কাজল মুখার্জি
বাঙালির সব পার্বণ বা উৎসবের প্রথা পুরোহিত সমাজের কর্তা পুরুষদের দ্বারা প্রবর্তিত হলেও একটি পার্বণ শুরু হয়েছিল মহিলাদের হাত ধরে এবং তাঁদের বিধান মেনেই। সেটি হচ্ছে রান্নাপুজো।
প্রামাণ্য তথ্য না থাকলেও পরম্পরা থেকে ধারণা স্পষ্ট হয়। নদীমাতৃক গ্রামবাংলার এ এক নিজস্ব উৎসব। কোথাও বলে ‘ইচ্ছা রান্না’, কোথাও বা ‘ধরাটে রান্না’ বা ‘আটাশে রান্না’, আবার কোথাও বলে ‘বুড়ো রান্না’। আসলে এসবই পার্বণপ্রিয় বাঙালির দেওয়া ডাকনাম। মূল প্রতিপাদ্য জমিয়ে হরেকরকম রান্না, আর পরের দিন না রেঁধে খাওয়া। বিশ্বকর্মা পুজোর পাশাপাশি সেদিন বাঙালির ‘হেঁশেল বন্ধ’। ‘অরন্ধন’-এর আভিধানিক অর্থ হল অ-রন্ধন অর্থাৎ যেদিন রান্না করা হয় না বা রান্না নিষেধ। আর সেদিনটির কথাই এখানে আলোচ্য।
ভাদ্র সংক্রান্তি বা বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিন পরিবারের কল্যাণার্থে গৃহিণীরা শিবের মানসপুত্রী দেবী মনসার উদ্দেশে নানাবিধ পদ রান্না করে নিবেদন করেন। রান্নাপুজোর দিন সাধারণত উনুনের পুজো হয়। সারা বছর আমরা যে উনুনে রান্না করি, তার উপাসনা করা হয় এই পুজোয়। অন্যদিকে উনুনের গর্ত হল মা মনসার প্রতীক। তাই দেবী মনসার উদ্দেশে পুজো বোঝাতেই এই উনুন পুজো করা হয়।
শীতকালে যখন সূর্যের আলো ঝলমলে রোদ হয়ে মাটি স্পর্শ করে, তখন শীতঘুমে যাওয়ার আগে গ্রামাঞ্চলে সাপের আনাগোনা শুরু হয়। চাষ করতে গিয়ে অনেক মানুষের জীবনহানিও ঘটত আগেকার দিনে। তাই দেবী মনসাকে সন্তুষ্ট রাখতে, সংসার-জীবনে দেবীর কৃপালাভের আশায় আগের দিনের রান্না করা পান্তা ভাত, সজনে শাক, ভাজাভুজি, ওলের বড়া, মাছের বিভিন্ন ধরনের পদ সাজিয়ে দেবীকে নিবেদন করা হত। ওইদিন বাড়িতে টাটকা রান্নার রীতি ছিল না।
দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে এই প্রথা রান্নাপুজো বলে পালিত হয়। এই পুজোর জন্য দৈনন্দিন ব্যবহারের উনুন গোবর জল দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। তারপর আলপনা ও মনসা পাতা দিয়ে সাজিয়ে ঘট প্রতিষ্ঠা করে পুজো হয়।
অন্য পোস্ট: কেঞ্জাকুড়ার জাম্বো জিলিপি
রান্নাপুজোর পদগুলি হল, পান্তা ভাত, মুগের ডাল, কচু শাক, লতি চচ্চড়ি, পাঁচরকম ভাজা, নারকেল দিয়ে আলু–কুমড়োর ছাঁচি, ইলিশের পাতলা ঝোল, ভাপা ইলিশ আর শেষ পাতে চালতার টক। রসনার তৃপ্তির কথা ভেবে বেশ রসালোভাবেই শুরু হয়েছিল এই পার্বণের। এখনও গ্রামবাংলায় অরন্ধনের আগের দিন বাড়ির সকল সদস্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সারারাত ধরে রান্নার উপচার তৈরি, রান্নাবান্না, কুটনো-বাটনা চলে।
ভাদ্র সংক্রান্তির দিন মা মনসাকে উৎসর্গ করে তবে খাওয়া হয়। গোত্র বা অঞ্চল ভেদে কেউ কেউ মনসার মূর্তি বানিয়ে বা ঘট পেতে বা ফনিমনসার ডাল পুঁতে মনসার প্রতীক হিসাবে পুজো করেন। আগে তিথি অনুযায়ী সংক্রান্তির দিন ভাদ্র শেষ হয়ে আশ্বিন পড়লে তবে সে খাবার মুখে তুলতেন গৃহস্থ মানুষ। তাই এই প্রথাকে অনেকে বলেন, ভাদ্রে রান্না করে আশ্বিনে খাওয়া। এই প্রথার প্রচলন করেন বাংলার অধিবাসীরা। চলতি কথায় যাঁদের ‘ঘটি’ বলে, তাঁদের বাড়িতেই বেশি দেখা যায়।
ভাদ্র সংক্রান্তির আগের দিন উনুন পুজো করা হয়৷ তারপর সারারাত তাতে রান্না করা হয় কচুর শাক, চাল-কুমড়োর ঘণ্ট, মটর ডাল এবং চালতার টক৷ সঙ্গে ইলিশ ও চিংড়ির পদ৷ ভাত রান্না করে সারারাত জল ঢেলে ভিজিয়ে রাখা হয়৷ কোনও খাবারেই পেঁয়াজ-রসুন দেওয়া হয় না৷ রান্নার পর ফ্রিজেও তোলা হয় না৷ পান্তাভাত-সহ সব রান্না খাওয়া হয় পরদিন অর্থাৎ ভাদ্র সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পুজোয়৷ সেদিন উনুন ধরা বা ছোঁওয়া যায় না৷ উনুন বা গ্যাস বার্নার বা কেরোসিন স্টোভ, যে উপকরণই হোক না কেন, যাতে রান্না করা হয়, তা পড়ে থাকে তেমনই৷ তার পরের দিন উনুন ফেরে চেনা ব্যস্ততায়৷ বর্তমানে ব্যস্ততার কারণে অরন্ধন প্রথার স্বাভাবিক মেজাজ এবং রীতিনীতি অনেকটাই শিথিল হয়েছে। যাই হোক, এই প্রথা এখনও গ্রামীণ অঞ্চলের পাশাপাশি কলকাতা শহরতলি এলাকায় ব্যাপকভাবে পালিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে বছরে দু’বার রান্নাপুজো হয়। একবার ভাদ্র মাসে সংক্রান্তির দিন বা মনসা পুজোয় এবং আর একবার শীতলষষ্ঠীতে, শ্রীপঞ্চমী বা মাঘ মাসে সরস্বতী পুজোর পরদিন।

