরিমেয় শক্তিকে অনুভব করেছেন। ‘নদী পারাপার’-এ আমরা দেখি, নদীর পাড়ে কলসি-কাঁখে যুবতী মেয়েদের। আর রাখাল গরুগুলিকে ছোট নদী পার করিয়ে নিয়ে যায়। সাধারণ গ্রামীণ দৃশ্য। জয়নুল-কামরুল-শফিউদ্দিন বা রামকিঙ্করের কাজেও ভিন্ন আঙ্গিকে ও রসায়নে এমন আমরা পেয়েছি। গগাঁ প্রকৃতির কাছে থাকতে চেয়েছেন। সুলতান প্রকৃতির ভিতরে নিজেকে লীন করে দিয়েছেন। এটা নিজেকে খুঁজে নেওয়া বা বলা যায়, নিজের কাছে ফেরা।

কিন্তু একটি বিষয়, ‘নদী পারাপার’-সহ এ পর্বের ছবিগুলিতে রং আর মোটা ব্রাশের যে ব্যবহার, তাতে গগাঁর কাজের সঙ্গে স্পষ্ট তফাৎ বোঝা যায়। বরং রং আর তুলির কাজে ভ্যান গঘের মিল পাওয়া যেতে পারে। ভ্যান গঘ তাঁর শেষ পর্বের কাজে ঝড়ের গতিতে প্রচুর ল্যান্ডস্কেপ এঁকেছেন। সেখানেও প্রকৃতি আর মানুষ আছে। আর ট্র্যাডিশনাল চিনা বা রুশি ল্যান্ডস্কেপগুলিতে মানুষের উপস্থিতি খুবই কম। তবে সুলতানের কাজে কখনও কখনও মানুষই বড় হয়ে দেখা দেয়। কেন না মানুষ যুগের পর যুগ সংগ্রাম করে বেঁচে থেকেছে। কখনও বিরূপ প্রকৃতির বিরুদ্ধেও তাকে লড়তে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ ও প্রকৃতি পরস্পর সংবদ্ধ। কেউ কাউকে আঘাত করলে নিজেই আক্রান্ত হয়।

কাকতালীয় বিষয় হল, মনে-মানে-পিসারো-রেনোয়া-গগাঁ-গঘ এর মতো ফরাসি ইম্প্রেশনিস্ট মাস্টার পেইন্টাররা হৃদয়ের নিবিড় অনুভবে প্রকৃতির যে ছবি এঁকেছেন, ঠিক একশো বছর পর তা যেন ভর করেছে সুলতানের ওপর। অসুস্থ শরীরে সুলতান এঁকে চলেছেন একটির পর একটি ছবি। কোনওটা হয়তো শেষ হয়নি, চলে গিয়েছেন আরেকটায়। একশো বছর আগে গগাঁ আর ভ্যান গঘের জীবনপর্বও এমনটাই ছিল। গগাঁর ছবিতে যে সময়-অনুভব আর গঘের রঙের বিচ্ছুরণ, সেখানে সুলতানের ছবিতে প্রাচ্যবাদী রণজিৎ গুহ কথিত নিম্নবর্গের মানুষের নিরন্তর সংগ্রামের ভিতর বেঁচে থাকার নান্দনিকতাই চিত্ররসিকদের কাছে অনুভূত হয়।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

নববর্ষ

একুশে ফেব্রুয়ারি

গদ্যের বারান্দা ৪৩-৬০

গদ্যের বারান্দা ৪২

গদ্যের বারান্দা ৪১

গদ্যের বারান্দা ৪০

প্রিন্টআউট

গদ্যের বারান্দা ৩৬-৩৮

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল শিখা দীপ মুখোপাধ্যায়

গদ্যের বারান্দা ২৬-৩৫