Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ভারতের ইতিহাসচর্চায় পুরাণ অনিবার্য দলিল

পুরাণ কেবল ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনচর্যার প্রতিচ্ছবি। এতে নিহিত রয়েছে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও মানসিক কাঠামো। সনাতন সংস্কৃতির অবিনাশী বোধকে পুরাণ এমনভাবে ব্যাখ্যা করে, যা আজও প্রাসঙ্গিক।

Share Links:

ড. গৌতম মুখোপাধ‍্যায়
প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্য ও পুরাণগুলি শুধু ধর্মীয় উপদেশই দেয় না, অনেক সময় সমাজতাত্ত্বিক, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসা, ভূগোল, জীববিজ্ঞান ও জৈব নৈতিকতার নানা তথ্য পরিবেশন করে। প্রাচীনকালে হিন্দুধর্মের উৎকর্ষতার সঙ্গে এগুলি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল। আধুনিক বিজ্ঞানের নিরিখে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কিছু পুরাণগত বিবরণে অতিশয়োক্তি থাকলেও তার গভীরে প্রাচীন বিজ্ঞান বা প্রাকবৈজ্ঞানিক চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। প্রাচীন হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্যে ১৮টি মহাপুরাণ এবং আরও বহু উপপুরাণ বিদ্যমান। পুরাণগুলি মূলত দুই প্রকার, মহাপুরাণ ও উপপুরাণ। মহাপুরাণ ১৮— ১) ব্রহ্মা পুরাণ, ২) পদ্ম পুরাণ, ৩) বিষ্ণু পুরাণ, ৪) শিব পুরাণ, ৫) ভাগবত পুরাণ, ৬) নারদ পুরাণ, ৭) মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ৮) অগ্নি পুরাণ, ৯) ভবিষ্য পুরাণ, ১০) ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, ১১) লিঙ্গ পুরাণ, ১২) বরাহ পুরাণ, ১৩) স্কন্দ পুরাণ, ১৪) বামন পুরাণ, ১৫) কূর্ম পুরাণ, ১৬) মৎস্য পুরাণ, ১৭) গরুড় পুরাণ, ১৮) ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ। উপপুরাণের সংখ‍্যাও কমবেশি ১৮টি, এগুলি হল, আদ‍্যা পুরাণ (সনৎকুমার), নরসিংহ পুরাণ, স্কন্দ পুরাণ, শিবধর্ম পুরাণ, দুর্বাসা পুরাণ, নারদীয় পুরাণ, কপিল পুরাণ, বামন পুরাণ, ঔশানস পুরাণ, ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ, বরুণ পুরাণ, কালিকা পুরাণ, মহেশ্বর পুরাণ, সাম্ব পুরাণ, সৌর পুরাণ, পরাশর পুরাণ, মারীচ পুরাণ এবং ভার্গব পুরাণ।

সাধারণভাবে এগুলিকে ঐতিহাসিক বিবরণ হিসাবে ধরা হয় না, বরং এগুলি ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং দার্শনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। পুরাণগুলিতে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং জীবনযাত্রা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়, তবে আক্ষরিক অর্থে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসাবে গৃহীত না হলেও এগুলির সামাজিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। উপপুরাণগুলিও একই ধরনের বৈশিষ্ট্য বহন করে। পুরাণ এবং উপপুরাণগুলি মূলত হিন্দু ধর্মগ্রন্থ, যা মহাবিশ্বের সৃষ্টি, দেবদেবী, রাজা-মহারাজাদের বংশতালিকা এবং বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান ও কিংবদন্তি নিয়ে আলোচনা করে। এগুলি প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে পুরাণগুলির বিষয়বস্তু এবং বর্ণনাগুলি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। ভারতের ইতিহাসের অনেক ফাঁকফোকর পুরাণগুলি থেকে প্রাপ্ত তথ‍্য থেকেই সংগৃহীত হয়ে থাকে। এগুলি প্রাচীন ভারতীয় সমাজের জীবনযাত্রা, বিশ্বাস এবং সংস্কৃতির একটি চিত্র তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ, রাজাদের বংশতালিকা এবং বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা কিছু ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক তথ্যের উৎস হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। বর্ণনা সম্পূর্ণরূপে ঐতিহাসিক নাও হতে পারে, তবে এগুলি প্রাচীন ভারতের সংস্কৃতি, ধর্ম এবং সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।

পুরাণগুলি কেবল ধর্মীয় কাহিনি নয়, বরং সমাজ, চিকিৎসা, মনোবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, কৃষি, প্রাণীবিজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে একটি বৃহৎ জ্ঞানভাণ্ডার। ঋগ্বেদের সূর্যসূক্তে সূর্যের গতিবিধির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ রয়েছে। ঋগ্বেদের ১০:৮৫ সূক্তে চাঁদের কলার উল্লেখ রয়েছে, যা চন্দ্রপক্ষ বা লুনার ফেজ বোঝায়। পুরাণে ধন্বন্তরিকে আয়ুর্বেদের প্রবর্তক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি সমুদ্র মন্থনের সময় অমৃত নিয়ে উদিত হন। পুরাণে ৮টি প্রধান চিকিৎসাশাস্ত্র ও ৬৪ প্রকার অস্ত্রোপচার পদ্ধতির কথা বলা রয়েছে (সুশ্রুত সংহিতা)। বহু ভেষজ উদ্ভিদ ও তাদের ব্যবহার বৈজ্ঞানিকভাবেই কার্যকর (উদাহরণ: তুলসী, হলুদ)। আধুনিক ‍‘হলিস্টিক মেডিসিন’ -এর বহু ধারণার সঙ্গে আয়ুর্বেদের মিল পাওয়া যায়।

অন্য পোস্ট: নোবেল জয়ী মেরি কুরিও হয়েছিলেন সমাজের শিকার

ভগবান বিষ্ণুর দশাবতার তত্ত্বে (মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, কল্কি) বিবর্তনের  স্পষ্ট ধারা লক্ষণীয়। মৎস্য থেকে জলজ প্রাণীর জন্ম, কূর্ম রূপে উভচর প্রাণী, বরাহ রূপে স্থলচর স্তন্যপায়ী, নৃসিংহ রূপে অর্ধেক প্রাণী ও অর্ধেক মানুষ, বামন রূপে ক্ষুদ্রাকৃতি মানুষ, পরবর্তীকালে পূর্ণ মানব রূপ। ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের (Evolution Theory) সঙ্গে ধারণাগতভাবে সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়, যদিও বৈজ্ঞানিক কাঠামো আলাদা। ভগবত পুরাণ ও বিষ্ণু পুরাণে জম্বুদ্বীপ, কেতুমাল, ভদ্রাশ্ব প্রভৃতি ভূখণ্ডের বর্ণনা রয়েছে, যা অনেকে সাতটি মহাদেশের প্রতীক বলে ব্যাখ্যা করেন। ‍জম্বুদ্বীপকে অনেকে ভারতীয় উপমহাদেশ বলে চিহ্নিত করেন। মহাভারত ও পুরাণে ব্রহ্মাস্ত্র, নারায়ণাস্ত্র, অগ্ন্যাস্ত্র প্রভৃতির বর্ণনা আধুনিক পারমাণবিক অস্ত্রের সঙ্গে তুলনীয় বলে মনে হয়। ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহারের পরে তেজস্ক্রিয়তা, অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশ, নদীর বিষাক্ততা— এ বিবরণ পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরিণামকেই স্মরণ করায়। কিন্তু এগুলি নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বদলে কাব্যিক বা অলৌকিক বর্ণনা হওয়াও সম্ভব।

মনুষ্যধর্ম, ধর্মের চার আশ্রম, নারীর অবস্থান, কাম, মোক্ষ, ভক্তি প্রভৃতি ধারণা মানুষের মনোজগত ও সমাজচিন্তায় প্রতিফলিত। গীতায় বর্ণিত ‍‘ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ’ ধারণা মানসিক অবস্থা ও আত্মসচেতনতা বোঝাতে আধুনিক সাইকো-অ্যানালিসিসের সমান্তরাল হতে পারে। পুরাণে ‍‘মায়া’, ‍‘সত্ত্ব-রজস-তমস’— এই তিনটি গুণ আধুনিক সাইকোলজির ইড, ইগো ও সুপারইগোর ধারণার সঙ্গে তুলনীয়।

বিষ্ণু পুরাণ, রামায়ণ ও মহাভারতে ‍‘পুষ্পক রথ’, ‍‘দিব্যযান’ প্রভৃতির কথা বলা হয়েছে। এই আকাশযানগুলি আধুনিক বিমানের প্রাথমিক ধারণা কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, তবে একটি উড়ন্ত যান সম্পর্কে মানুষের কল্পনা ও আগ্রহ বোঝা যায়। ‘বৈমানিক শাস্ত্র’ নামে কিছু প্রাচীন শাস্ত্রের উল্লেখ পাওয়া গেলেও তা বিজ্ঞানসম্মত নয় বলে আধুনিক বিজ্ঞানীরা মত দিয়েছেন।

পুরাণে বিভিন্ন বৃক্ষ, নদী ও জীবজন্তুকে দেবতারূপে পুজো করার মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণের এক সামাজিক রীতি তৈরি হয়েছে। বনজ সম্পদের মূল্য বোঝাতে তুলসী, বটগাছ, পিপল গাছকে পবিত্র বলে চিহ্নিত করা হয়। গঙ্গা বা সরস্বতী নদীকে দেবীরূপে পুজো মানুষকে নদী সংরক্ষণের বোধ জাগাতে সাহায্য করে। ব্রহ্মার দিন ও রাত্রি, যুগচক্র (সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি)— এ ধারণাগুলি সময়চক্রের একটি বিশাল ধারণা দেয়। মহাযুগের সময়কাল (৪.৩২ মিলিয়ন বছর) জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিপ্রেক্ষিতে গ্যালাকটিক সময়ের সঙ্গে তুলনীয়। যদিও সংখ্যাগুলি রূপক, তবে প্রাচীন ভারতীয়রা সময়ের ব্যাপ্তি সম্পর্কে বিশাল কল্পনা করতেন। পুরাণে দেবী দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী প্রভৃতিকে বিশ্বশক্তির উৎসরূপে দেখানো হয়েছে। পুরাণ বর্ণিত শক্তিতত্ত্ব নারীর শক্তির স্বীকৃতি দেয়। আধুনিক নারীবাদের সঙ্গে এর তুলনা করা যায় একটি সাংস্কৃতিক ও মানসিক শক্তির স্বীকৃতির মাধ্যমে। পুরাণগুলি নিছক কল্পকাহিনি নয়, তার অন্তর্নিহিত বহু দার্শনিক ও প্রাকবৈজ্ঞানিক চিন্তা আমাদের বিস্মিত করে। যদিও অনেক বর্ণনা অলৌকিক, অতিনাটকীয় ও পৌরাণিক, তবুও গভীরে লুকিয়ে রয়েছে সময়োপযোগী, বৈজ্ঞানিক মনোভাবের বীজ। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পাই, বহু পুরাণকথার মূলে কিছু বাস্তব পর্যবেক্ষণ বা জ্ঞান বিদ্যমান। পুরাণকে যদি আমরা আক্ষরিক না ভেবে রূপক, প্রতীক ও সাংস্কৃতিক চেতনার দলিল হিসাবে দেখি, তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও পুরাণের মধ্যে বহু সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়।

পুরাণগুলি ঋগ্বেদের যুগ থেকে আধুনিক ভারতের আত্মিক-সাংস্কৃতিক ধারার মূল উৎস। এ ধারার মূল ভিত্তি ধর্ম, দর্শন, সমাজনীতি ও আধ্যাত্মিক চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর এ ধারাকে রূপ ও ভাষা দিয়েছে ‘পুরাণ’ নামক সাহিত্য। পুরাণ কেবল অলৌকিক কাহিনি নয়, বরং ধর্ম ও সমাজের ধারাবাহিক স্মারক হিসাবেই এর গুরুত্ব অপরিসীম। পুরাণগুলির মধ্য দিয়ে আমরা এক পল্লবিত, বিস্তৃত, বহুস্তরীয় ভারতীয় সংস্কৃতির পূর্ণ রূপরেখা পাই। পুরাণগুলি ইতিহাস ও উপাখ্যানের সংমিশ্রণ, ধর্মীয় আচারের কাহিনিভিত্তিক ব্যাখ্যানমালা, ভৌগোলিক, সামাজিক ও ধর্মদর্শনের সংমিশ্রণ। পুরাণে ধর্মকে সনাতন সংস্কৃতির মৌলিক স্তম্ভ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ— এই চারটি স্তম্ভের ওপর একটি পূর্ণ জীবনযাত্রা নির্মিত হয়েছে। দেবতা ও পৌরাণিক চেতনার সাংস্কৃতিক ভিত্তি ভারতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্রপূর্ণ চেতনা পুরাণে বহু দেবদেবীর কাহিনির মাধ্যমে নির্মিত হয়েছে। একদিকে যেমন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের ত্রিত্ববাদ, তেমনই লক্ষ্মী, সরস্বতী ও পার্বতীর মাতৃচেতনার পূর্ণতা পুরাণে স্পষ্ট।

অন্য পোস্ট: শ্যামাপ্রসাদ ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু গোঁড়া নয়

পুরাণে সমাজকে চারটি বর্ণে ভাগ করে একটি কার্যকর সামাজিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। চারটি বর্ণ হল, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। এটি শুধু পেশাভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস ছিল, জন্মভিত্তিকও নয়। ব্রাহ্মণ সমাজ বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার বাহক, ক্ষত্রিয়রা ছিলেন রক্ষক, বৈশ্যরা উৎপাদক, শূদ্ররা ছিলেন সেবক। এটি একটি জটিল, অথচ সুশৃঙ্খল সামাজিক কাঠামো নির্মাণের প্রয়াস।

পুরাণে নারীর দু’টি রূপ তুলে ধরা হয়েছে— একদিকে করুণাময়ী, মাতৃস্বরূপা, অন্যদিকে দুর্গা ও কালীরূপে যুদ্ধ ও শক্তির প্রতীক। মাতৃচেতনা ভারতীয় সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কন্যাদান, পতিব্রতা, সতীত্ব, এসব ধারণা একদিক থেকে নারীর আত্মত্যাগকে মহিমান্বিত করে, আবার অন্যদিকে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর রূপও উন্মোচন করে। নারীর শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার প্রসঙ্গ সীমিত হলেও দেবী সরস্বতীর আরাধনা নারীর জ্ঞানসত্তার স্বীকৃতি ছিল। পুরাণে বিবিধ ব্রত, উপবাস, যজ্ঞ, উৎসব ও পুজোরীতির বর্ণনা রয়েছে। যেমন, একাদশী, শিবরাত্রি, রথযাত্রা, দুর্গোৎসব ইত্যাদি। এই উৎসব ও ব্রতগুলি সামাজিক সংহতি, নারী নেতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক। কৃষিনির্ভর উৎসবগুলিতে ঋতুচক্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বোঝা যায় (যেমন, বসন্ত উৎসব)। পুরাণে বর্ণিত বিভিন্ন উপাখ্যান ও সংলাপ জ্ঞান ও দর্শনের উৎস হিসাবে ব্যবহৃত হয়। গীতার মতো উপদেশমূলক কথোপকথন লক্ষণীয় (যেমন, নারদ-মার্কণ্ডেয় সংলাপ)। পুরাণে গাছ, নদী, পশুপাখি, সবকিছুকেই দেবত্ব প্রদান করা হয়েছে। বৃক্ষ পুজো, নদী আরাধনা, প্রাণীর উপাসনা ভারতের পরিবেশকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রতীক।

ধর্মীয় সহনশীলতা ও বহুত্ববাদী ধারণায় পুরাণগুলি পুষ্ট। এগুলিতে একাধিক মতবাদ, আচার ও পথের স্বীকৃতি রয়েছে। বিভিন্ন দেবতাকে একই চেতনার নানা প্রকাশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। যেমন, শৈব, বৈষ্ণব, শাক্ত উপাসনার সহাবস্থান।

পুরাণ একটি পরিবর্তনশীল সংস্কৃতির দলিল। বৌদ্ধ ও জৈন প্রভাবের পর হিন্দু ধর্মে যে সংস্কার এসেছে, পুরাণ তা গ্রহণ করে নতুন ধর্মীয় আঙ্গিক নির্মাণ করেছে। পুরাণ হল একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক দলিল, যার মধ্য দিয়ে সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির আদি মূল রূপ, বিকাশ ও রূপান্তরকে বোঝা যায়। ধর্ম, নৈতিকতা, সমাজ, শিল্প, ভাষা, আচরণ, নারী, প্রকৃতি, রাষ্ট্রনীতি, সব মিলিয়ে এটি একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। পুরাণের মাধ্যমে আমরা সেই সভ্যতার সন্ধান পাই, যেখানে ধর্ম ও সংস্কৃতি একে অপরকে পরিপূর্ণ করে।

পুরাণ কেবল ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনচর্যার প্রতিচ্ছবি। এতে নিহিত রয়েছে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও মানসিক কাঠামো। সনাতন সংস্কৃতির অবিনাশী বোধকে পুরাণ এমনভাবে ব্যাখ্যা করে, যা আজও প্রাসঙ্গিক। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস মানেই কেবল রাজাদের যুদ্ধজয়, সাম্রাজ্য বিস্তার বা রাজনৈতিক বিবরণ নয়, তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে জনজীবনের সংস্কৃতি, ধর্ম, রীতি, দর্শন এবং চেতনাবিশ্ব। এই বিস্তৃত ইতিহাসকে আমরা পুরাণের মতো সাহিত্যে খুঁজে পাই, যা যুগের পর যুগ ধরে ভারতীয় জনমানসে গাঁথা হয়ে রয়েছে। এ কারণেই পুরাণ কেবল ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং ভারতের সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

অন্য পোস্ট: নজরুল সাহিত্যে আধ্যাত্মিকতা

পুরাণে বিভিন্ন রাজবংশের বর্ণনা, যেমন, ইক্ষ্বাকু, চন্দ্রবংশ, পুরুবংশ প্রভৃতির উল্লেখ রয়েছে, যা রাজনৈতিক ইতিহাস নির্মাণে সাহায্য করে। ভাগবত ও বিষ্ণু পুরাণে ১২৬টি রাজার নাম ও বংশের উল্লেখ পাওয়া যায়। মৌর্য ও গুপ্ত যুগের কিছু ঐতিহাসিক ইঙ্গিত পুরাণে পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে।

পুরাণ মূলত ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিকাশ ও বিস্তারের মাধ্যম হিসাবে রচিত হলেও এতে বৌদ্ধ ও জৈন মতবাদের প্রতিস্পর্ধার প্রতিফলন দেখা যায়। পুরাণে ব্রত, আচার, উৎসব, ধর্মীয় রীতিনীতির যে বিশাল বিবরণ রয়েছে, তা সমাজের সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্মাণে অন্যতম প্রামাণ্য উৎস। ব্রহ্মচার্য, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ, সন্ন্যাস ঐতিহাসিক জীবনবিন্যাসের প্রতিফলন এবং পাশাপাশি সমাজচিত্রের সার্থক প্রতিফলন। পুরাণে সৃষ্টিতত্ত্ব, প্রলয়, যুগচক্র, মন্বন্তর ইত্যাদি কাহিনির মধ্য দিয়ে সময়ের ধারাবাহিকতা এবং আদিম মানবজাতির জ্ঞানের বিকাশ বোঝা যায়। পুরাণে বহু স্থানের নাম, নদী, পর্বত, জনপদের উল্লেখ রয়েছে, যা ভারতের ভৌগোলিক ইতিহাস রচনায় গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, গোদাবরী, নর্মদা, সিন্ধু প্রভৃতি নদী, পুরী, কাশী, বৃন্দাবন, গঙ্গাসাগর, বদ্রীনাথ প্রভৃতি তীর্থস্থান, মগধ, অবন্তী, পাঞ্চাল, কুরু, অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ প্রভৃতি জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরাণ কেবল দেবতার কাহিনি নয়, বরং একটি জাতির স্মৃতি, বিশ্বাস ও ইতিহাসের মেলবন্ধন, ইতিহাসের অন্তর্গত চেতনাগত উপাদান।

দীনেশচন্দ্র সেন, হজারিপ্রসাদ দ্বিবেদী, রমেশচন্দ্র মজুমদার পুরাণকে ‘ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের বাহক’ বলেছেন। তাঁদের মতে, পুরাণে যা অলৌকিক, তা বাদ দিলে সমাজচিত্র ও ইতিহাসের তথ্য গৃহীত হতে পারে। রোমিলা থাপার, রিচার্ড ডেভিস প্রমুখ পুরাণকে মিথ ও অলৌকিকতা বলে ব্যাখ্যা করেন। তবে উনিশ শতকের নবজাগরণ পর্বে পুরাণগুলির মধ‍্যে অনেকেই ভারতীয়দের আত্মপরিচয়ের তত্ত্বকে তুলে ধরেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখর মতে, পুরাণ কেবল একটি ধর্মীয় সাহিত্যের ধারা নয়, এটি একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের সমাহার। যদিও পুরাণের অনেক তথ্য অতিকথন ও অলৌকিকতায় আচ্ছন্ন, তবুও গভীরে রয়েছে ইতিহাসের ছায়া, সমাজচিত্র, ধর্মীয় সংঘাত ও সমন্বয়ের ইতিহাস। ভারতের ইতিহাসচর্চায় পুরাণ তাই এক অনিবার্য দলিল।

3 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Subhajyoti Acharjee
Subhajyoti Acharjee
9 months ago

সত্যি ধন্য এই তথ্য গুলি পেয়ে, সাধ্যমতো চর্বিতচর্বন করব, তবে এই তথ্য গুলো আমার কাছে অমূল্য।

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए