শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়
বাঁকুড়া সদর থানার অন্তর্গত সমৃদ্ধশালী প্রাচীন গ্রাম কেঞ্জাকুড়া। প্রাচীন কেঞ্জাকুড়া নামটি ‘কাঞ্চনকুড়া’ থেকে এসেছে বলে গবেষকদের অভিমত। দ্বারকেশ্বরের তীরে বাঁকুড়া ১ নম্বর ব্লকের অন্তর্গত এই প্রাচীন গঞ্জ বা গ্রাম কাঁসা-পেতলের বাসন, বাঁশের কুটির শিল্পদ্রব্য, তাঁতশিল্পের জন্য বিখ্যাত। গ্রামবাংলার মানুষের কাছে আজও কেঞ্জাকুড়ার তাঁতের কাপড়ের চাহিদা রয়েছে। কাঁসার বাসনেরও চাহিদা রয়েছে রাজ্যব্যাপী।
তবে এখন সবকিছুকে পিছনে ফেলে কেঞ্জাকুড়ায় নাম কুড়িয়েছে এক বিশেষ ধরনের ঢাউশ জিলিপি। সে জিলিপিকে স্থানীয়রা জাম্বো জিলিপি বলেন। দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে চলছে নিম্নচাপের লাগাতার বৃষ্টিপাত। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে mahashorgol.com পোর্টালের জন্য ছুটে গিয়েছিলাম প্রাচীন গ্রাম কেঞ্জাকুড়ায়। ছুটে যাওয়ার অন্যতম কারণ বিশালাকার জাম্বো জিলিপির টান। পৃথিবীর আর কোথাও এমন প্রকাণ্ড আয়তন, ওজনের সুদৃশ্য নকশা আঁকা জিলিপি তৈরি হয় না। সারা বছর তৈরি হয় না। তৈরি হয় বছরে একবার। ঠিক ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পুজো এবং ভাদুপুজো উপলক্ষে।
এই বিশালাকার জিলিপি কিনতে দূরদূরান্ত থেকে খদ্দেরদের ভিড় জমে। মিষ্টির দোকাদার ও জিলিপি কারিগরদের রাতে ঘুম থাকে না। দোকানে দোকানে চলে বড় বড় জিলিপি তৈরির প্রতিযোগিতা। এই জিলিপি খুবই সু্স্বাদু হয়, গঠনেও শিল্পের ছাপ থাকে। কারিগরের শিল্পনৈপুণ্য ধরা পড়ে জিলিপির প্রতিটি প্যাঁচে।
চা খেতে খেতে কথা বলছিলাম জনৈক কারিগরের সঙ্গে। তাঁর কথা বলার সময় নেই। তবুও বললেন, ‘চাহিদা থাকে প্রচুর। ভাদ্রের অনেক আগে থেকেই জিলিপির অর্ডার চলে আসে। এবারেও এসেছে। বাঁকুড়া ও প্রতিবেশী জেলার মিষ্টিপ্রিয় মানুষজন এই জিলিপি কিনে দেশ-বিদেশের আত্মীয়দের কাছেও পাঠান। এবার তো ভয়ানক বৃষ্টি। তবুও বহু অর্ডার এর মধ্যেই সাপ্লাই হয়ে গিয়েছে।’ কীভাবে তৈরি হয় এই জিলিপি? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, ‘ভালো ঘি, চালের গুঁড়ি, বিরি (বিউলি)-র ডালের বেসন, ময়দা এবং চিনি লাগে এই জিলিপি তৈরি করতে। আগের দিন রাতে বিরির ডালের বেসন, চালের গুঁড়ি, অল্প ময়দা, একটি বড়ো আয়তনের পাত্রে জল দিয়ে মেখে ভিজিয়ে রাখতে হয়। একে বলা হয় ‘খামি’ । পৃথক পাত্রে রং মেশানো ‘খামি’ থাকে। জিলিপির গায়ে আলপনা এঁকে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে রঙিন খামি ব্যবহা করা হয়। পরদিন সকালে সেই খামিকে একটি শক্ত কাপড়ের মধ্যে ভরে পোঁটলা করে প্রশস্ত কড়াইয়ের গরম ঘিয়ের উপর মস্ত বড় ঝাঁজরি দিয়ে ঘুরিয়ে নকশা তুলে ভেজে অন্য একটি পাত্রে চিনির রসে ফেলতে হয়। ভীষণ পরিশ্রমের কাজ। খুব সাবধানে কাজটি করতে হয়। কোনওভাবে জিলিপি ভেঙে গেলে লোকসান হয়ে যায়।’
অন্য পোস্ট: কর্মসংস্থানের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরাট প্রভাব পড়তে চলেছে
দোকানে দেখলাম এমন অনেক জাম্বো জিলিপি, যেগুলি বাঁশের পেথে (ছোটো ঝুড়ি)-তে সুতলি দিয়ে কাগজ প্যাকিংয়ের কাজ চলছে। কোথাও জিলিপি ভাজার কাজ চলছে। খদ্দেররা আসছেন। কিনে নিয়ে চলে যাচ্ছেন। এ বছর জাম্বো জিলিপির ওজন করা হয়েছে ৩ কেজি থেকে ১০ কেজিরও বেশি। এই বিশেষ জিলিপি বহুদিন রেখে খাওয়া যায়।
কেঞ্জাকুড়া গ্রামের নিকটবর্তী রেলস্টেশন ছাতনা। বাঁকুড়া জজ কোর্ট থেকে কেঞ্জাকুড়া আসার ১ ঘণ্টা ব্যবধানে বাস পাওয়া যায়। জনপ্রতি ভাড়া ২৫ টাকা। ছাতনা রেলওয়ে স্টেশন থেকে রিজার্ভ করতে গেলে টোটো ভাড়া ৮০ টাকা। এছাড়াও গোবিন্দনগর বাসস্ট্যান্ড, ছাতনা-দুবরাজপুর বাইপাস মোড় থেকেও বাস আসে কেঞ্জাকুড়ায়। কেঞ্জাকুড়া থেকে টোটোয় ছাতনা গিয়ে ট্রেন বা বাসে রাজ্যের সর্বত্র যাতায়াত করা যায়।
বাঁকুড়া শহর থেকে কেঞ্জাকুড়ার সড়ক দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার। এই গ্রামে ৩০০ বছরের দুর্গাপুজো বিখ্যাত। প্রতিবছর ৬ মাঘ এখানকার মুড়িমেলা দেখতে হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়।

