সাগরময় অধিকারী

একটি চন্দ্রবিন্দুর জন্য
পূর্ববঙ্গের লোকদের মুখ দিয়ে সহজে চন্দ্রবিন্দু বার হয় না। পশ্চিমবঙ্গের লোকরা আবার অনাবশ্যকভাবে ওটা প্রয়োগ করে থাকেন। ওঁরা বলেন চাদ, পাচ, তাবু, এঁরা আবার বলেন, হাঁসপাতাল, ঘোঁড়া, হাঁসি। এ নিয়ে কবির সামনে চলছিল কথা কাটাকাটি। কবি নীরব শ্রোতা। মাঝেমধ্যে একটু-আধটু টিপ্পনী করছেন। একসময় হাসতে হাসতে বললেন, শোনোনি, খোঁকার বাবা বাঁসায় ছিলেন, হঠাৎ সাঁপ বেরুলো একটা ?
একজন আহত পশ্চিমবঙ্গবাসী বললেন, আপনিও তো অনাবশ্যক চন্দ্রবিন্দু দেন। যেমন, অলস বলতে আপনি লেখেন কুঁড়ে।
আপাতগাম্ভীর্যে কবি মুখ ভারী করে বললেন, কেন? ওতে অপরাধটা কী হল ?
—কুঁড়ে শব্দের আদি অর্থ কুড় বা কুষ্ঠগ্রস্ত, অর্থাৎ অকর্মণ্য।
সঙ্গে সঙ্গে কবি বলে উঠলেন, কেন? কুন্ঠিত অর্থাৎ শ্রমকুন্ঠিত থেকে কুঁড়ে হলে তোমাদের আপত্তি কোথায় ?
বানিয়ে বললেন বটে, কিন্তু প্রতিবাদীর মুখ চুপ হয়ে গেল ওতেই।
#
নামের মজা
নির্মলকুমারীর ডাক নাম ‘রানি’ , অথচ শান্তিনিকেতনে তখন আর এক রানি ছিলেন। তিনি কবির সেক্রেটারি অনিলকুমার চন্দের স্ত্রী। কবি মজা করে কখনও নির্মলকুমারীকে ‘প্রথমা’ ও রানি চন্দকে ‘দ্বিতীয়া’ বলে সম্বোধন করতেন। আবার কখনও প্রথমা, দ্বিতীয়া না বলে ‘হয়রানি’ আর ‘নয়রানি’ বলে ওঁদের ডাকতেন।
#
আক্ষেপ
একদিন রবীন্দ্রনাথ আপন মনেই গেয়ে উঠলেন, কেন বাজাও কাঁকন কন কন কত ছল ভরে? ওগো ঘরে ফিরে চল কনক কলসে জল ভরে। কেন বাজাও, কেন বাজাও কাঁকন কন কন?
গাইতে গাইতে বললেন, কি মিনতি, আহা, কী বোকাই ছিলুম তখন, নইলে আর এমন কথা লিখি? এখন হলে লিখতুম, যাবে তো যাও না। তুমি গেলে এমন বিশেষ কিছু ক্ষতি হবে না। কিন্তু তোমার ওই কনক কলসটা রেখে যাও, বিশ্বভারতীর কাজে লাগবে।
#
ভৌতিক মানুষ
রবীন্দ্রনাথের কাছে এক ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, তিনি ভূতে বিশ্বাস করেন কি না। প্রসঙ্গক্রমে জানিয়েছিলেন যে, তিনি তো বিশ্বাস করেনই, এমনকী , দেখেছেনও।
কবি জবাব দিলেন, বিশ্বাস করি না করি, তার দৌরাত্ম্য টের পাই বইকি মাঝেমধ্যে। সাহিত্যে, পলিটিক্সে, এক-এক সময় তুমুল দাপাদাপি জুড়ে দেয় ওরা। দেখেছিও অবশ্য। দেখতে শুনতে কিন্তু ঠিক মানুষেরই মতো!
#
মাতৃদায়
লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী তখন আন্দোলন চলছিল। রবীন্দ্রনাথও মেতে উঠেছেন, সভা-সমিতিতে যোগদান করেছেন। এমন সময় নাটোরের মহারাজার কন্যার বিয়ে। রবীন্দ্রনাথ মহারাজার বিশিষ্ট বন্ধু। বিয়ের দিন সন্ধ্যায় মহারাজা দ্বারদেশে দাঁড়িয়ে নিমন্ত্রিতদের অভ্যর্থনা করছেন। হন্তদন্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথ এসে উপস্থিত হলেন। আসতে তাঁর দেরি হয়ে গিয়েছে।
মহারাজা বললেন, কবি, আমার কন্যাদায়। কোথায় আপনি সকাল সকাল আসবেন, তা না, আপনি দেরিতে এলেন !
কবির সপ্রতিভ উত্তর, রাজন, আমারও মাতৃদায়। দু’জায়গায় সভা করে আসতে হল !
#
রাধা-ভাবের ভয়
শান্তিনিকেতনে অবস্থানকালে শৈলজারঞ্জন মজুমদার গোড়ার দিকে অনেক পুজোর ছুটি বৃন্দাবনে ঠাকুমার কাছে কাটিয়ে আসতেন। ছুটির পর যখন ফিরে আসতেন, তখন রবীন্দ্রনাথ ওঁর পিছনে লাগতেন, কই, তোমার তো রাঙানো কাপড় দেখছি না। যেমন ছিলে তেমনিই আছ। আমার তো ভয় ছিল, তুমি বুঝি বৃন্দাবনেই জমে গেলে। তোমাকে আমরা আর ফিরে পাব না। তুমি বুঝি যমুনায় হারিয়ে গেলে।
#
খ্যাতির বিড়ম্বনা
মংপুতে একদিন মৈত্রেয়ীকে রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করলেন, এখানে সন্ধ্যাবেলা তোমরা কী করো? তাস খেলো না? আজকাল যে ওই এক খেলা হয়েছে ব্রিজ?
মৈত্রেয়ীর উত্তর, না, ওসব আমার আসে না একেবারে।
— আমারও না। তবে একসময় একটু একটু খেলেছি বটে দায়ে পড়ে।
— আজ তাস খেলবে সন্ধ্যেবেলায়?
— মন্দ কী? কিন্তু অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসে খবর দিও না যেন। আমার আবার ওই এক গেরো, সঙ্গে আছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। তারপর থেকে বোঝা বোঝা তাস আসতে থাকবে। সার্টিফিকেট লেখো, কোন তাসের কী গুণ, তাস খেলার কী উপকার, কাদের তৈরি তাস উৎকৃষ্ট। সার্টিফিকেটের জ্বালায় আর নামকরণের জ্বালায় পেরে উঠিনে। যত লোকের নাম দিয়েছি আজ পর্যন্ত, প্রশান্তকে (পরিসংখ্যান বিজ্ঞানী অধ্যাপক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ) বলতে হবে তার স্ট্যাটিসটিকস করে দেখতে, তার মধ্যে কে কী হয়েছে, ক’টা খুনি ক’টা বা চোর-ডাকাত। আর আশীর্বাদেরও একটা হিসাব নেওয়া দরকার । তাহলে আমার আশীর্বাদের যে কী মূল্য, হাতে হাতে তার একটা প্রমাণ হয়ে যায়।
যা হোক, সেদিন সন্ধেবেলায় ওঁরা সবাই মিলে তাস সাজিয়ে বসেছিলেন । সবার খুব মজা লাগছিল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাস খেলতে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসে খবর দেওয়ার মতোই ঘটনা।
