মহাশোরগোল প্রতিবেদন: মাসদুয়েকের মধ্যেই পরপর দু’টি অসাধারণ গবেষণা উপহার দিল পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। এই দু’টি গবেষণারই তত্ত্বাবধায়ক প্রথিতযশা প্রাবন্ধিক তথা স্বনামধন্য প্রফেসর ড. স্বপনকুমার মণ্ডল। প্রফেসর মণ্ডলের মননজুড়ে যে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অজানা খনির পরশমণি আবিষ্কারের সাধনা সদাজাগ্রত থাকে, তা এই দু’টি গবেষণার মধ্যেই প্রতীয়মান৷ ১ জুলাই গবেষক শুক্লা গাঙ্গুলি তাঁর গবেষণা সুসম্পন্ন করে ডক্টর শিরোপায় ভূষিত হয়েছেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ‘ভগিনী নিবেদিতার চিন্তায় ও কর্মে বাংলার সমাজ ও সাহিত্য’।
ভগিনী নিবেদিতা আমাদের কাছে স্বামী বিবেকানন্দের স্বনামধন্য শিষ্যা তথা সন্ন্যাসিনী, বিরল মনীষার অধিকারিণী ও সমাজ সংস্কারক সেবাব্রতী হিসাবেই সুপরিচিত। কিন্তু এর বাইরে বাংলা সাহিত্যে তাঁর যে অসামান্য অবদান রয়েছে, তা গবেষক শুক্লা গাঙ্গুলির গবেষণাকর্মটিতে অত্যন্ত সুনিবিড়ভাবে উঠে এসেছে। গবেষক তাঁর গবেষণাকর্মটিকে মোট চারটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে আলোচনা করেছেন। এই আলোচনাটির মধ্যেই উঠে এসেছে নিবেদিতার সমাজহিতৈষী মানসিকতার পাশাপাশি যুগভিত্তিক বাংলা সাহিত্যের পরিসরে তাঁর মূল্যায়নের প্রভাব থেকে অনুবাদক সত্তার ভূমিকাটিও।
শুধু অনুবাদক সত্তার আলোচনাতেই ক্ষান্ত হননি গবেষক, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বৃহৎ পরিসর জুড়ে নিবেদিতার যে প্রভাব, তাও গবেষণাটির মাধ্যমে উঠে এসেছে। পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য এবং অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি সম্বলিত তত্ত্বাদির স্পষ্ট বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিবেদিতার সমাজ ও সাহিত্যে অবদানের বিষয়টিকে তুলে ধরে গবেষক বহু অনালোকিত বিষয়কে আলোর সামনে তুলে এনেছেন। এককথায় তাঁর গবেষণাকর্মটি বাংলা সাহিত্যের এক নতুন পথের দিশারি এবং আগামী গবেষকদের বিষয় নির্বাচনে নতুন করে ভাবার অবকাশও তৈরি করবে, তা অনায়াসেই বলা যায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গবেষক শুক্লা গাঙ্গুলি সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের কৃতী ছাত্রী, গোল্ড মেডালিস্ট ও কনিষ্ঠতম পিএইচডি প্রাপক হিসাবে অনন্য নজিরও স্থাপন করেছেন।
অন্যদিকে গত ২২ আগস্ট প্রফেসর স্বপনকুমার মণ্ডলের অধীনে আরও একটি অসাধারণ গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। গবেষক বৈদ্যনাথ বাস্কে ‘আরণ্যক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ভ্রমণ সাহিত্য: ব্যক্তিসত্তা ও লেখকসত্তার ঐক্য ও অনৈক্য’ বিষয়ে গবেষণা সুসম্পন্ন করে বিরল নজির সৃষ্টি করেছেন। এই গবেষণাকর্মটি বাংলা সাহিত্যের গবেষণায় একটি অভিনব সংযোজন। পুরুলিয়ার মতো প্রান্তিক জেলা থেকে এমন জটিল বিষয়ে উৎকৃষ্ট গবেষণাপত্রটি বিশ্ববিদ্যালয় তথা জেলার মানোন্নয়নের পরিচায়ক হয়ে ইতিহাসের পাতা দখল করে নেবে আগামীতে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আপামর বাঙালির কাছে কালজয়ী উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র স্রষ্টা হিসাবে পরিচিত হয়ে আছেন। কিন্তু তার বাইরে ভ্রমণ পিপাসু বিভূতিভূষণের পরিচয় আমাদের অনেকের কাছেই অজানা দ্বীপ। সেই অজানা দ্বীপটিকে সুনিবিড়ভাবে উপস্থাপন করেছেন গবেষক বৈদ্যনাথ বাস্কে তাঁর গবেষণায়। গবেষক তাঁর গবেষণাটিকে মোট পাঁচটি অধ্যায়ে ভাগ করে আলোচনা করেছেন। এই অধ্যায়গুলির মধ্যে একদিকে যেমন বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণ সাহিত্যের ইতিহাস উঠে এসেছে, তেমনই সমান্তরালভাবে বিভূতিভূষণের ভ্রামণিক সত্তাটিও নিবিড়তা লাভ করেছে। স্থানিক ভ্রমণের পাশাপাশি মানসভ্রমণেও সওয়ার করেছেন বিভূতিভূষণ। তাঁর সাহিত্যে লেখকসত্তা এবং ব্যক্তিসত্তার ঐক্য ও অনৈক্য কীভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে, তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে গবেষণাটিতে। একজন গবেষকের গবেষণাকর্মটি তখনই চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে, যখন তাঁর তত্ত্বাবধায়ক নিরন্তর গবেষণার বিষয় সম্পর্কে সুনির্দেশনা দেন এবং অভিমুখটি সুনিপুণভাবে গড়ে তোলেন। সে ক্ষেত্রে গবেষকের পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়কের যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গবেষক বৈদ্যনাথ বাস্কের গবেষণাটি বাংলা সাহিত্যের পথপ্রদর্শক হবে বা আগামীতে বিভূতিভূষণের প্রতি আগ্রহী পাঠক ও অনুরাগী গবেষকের কাছে এই গবেষণাটি বর্ণপরিচয়ের সমাদর লাভ করবে, তা সহজেই অনুমেয়।
অন্য পোস্ট: রোবট: কল্পবিজ্ঞান ও বাস্তব
এছাড়া গবেষক তথা কলকাতার নিউ আলিপুর কলেজের বাংলার অধ্যাপক বৈদ্যনাথ বাস্কে সম্পর্কে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা না বললেই নয়। প্রান্তিক জেলার আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে আসা বৈদ্যনাথ বাস্কে পুরুলিয়া জেলার গর্ব এবং অগণিত পিছিয়ে পড়া এবং হীনমন্যতায় ভোগা ছাত্রছাত্রীর কাছে অনুপ্রেরণা ও এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।
তত্ত্বাবধায়ক স্বপনকুমার মণ্ডল তাঁর অধীনে গবেষণাকর্ম দু’টি সাফল্যের মুখ দেখায় তিনি খুব খুশি হয়েছেন এবং দুই কৃতী ছাত্রছাত্রীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেছেন, পাশাপাশি শুভেচ্ছা ও শুভাশিস জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, দু’জন গবেষকই তাঁর এমএ ক্লাসের সরাসরি ছাত্রও।

অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।