Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

নজরুল সাহিত্যে আধ্যাত্মিকতা

Share Links:

মফিজুল তরফদার

বাংলা সাহিত্যে যদি কোনও কবিকে বলি আগুনের সন্তান, তবে সে নাম নিঃসন্দেহে কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর কলম ছিল বিদ্রোহের দীপ্ত অগ্নিশিখা, কিন্তু সে আগুনের গভীর কেন্দ্রে ছিল এক উন্মুখ আত্মা— চিরঈশ্বরপিপাসু, চিরসন্ধানী। তিনি শুধু রাজনীতির বা সমাজের কাঠামো ভাঙতে চাননি, ভাঙতে চেয়েছেন আত্মার চিরচেনা গণ্ডিও, যেখানে ঈশ্বর ধরা দেন শুধু উপাসনার কাঠামোয়, অথচ অনুভবে অনুপস্থিত। নজরুল সেই ঈশ্বরকে ডাকেন কবিতায়, গানে, কান্নায়, বিদ্রোহে। তিনি ঈশ্বরকে মন্দির-মসজিদের চৌহদ্দিতে খুঁজে পান না, খুঁজে ফেরেন পথে, প্রেমে, প্রতিবাদে আর নিজ আত্মার ভাঙাগড়ার মধ্যে।

নজরুলের ইসলামি গজলগুলিকে শুধু ধর্মীয় রচনার চৌকাঠে ফেললে ভুল হবে। তাঁর ‘তাজদারে হারম’, ‘ইলাহি তেরি চোকর কা তালবগার হুঁ মেঁ’ কিংবা ‘আল্লাহ রে আল্লাহ’— এই গজলগুলি যেন আত্মার আর্তনাদ, যেন সেই প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণের গোপন ভাষা। ‘মিলিয়ে যাও হৃদয়ে, প্রভু,/ আমি তো তোরই জন্যে খুঁজি আপন ছায়া!’ এ গান আর সুরে নজরুলের ঈশ্বর নেমে আসেন আত্মার কোল ঘেঁষে, চোখের জলে গলে ওঠেন এক মমতাভেজা উপস্থিতিতে।

হিন্দু-ঐতিহ্যেও আত্মার পরাগ

নজরুলের কবিতায় রাধা যেমন আছেন, তেমনই আছেন কালী। তাঁর কাছে ঈশ্বর কোনও জাতিগত ধারণা নয়, বরং এক চিরন্তন সত্তা, যিনি সব বিশ্বাসের গভীরতায় বিরাজমান। ‘হে মোর চিরসখা, হে মোর চিরদেবতা,/ তোমার লাগি হৃদয় আমার ভাঙে বারেবার।’ এ পঙ্‌ক্তিতে রাধার প্রেম যেন চিরপ্রেমিক আত্মার কণ্ঠস্বর। আর এ প্রেমিকা যেন স্বয়ং আত্মা, যে চায় মিলন, নিবেদন এবং নির্জন প্রার্থনা।

প্রেম আধ্যাত্মিকতার আর এক নাম

নজরুলের প্রেম কখনওই কেবল পার্থিব নয়। তাঁর কবিতায় নারীর প্রেমে আত্মা লীন হয়, হয়ে ওঠে ঈশ্বর-অন্বেষণকারী। যেমন, তিনি লিখেছেন, ‘তুমি আমার সাধনার ধ্যান,/ তুমি পূজার প্রেমোপাহার।’ এ প্রেমিকাটি হয়তো কোনও লাইলি, কিন্তু মূলত এ প্রেম এক আত্মানুসন্ধান, এক ভক্তির রূপ। নজরুলের কাছে ঈশ্বর ও প্রেমিকা একই উৎসের দুই ভাষ্য।

মৃত্যু আত্মার মুক্তির উৎসব

নজরুল মৃত্যুকে ভয় করেন না, বরং তাকে আলিঙ্গন করেন। মৃত্যুর আঘাতে তিনি খোঁজেন ঈশ্বরের মুখ, আত্মার নিঃশব্দ গৃহ। তাঁর একটি কবিতায় পাই, ‘আজকে মৃত্যুর মাঝে/ দেখেছি এক অনন্ত চন্দনা।/ জীবন ভাঙে, আর আত্মা হাসে—/ এ কি সে অমর সুর?’ এ এক ব্যতিক্রমী আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি— মৃত্যুকে নয়, মৃত্যুর ভিতর দিয়ে উন্মোচিত আত্মার স্বরূপকে ধরা।

শ্মশানে ঈশ্বর, মসজিদে প্রেম

নজরুল বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর সর্বত্র— শ্মশানে, চণ্ডীমণ্ডপে, পথের ধারে। তিনি লিখেছেন, ‘শ্মশানে যেথা চিতা জ্বলে,/ সেইখানে জ্বলে প্রভুর আলো!’ এ দৃষ্টিভঙ্গি শুধু আধ্যাত্মিক নয়, এটি এক অন্তর্গত বিস্ফোরণ, যেখানে ঈশ্বর আর কোনও এক ‘ঊর্ধ্বে বসে থাকা’ পুরুষ নন, তিনি আমাদের সঙ্গে হাঁটেন, কাঁদেন, প্রেমে পড়েন, বিদ্রোহে জ্বলে ওঠেন।

সাম্যের গান— ঈশ্বরের আরাধনা

নজরুলের ‘সাম্যের গান’ আসলে এক উচ্চতম আধ্যাত্মিক ভাষ্য। ঈশ্বর, যিনি আমাদের মধ্যে আছেন, যাঁর পবিত্রতা ধরা পড়ে কুলি-মজুরের ঘামে, যাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় অনাথ শিশুর চোখে— এই দৃষ্টিভঙ্গিই তো আধ্যাত্মিকতার অন্তরতম রূপ। ‘গাহি সাম্যের গান,/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।’ এ সাম্য নজরুলের ঈশ্বরের অভিজ্ঞান। এখানে আত্মা কেবল আত্মানন্দে আবিষ্ট নয়, সে বিশ্বমানবের সঙ্গী।

আত্মার বিদ্রোহ— ধর্ম নয়, বোধ

নজরুল ধর্মের নামে লড়াই করেননি, তিনি লড়েছেন ধর্মের নামে মানুষের ওপর জুলুমের বিরুদ্ধে। এ লড়াইয়ের পিছনেও ছিল এক গভীর আত্মদৃষ্টি। তিনি বলেছেন, ‘আমার ধর্ম সত্যের পথে,/ আমার মসজিদ মানুষের বুকে।’ এখানে নজরুল দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক পরমতাত্ত্বিক সাহসিকতায়। ঈশ্বরকে তিনি খুঁজে পান প্রেমে, প্রতিবাদে, আর সবচেয়ে বড় করে মানুষে।

চূড়ান্ত আর্তি: আত্মা চায় প্রভুর চরণে পড়ে থাকতে

আত্মিক পথচলার শেষ প্রান্তে এসে নজরুল যেন এক সুফি। তিনি বলেছেন, ‘চোখের জলে ধুই সে পা,/ যেথা সে ঈশ্বর দাঁড়ায়।’ এ কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ে সমস্ত বিদ্রোহের ক্লান্তি, সমস্ত প্রেমের পরিণতি। এখানে এসে আত্মা আর লড়াই করে না, সে আত্মসমর্পণ করে এবং এই আত্মসমর্পণই নজরুলের আধ্যাত্মিকতার চরম রূপ।

নজরুলের আধ্যাত্মিকতা এক বহুরৈখিক নদীর মতো, যা গানে বাজে, কবিতায় কাঁদে, প্রেমে পোড়ে, বিদ্রোহে জ্বলে, মৃত্যুর শীতলতায় হাসে। এটা শুধু ঈশ্বরচিন্তা নয়, আত্মা ও মানবতার মিলনের অনন্য মহাযাত্রা।

তিনি লিখেছেন, ‘তুমি আছ সবখানে,/ তবু খুঁজি নির্জনে—/ আমি এক পথহারা আত্মা,/ তোরই সন্ধানে।’ এ কবি বিদ্রোহে ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছিলেন, প্রেমে ঈশ্বরকে ভালোবেসেছিলেন, আর কণ্ঠে কণ্ঠে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সে আত্মার ডাক, যা আজও মানুষের হৃদয়ে বাজে এক অফুরন্ত প্রার্থনা হয়ে।

3 6 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए